হিমাচল প্রদেশ ভ্রমণ (Your guide to Himachal Pradesh Tour)
হিমাচল প্রদেশ
আমাদের
মহান ভারতবর্ষের সমগ্র উত্তর অংশ জুড়ে অবস্থান করছেন আমাদের রক্ষাকবচ স্বরুপ মহামহিম গিরিরাজ হিমালয়। আমাদের দেশের মোট এগারোটি পার্বত্য প্রদেশের অবস্থান এই হিমালয় পর্বতের বুকের মধ্যে। এই এগারোটি রাজ্যই রূপে গুনে অতুলনীয়। তাদের মধ্যে অন্যতম পশ্চিম হিমালয়ের প্রান্ত ঘেঁষা এই রাজ্যটি, যাকে আমরা দেবভূমি হিমাচল বলে অভিহিত করে থাকি। অতি প্রাচীন কাল থেকে অপরিসীম সৌন্দর্যের আকর এই পবিত্র ক্ষেত্রটিকে দেবতাদের বিচরনভূমি ও আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ তথা সপ্তশতী চন্ডীতে আমরা পাই সারাহানের ভীমা কালীকা দেবীর কথা, মহাভারতের মধ্যম পান্ডব ভীম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে মন্দির আজও স্বমহিমায় বিশ্বাসে এবং ভক্তিতে অতুলনীয় হয়ে অবস্থিত। আমাদের
দেশের কয়েকটি অতি প্রাচীন তীর্থস্থানের অবস্থানও এই রাজ্যেই। যেমন জ্বালামুখী মন্দির, চিন্তাপূর্ণী মন্দির, বৈজনাথ মন্দির প্রভৃতি।
এই
রাজ্যটির পূর্ব প্রান্তে রয়েছে তিব্বত, উত্তরে লাদাখ ও জম্মু কাশ্মীর, পশ্চিমে পঞ্জাব, দক্ষিন-পশ্চিমে হরিয়ানা রাজ্য এবং দক্ষিণে উত্তরাখন্ড ও উত্তরপ্রদেশ। ব্রিটিশ অধিকৃত পরাধীন ভারতবর্ষে হিমালয়ের এই অঞ্চলের অধিকাংশ স্থান সমূহ ব্রিটিশ শাসনাধীন পঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বাধীনতার পর এই অংশের পার্বত্য অঞ্চলগুলিকে “চিফ কমিশনারস প্রভিন্স অফ হিমাচল প্রদেশ” নামে একটি স্বায়ত্ত শাসিত সংস্থার অধীনে নিয়ে আসা হয়। আরও পরে, ১৯৬৬ সালে পঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্গত আরও কয়েকটি পার্বত্য অঞ্চলকেও এই অংশের ভেতর নিয়ে এটিকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। সব শেষে মাত্র ১৯৭১ সালে ভারত সরকার দেশের এই অংশটিকে হিমাচল প্রদেশ নামে একটি স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করেন।
অভূতপূর্ব
সৌন্দর্যের অর্ণব সদৃশ এই রাজ্যটিকে ঘিরে রয়েছে ঘন সবুজ হিমালয়পর্বত, অবিস্মরণীয় তার হীরকের
দ্যুতিতে উজ্জ্বল শ্বেত শুভ্র বরফের মুকুট রৌদ্রালোকে ঝলমল করে ওঠে যখন তখন। একেক ঋতুতে এই রাজ্যের একেক রকম রূপ। চির অম্লান রূপরাশি নিয়ে ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকেদের জন্য দুহাত বাড়িয়ে তার আদরের
কোলটি মেলে রেখেছেন যেন এই রাজ্যটি।
হিমাচল প্রদেশ কি ভাবে যাবেন।
অনেক ভাবে হিমাচল প্রদেশ বেড়াতে আসতে পারেন। যদি বিমানে আসেন তাহলে চন্ডীগড় বিমানবন্দর থেকে গাড়ীতে সিমলা এসে সেখান থেকে বেড়ানো শুরু করতে পারেন। রেলপথেও চন্ডীগড় পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ীতে সিমলা আসতে পারেন। চন্ডীগড় থেকে সিমলার দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার, সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা। পথের দৃশ্য অসাধারণ।
এছাড়াও যদি বিখ্যাত ছোট ট্রেনে চেপে সিমলা আসতে চান তাহলে দিল্লী থেকে রেলপথে কালকা পৌঁছন। কালকা থেকে প্রতিদিন সকালে কালকা-সিমলা ন্যারোগেজ ট্রেন আসছে সিমলায়। মোটামুটি পাঁচ ঘন্টার এক অবিস্মরণীয় রেল যাত্রা এটি। প্রায় ১০৮ টি ছোট বড়ো টানেলের ভেতর দিয়ে গিয়েছে এই রেলপথ। আবার পাঠানকোট থেকে যোগীন্দর নগর পর্যন্ত অর্থাৎ হিমাচলের কাংড়া উপত্যকার জন্য আরো একটি ন্যারোগেজ রেলপথ রয়েছে এই রাজ্যে।
আর আপনি যদি সড়ক পথে আসতে চান তাহলে দিল্লী থেকে প্রতিদিন অনেক বাস আসছে সিমলা বা মানালীতে। সরকারি সড়ক পরিবহনের সাধারণ বাস, ভলভো বাস, লাক্সারি, এসি, নন এসি, সব রকমের বাস পাবেন সিমলা অথবা মানালীতে পৌঁছোবার জন্য। আবার কালকা থেকেও বাসে অথবা শেয়ার গাড়ীতে সিমলা পৌঁছতে পারেন।
হিমাচল প্রদেশ বেড়াতে কতদিন লাগবে।
বেড়াতে
কতদিন লাগবে সেটা নির্ভর করবে আপনি কোথায় কোথায় যেতে চান তার ওপর।
প্রথমেই
দেখে নিন আপনি কতদিনের ছুটি নিতে পারবেন। সেই অনুযায়ী ট্যুর প্ল্যান করুন।
এই রুটের সর্বাধিক জনপ্রিয় বেড়াবার অংশ “সিমলা–মানালী”। সিমলা দুই রাত এবং মানালী তিন রাত। মোট ৫রাত ৬দিনের বেড়ানো। এর সাথে সিমলা থেকে মানালি যাবার দিন মনিকরণ বেড়িয়ে নিতে পারেন, পথে কুলু উপত্যকার অন্যান্য সাধারন দ্রষ্টব্য গাড়ী চালক আপনাদের দেখিয়েই দেবেন। যাদের হাতে ছুটি কম তারা অল্প দিনের এই ট্যুরটি খুব ভালো ভাবে উপভোগ করতে পারবেন।
গাড়ী চালক কে বলবেন সিমলা থেকে যাত্রা শুরু করে চন্ডীগড়ে এসে শেষ করতে। এছাড়াও আপনি আপনার বেড়াবার মোট দিন হিসেবে অন্যান্য ট্যুর প্ল্যান তৈরি করতে পারেন, যেগুলি হলোঃ
1.
সিমলা–২রাত, সারাহান–১রাত, সাংলা–১রাত, ছিটকুল-১রাত।(সাংলায় দু’রাতও থাকতে পারেন, সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় দিন ছিটকুল ঘুরে এসে সাংলাতেই রাত্রি বাস করুন।)কল্পা–১রাত, রামপুর/নারকান্ডা–১রাত, (সিমলা থেকে যাত্রা শুরু, চন্ডীগড়ে এসে শেষ)।
এই ট্যুরটি কিন্নর-কৈলাস ট্যুর নামে সর্বাধিক পরিচিত।
2. সিমলা–২রাত, মানালী–৩রাত, ধরমশালা–২রাত, ডালহৌসি–২রাত, অমৃতসর–১রাত।(সিমলা থেকে মানালি যাবার পথে মনিকরণ ঘুরে নেবেন এবং মানালি থেকে ধরমশালা যাবার সময় রাস্তায় বিখ্যাত মন্দির বৈজনাথ দর্শন করে নিতে পারেন।ধরমশালায় দ্বিতীয় দিন সকাল সকাল বেড়িয়ে সোজা জ্বালামুখী এবং চিন্তাপূর্ণী বেড়িয়ে নিতে পারেন। পরের দিন ধরমশালা লোকাল সাইটসিয়িং করে ডালহৌসি চলে যান।
ডালহৌসি থেকে দ্বিতীয় দিন সকালে বেড়িয়ে ভারতের সুইজারল্যান্ড নামে বিখ্যাত খাজিয়ার দেখে নিন।পরদিন ডালহৌসি থেকে সকালে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে সোজা অমৃতসর ওয়াঘা সীমান্ত দেখুন।পরদিন সকালে স্বর্ণ মন্দির ও জালিয়ান ওয়ালাবাগ দেখে নিয়ে ট্যুর শেষ করুন।)
3.
চন্ডীগড়
থেকে সিমলা-১রাত, সিমলা থেকে সারাহান-১রাত, সারাহান থেকে সাংলা-২রাত(১দিন ছিটকুল বেড়িয়ে সাংলায় রাত্রিবাস), সাংলা থেকে কল্পা-১রাত, কল্পা থেকে
টাবো-১রাত, টাবো থেকে কাজা-২ রাত, কাজা থেকে চন্দ্রতাল-১রাত, চন্দ্রতাল থেকে মানালী-১ রাত, মানালী থেকে চন্ডীগড় অথবা কালকাতে পৌছে ট্যুর শেষ।
এই ট্যুর প্ল্যানগুলো নিজের পছন্দমত দিনসংখ্যা বাড়িয়ে কমিয়ে সাজিয়ে নিতে পারেন। যেমন যারা সিমলা থেকে মানালী আসছেন বা যাচ্ছেন সেখানে হাতে একদিন বেশী সময় থাকলে মান্ডীতে একরাত থেকে বিখ্যাত রিওয়ালসার লেক দেখে আসুন, এর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।
আর হাতে যদি দুটি দিন থাকে তাহলে এর সাথে পরাশর লেকটিও দেখে নিতে ভুলবেন না। স্বর্গের স্থপতিকার, প্রযুক্তিবিদ দেব বিশ্বকর্মার
একমাত্র
মন্দিরটি এই মান্ডীতেই পাহাড়ের ওপরে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত রয়েছে।
হিমাচল ভ্রমণের সঠিক সময় কোনটি।
বেশীর ভাগ মানুষ গ্রীষ্মে অর্থাৎ মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত, এই সময়টাকেই হিমাচল বেরানোর উপযুক্ত সময় হিসেবে পছন্দ করেন। তবে আপনি যদি বরফ পছন্দ করেন তাহলে মার্চ মাসের কয়েকটি দিন ছাড়া বাকি সময়গুলিতে বরফ দেখার সম্ভাবনা আপনার জন্য খুবই ক্ষীন।
আবার কখনো কখনো মে মাসেও বরফপাত লক্ষ্য করা যায় এই রাজ্যে। মার্চের শেষ বা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ এবং কোন কোন বছর মে মাস পর্যন্ত সাংলা, কল্পা প্রভৃতি জায়গাগুলতে প্রচুর বরফ থাকে, অনেক সময় জালোরি পাস বন্ধ হয়ে যায় অতিরিক্ত তুষার পাতের কারনে।অনেকে আবার শীতের সময়টাকেই বেছে নিতে চান হিমাচলে তুষারপাত দেখবেন বলে।
মোটামুটি ভাবে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত এই রাজ্যে শীত কাল থাকে। প্রচুর তুষারপাত হয় এই সময়। শীতের সিমলা, মানালী অথবা ধরমশালা, ডালহৌসি- খাজিয়ার এক কথায় অতুলনীয়।
মোটামুটি ভাবে নভেম্বর থেকে এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রোটাং পাস বরফের কারণে বন্ধ থাকে। তাই হিমাচল ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় ভালো ভাবে খোঁজ খবর করে নেবেন অথবা অভিজ্ঞ কোন ট্যুর প্ল্যানারের সাথে পরামর্শ করে নেবেন।







4 মন্তব্যসমূহ
এতো তথ্যসমৃদ্ধ এবং এতো সুলিখিত যে মানসভ্রমণ বা তথ্যানুসন্ধান - যে প্রয়োজনেই পড়া হোক না কেন তৃষনা মিটবেই। অসাধার!
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ। পাঠক তৃপ্ত হলে লেখকের সবচেয়ে বেশী আনন্দ হয়। যদি আমার লেখার দ্বারা আমার পাঠকবর্গের যৎসামান্য সন্তুষ্টি বিধান করে থাকতে পারি তাহলেই আমার লেখা সার্থক।
মুছুনএতো সুন্দর লেখনীর সাহায্যে হিমাচলকে এঁকে দিলেন !!
উত্তরমুছুনআপনার মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। হিমাচল দেবতাদের আবাস, তাই একে দেবভূমি বলা হয়ে থাকে। এই রাজ্যের স্বর্গীয় রূপের আলোকে তাই পর্যটক মাত্রেই বিমোহিত হয়ে থাকেন। তাই বার বার ছুটে ছুটে যেতে ইচ্ছা হয় হিমাচলের রূপসাগরে নিমজ্জিত হ'তে।
মুছুনPlease do not enter any spam link in the comment box.