কোভিড ১৯ প্রতিরোধে এন্টিবডি টেস্ট জরুরি।
![]() |
| Covid 19 antibody test |
খবর
পেলাম যে স্থানীয় ভাবে কিছু সংগঠন বেশ কিছু শহরে এবং রাজ্যে
করোনা
রোগের এন্টিবডি টেস্ট করানোর জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। বেশ ভালো খবর এবং আশাব্যঞ্জক। আমাদের দেশে যে কোনো ভালো উদ্যোগ শুরু হলেই সঙ্গে সঙ্গে তার পক্ষে বিপক্ষে অনেক রকম যুক্তি এবং কুযুক্তি সামনে এসে পড়ে এবং আপত্তির নাগপাশে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে উদ্যোগটি যাতে মাঠে মারা যায় তার সবিস্তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকেনা। এক্ষেত্রেও
তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেই সব যুক্তি বা কুযুক্তিগুলি আলোচনা করবার আগে প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক এন্টিবডি টেস্ট টা কি।
এন্টিবডি টেস্ট টা কি।
আমাদের
শরীরে যে কোনো রোগ দেখা দিলেই শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা সেই রোগের সাথে লড়াই করতে নেমে পড়ে এবং তার ফলে সেই নির্দিষ্ট রোগটি থেকে শরীরকে রক্ষা করবার উদ্দ্যেশে আমাদের শরীরের ভেতরে একটি প্রোটিন পদার্থের সৃষ্টি হয়। একেকটি
রোগের ক্ষেত্রে
একেক প্রকার রোগ প্রতিরোধক প্রোটিন পদার্থ তৈরি হয়, যেমন হাম হলে যে প্রোটিন পদার্থ তৈরি হবে করোনা হলে তা’ কিন্তু হবে না। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা পদার্থ। এই প্রোটিন পদার্থটিকেই বলা হয় সেই নির্দিষ্ট রোগটির এন্টিবডি।এই এন্টিবডি সাধারণত রোগটি ভালো হয়ে যাবার পরেও আরো দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমাদের শরীরে সেই নির্দিষ্ট রোগটির বিরুদ্ধে রক্ষা কবচ হিসেবে অবস্থান করে এবং আমাদের রক্ষা করতে চেষ্টা করে। এর ফলে দ্বিতীয়বার সেই রোগটি আবার যদি আমাদের শরীরকে আক্রমন করতে চায় তাহলে প্রতিহত হয়ে ফিরে যায়।
এন্টিবডি টেস্ট কেন করা প্রয়োজন।
এন্টিবডি
টেস্ট করলে বোঝা যায় যে আগে কখনো সেই রোগটি আমাদের শরীরে হয়েছিল কি না। মনে
করুন রক্ত
পরীক্ষা করে দেখা গেল যে আমার শরীরে করোনা রোগের জন্য নির্দিষ্ট প্রোটিন পদার্থটি রয়েছে অর্থাৎ আমি জানতেও পারিনি যে কখনো কোনো এক সময়ে এই রোগটি আমার শরীরে বাসা বেঁধেছিল এবং আমি স্বাভাবিক ভাবে সুস্থও হয়ে উঠেছিলাম। এক্ষেত্রে আমার শরীরে তৈরি হয়ে ওঠা করোনা রোগের এন্টিবডি আমায় দ্বিতীয়বার এই রোগ হওয়া থেকে প্রতিহত করবে শরীরের আপন নিয়মেই। এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে এন্টিবডি টেস্ট কিন্তু আপনি বর্তমানে করোনা আক্রান্ত কি না তা’ বলতে পারেনা, কেবল আপনার শরীরে থাকা করোনা রোগ প্রতিরোধক নির্দিষ্ট প্রোটিন পদার্থের উপস্থিতি থেকে জানা যায় যে আপনি আপনার অজান্তে কখনো এই রোগের শিকার হয়েছিলেন কিনা এবং তার ফলে আপনার শরীরে
উপযুক্ত প্রতিরোধক ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না। করোনা রোগ হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার জন্য এখনো পর্যন্ত যে নির্ভরযোগ্য টেস্টটি রয়েছে তা হলো RTPCR(Reverse transcription
polymerase chain reaction)। মুলত
এই পরীক্ষার ওপরে নির্ভর করেই আমাদের কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার করোনা পজিটিভ অথবা
নেগেটিভ ঘোষনা করছেন। এই পরীক্ষাটি ছাড়াও আরো কয়েকটি পরীক্ষা রয়েছে যেমন, ট্রুন্যাট এবং এন্টিজেন টেস্ট। এই পরীক্ষাগুলি থেকেও কোনো ব্যাক্তি বর্তমানে করোনা আক্রান্ত কি না তা বলা যায় তবে একমাত্র এন্টিবডি টেস্ট থেকেই জানা যায় যে কোনো ব্যক্তি আগে কখনো করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিনা।
তাহলে
এন্টিবডি পরীক্ষা করে
কি
হবে?
দেখা
যাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত বহু মানুষের হয় কোনো অসুস্থতাই নেই অথবা থাকলেও তা’ এতোটাই কম যে এই নিয়ে সেই মানুষটির কোন চিন্তাও নেই তাই সেরকম অসুস্থতাকে তিনি একেবারেই আমল দেননি। এই রকম রোগীরাই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারন, এদেরকেই বলা হচ্ছে ‘Asymptomatic patient’। সম্প্রতি দিল্লীতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের পক্ষ থেকে এন্টিবডি নিয়ে একটি বড়সড় সমীক্ষা চালানো হয়। সেই সমীক্ষায় দেখা গেছে সেই রাজ্যের প্রায় কুড়ি শতাংশ মানুষ কখনো না কখনো করোনা রোগের দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। এই রকম বৃহত্তর সমীক্ষাকে বলা হয় সেরোসার্ভে। অর্থাৎ এই সেরোসার্ভের তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় যে ওই রাজ্যে প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষ এখন পর্যন্ত করোনা রোগের
দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। অথচ সরকারি তথ্য অনুযায়ী মাত্র এক লক্ষ তিরিশ হাজার মানুষ ঐ রাজ্যে
করোনা পজিটিভ। এতো খানি ফারাক তাহলে কি করে হলো? কারন সরকারি হিসেব অনুযায়ী যারা করোনা আক্রান্ত তারা অসুস্থ বোধ করার পর টেস্ট করিয়েছেন এবং পজিটিভ হয়েছেন, তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছিলেন তাদেরও সেই কারনেই করোনা টেস্ট করানো হয়েছিল এবং সেখান থেকেও পজিটিভ রোগী পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু যারা একেবারেই অসুস্থ হন নি তারা দিব্যি লোকসমাজে ঘুরেও বেড়িয়েছেন এবং তাদের ভেতর থেকে
বেশ কিছু মানুষ আপনা থেকে ভালোও হয়ে গিয়েছেন অর্থাৎ যারা ভালো হয়ে গিয়েছেন তাদের শরীরে ওই এন্টিবডি তৈরি হয়ে রয়েছে। নিয়মমতো তাদের দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাহলে যা বোঝা গেলো যে যারা সরাসরি কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসেন নি অথবা গুরুতর অসুস্থও হননি সেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভেতর কতো জন করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, কত জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভেতরে ঠিক কত জনের শরীরে করোনা রোগ প্রতিরোধ করবার মত এন্টিবডি তৈরি হয়ে গিয়েছে তা’ জানবার জন্য এন্টিবডি টেস্ট করাটা জরুরি। কিন্তু এই সেরোসার্ভে ছাড়া ব্যাপক হারে এতো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভেতরে এই এন্টিবডি টেস্ট করানোর আর কি কোনো যুক্তি আছে? আসুন, সেগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
![]() |
| Covid 19 antibody test |
এতো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভেতরে এন্টিবডি টেস্ট করানোর কোনো যুক্তি আছে কি?
এন্টিবডি
টেস্টের দ্বারা সেই সমস্ত মানুষজনকে চিহ্নিত করা যাবে যাদের করোনা টেস্ট করাবার কোনো সুযোগ
ঘটেনি অথচ যারা করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং সেরেও উঠেছেন। কিন্তু এদের চিহ্নিত করে লাভ কি? লাভ এটাই যে জানা যাবে যে কত বিরাট সংখ্যক মানুষের শরীরে এই এন্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে এবং এই মানুষগুলিও স্বস্তি পাবে এবং আতঙ্কে দিন কাটানো বন্ধ করবে এটা জেনে যে তার দ্বিতীয়বার করোনা রোগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা খুবই কম কারন তাদের শরীরে করোনা রোগ প্রতিহত করবার মত শক্তি এখনি মজুত রয়েছে। এদের ভেতরে অনেকেই হয়তো স্বেচ্ছাসেবক হয়ে করোনা রোগীদের সাহায্য করবার জন্য কাজ করতে এগিয়েও আসতে পারেন। বর্তমানে ভয়ানক করোনা আতঙ্কের ফলে বেশীরভাগ লোকই, সে পাড়ার লোকই হোক অথবা নিকট আত্মীয়জনই হোক না কেন, রোগীদের সাহায্য করতে বেরিয়ে আসছেন না, যেটা সমাজের পক্ষে অতীব দুর্ভাগ্যজনক একটি দিক।
এইরকম
ব্যপক হারে এন্টিবডি টেস্ট করার আরেকটি সুফল হলো যে জানা যাবে কোন কোন মহল্লা বা পাড়া বা অঞ্চলে করোনা রোগ লুকিয়ে দানা বেঁধে রয়েছে, তাহলে প্রশাসনের পক্ষে তৎক্ষণাৎ RTPCR টেস্টের মাধ্যমে সেই জায়গা গুলোতে ঠিক ঠিক করোনা রোগীদের খুঁজে বের করে তাদের চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত করে ফেলা সহজেই সম্ভব হবে।
এ
তো গেল এন্টিবডি টেস্টের সপক্ষের যুক্তি গুলি সম্পর্কে আলোচনা, এবার চলুন আলোচনা করা যাক এর বিপক্ষের যুক্তিগুলি বিষয়ে।
বিপক্ষের যুক্তিগুলি।
প্রথম যুক্তি।
অনেকেই
‘হু’(WHO)-য়ের
নির্দেশিকার প্রসঙ্গ এনে বলছেন যে করোনা রোগ যে দ্বিতীয়বার হবে না এমন কোনো প্রমান
নেই। কথাটা সত্যি। তবে সাথে সাথে এমন প্রমাণও নেই যে কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এই পর্যন্ত পড়েই অনেকে রে রে করে তেড়ে উঠবেন, কত সংবাদ পত্রের কাটিং এবং অন্যান্য তথ্যাদিও হাজির হয়ে যাবে দেখতে দেখতে, কিন্তু বোঝা দরকার যে এইরকম কিছু উদাহরন হয়তো এসেছে তবে কোনোটাই দ্বিতীয়বার সংক্রমণ বলে প্রমানিত হয়নি। এই ব্যাপারটা একটু ভালোভাবে বোঝার দরকার। কেউ করোনা পজিটিভ কিনা তা’ কি ভাবে জানা যাচ্ছে? অবশ্যই RTPCR টেস্টের মাধ্যমে। খুব উন্নত মানের RTPCR পরীক্ষা করলেও দেখা গেছে প্রতি ১০০ জনের ভেতর ৪টি এমন পজিটিভ রেজাল্ট আসছে যারা আসলে পজিটিভ নয়। একে বলা হয় ফলস পজিটিভ কেস। আমাদের দেশে RTPCR kit এমন কিছু উচ্চ মানের নয়। তাই আমাদের দেশে ফলস পজিটিভ কেসের সংখ্যাও অন্যান্য দেশের তুলনায় যথেষ্ট বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তথ্য পরিসংখ্যান বলছে যে দেশের পনেরো লক্ষ পজিটিভ কেসের ভেতর প্রায় ষাট থেকে সত্তর হাজার ফলস পজিটিভ। শুরুর দিকে তাও কনফার্মেটরি পরীক্ষা করা হচ্ছিল অর্থাৎ একবার পজিটিভ এলে দ্বিতীয়বার টেস্ট করে দেখে নেওয়া হচ্ছিল টেস্টটা ঠিক হলো কি না, তবে বর্তমানে ICMR-এর নির্দেশিকা মেনে একবার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এলে দ্বিতীয়বার টেস্ট করা হচ্ছে না বেশিরভাগ জায়গাতেই, তাই বেশ কিছু জনের প্রথমবার যে পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে তা হতেই পারে ঐ ফলস পজিটিভের ঘটনা। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে করোনা রোগটি অনেক সময় এক মাস সময় ধরে থেকে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে RTPCR পরীক্ষা নেগেটিভ হবার অপেক্ষা না করে ১৪ দিন পর রোগীকে ছেড়ে দিলে সঙ্ক্রমন থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে ফের যদি এই সব রোগীদের কারো করোনা ধরা পড়লো সেটা পুনঃ সংক্রমণ নয়, আগের সঙ্ক্রমণেরই জের। এই প্রসঙ্গে আরো একটি কথা না উল্লেখ করলেই নয়, সেটি হলো, RTPCR পরীক্ষাটিতে মানুষের লালা রসের ভেতরে করোনা ভাইরাসের সরীরের কিছু পদারথ খুজে বের করা হয়ে থাকে, এবং সেটি খুজে পেলে তবেই করোনা পজিটিভ বলা হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে করোনা রোগ ভালো হয়ে যাবার পরেও কারো কারো লালারসের ভেতর করোনা ভাইরাসের সেই পদারথগুলির মৃত কোষ পাওয়া যাচ্ছে। এই সব ভালো হয়ে যাওয়া রোগীদের যদি কোনো সন্দেহের বশে আবার RTPCR টেস্ট করানো হয় তাহলে তাদের করোনা পজিটিভ আসবে। কিন্তু এটি কোনো পুনঃ সংক্রমণের ঘটনা নয়, কেবল ঐ মৃত কোষগুলি যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে তাই রিপোর্ট পজিটিভ আসছে। কোরিয়ান সেন্টার ফর দিজিজ কন্ট্রোলের বিজ্ঞানীরা এই পুনঃ সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে সব কটি কেসই লালা রসে ঐ মৃত করোনা ভাইরাসের কোষ পাবার ফলে পজিটিভ এসেছে। এছাড়াও করোনা পরীক্ষাটি যদি RTPCR পদ্ধতিতে না করে ট্র্যু ন্যাট পদ্ধতিতে করা হয় তাহলেও অনেক সময় ফলস পজিটিভ আসতে পারে। ট্র্যু ন্যাট পরীক্ষাটি দুটি ভাগে করা হয়ে থাকে, অনেক জায়গায় এক ভাগে পরীক্ষাটি করেই রিপোর্ট পজিটিভ বলে ঘোষনা করা হচ্ছিল, তাই ICMR বর্তমানে দেশের অনেক জায়গায় এই পরীক্ষাটি বন্ধ করে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই পুনঃ সংক্রমণ নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছে এবং হচ্ছেও। যেমন, চীন, ইতালি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া এবং ইউকের অনেক বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন তবে এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা পুনঃ সঙ্ক্রমনের সপক্ষে কোনো প্রমান দেখাতে পারেন নি। চীনের মেডিক্যাল কলেজের এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে বাঁদরেরা প্রথম বার করোনা দ্বারা সংক্রমিত হবার পরে দ্বিতীয়বার তাদের শরীরে ভাইরাস ছেড়ে দিলেও কেবল তাদের নাকের ভেতরে ছাড়া, ফুসফুসে অথবা শরীরের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশে করোনা সংক্রমিত
হচ্ছে
না। এখনো পর্যন্ত পুনঃ সংক্রমণের কোনো ঝুঁকির পক্ষে কোনো প্রমান অন্তত নেই। তার মানে কি এই যে কারোরই কখনো পুনঃ সংক্রমন হবে না আর হলেও সেটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে না? না, তা কিন্তু একেবারেই
নয়। অনেক লোকেরই একবারের বেশি বসন্ত রোগ হয়েছে। যদিও তাদের সংখ্যা খুবই কম, তবু হয়েছে
তো! নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষনা থেকে জানা যাচ্ছে যে করোনা আক্রান্ত লোকেদের ভেতর ২ থেকে ৮ শতাংশের শরীরে কোনো এন্টিবডিই তৈরি হয় না। এদের ক্ষেত্রে পুনঃ সঙ্ক্রমনের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। তবে যাদের শরীরে এন্টিবডিই তৈরি হয়না তাদের এন্টিবডি
পরীক্ষাতেও কোনো সংক্রমন ধরা
পড়বে না, তাই তাদের অসাবধান হবার কোনো কারণই থাকতে পারে না।
দ্বিতীয় যুক্তি।
কেউ
কেউ এন্টিবডি পরীক্ষা করানোর বিপক্ষে আর একটি যুক্তি দেখাচ্ছেন। তারা বলছেন যে করোনা ভাইরাসের এন্টিবডি মানুষের শরীরে ২ থেকে তিন মাসের বেশী স্থায়ী হয়না, এবং তারপর থেকে ধীরে ধীরে তার প্রতিরোধকারি ক্ষমতা কমে যেতে থাকে, তাই অল্প কিছুদিন পরেই সেই ব্যক্তি পুনরায় সংক্রমিত হয়ে উঠতেও পারেন। এই যুক্তিটা কিন্তু বেশ ভালো। অনেকগুলি গবেষণা পত্রিকাতেও এই তথ্য জানা যাচ্ছে। লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের একটি গবেষণা এবং নেচার পত্রিকাতে প্রকাশিত চীনের একটি গবেষনার দ্বারা এই কথার সত্যতা প্রমানিত হয়েছে। এই খবরগুলি বেশ ফলাও করে আমাদের মিডিয়া প্রচারও করেছে। কিন্তু যেটা মিডিয়া জানায়নি সেটা হচ্ছে এর সাথে সাথে আরো কিছু গবেষনা এবং তার ফলাফলের খবর। গত কয়েক মাস আগে থেকেই অর্থাৎ মে মাস থেকে জুলাই মাসের ভেতর এই নিয়ে বেশ চমকপ্রদ কয়েকটি গবেষণার
খবর পাওয়া যাচ্ছে যেগুলি খুবই আশাব্যাঞ্জক। যেমন গত মে মাসে সেল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণা, সুইডেনের ক্যারলিনস্কা ইন্সটিটিউটের একটি গবেষণা এবং জুলাই মাসে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণা। এ গুলো থেকে আমরা কি জানতে পারছি? সেটা বলার আগে সামান্য একটা জিনিস আগে জেনে
নিতে হবে। মানুষের শরীরের এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাটি একটু অন্য রকম, বেশ জটিল ধরনের। এন্টিবডির
রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা এক রকমের, আবার শরীরের আরো কতকগুলি নিজস্ব মেকানিজম রয়েছে
রোগকে প্রতিরোধ করবার জন্য। তারই একটি হচ্ছে টি সেল। টি সেলের কাজ হচ্ছে শরীরে কোনো রোগ বাসা বাঁধলেই এই টি সেল রোগের কারন কে না মেরে, অর্থাৎ ভাইরাস টিকে আক্রমন না করে সংক্রমিত
কোষ গুলোকে বেছে বেছে মেরে ফেলে, যার ফলে সেই ভাইরাসটি আর দ্রুত শরীরের ভেতর ছড়িয়ে
পড়তে পারেনা। এন্টিবডি টেস্টে কিন্তু এই টি সেলকে খুজে পাওয়া যায়না। আমাদের এই ওপরে উল্লেখ করা গবেষনা
গুলো দেখাচ্ছে যে মানব শরীরে একবার করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হলেই এই টি সেল গুলো এই করোনা ভাইরাস কে মনে রেখে দিচ্ছে, যাকে বলে টি সেল মেমোরি। এই মনে রেখে দেবার ফলে হচ্ছে কি আবার যদি এই করোনা ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে তাহলে এন্টিবডি যত কমই প্রতিরোধ করুক এই রোগটিকে টি সেল কিন্তু রোগ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই সরাসরি আক্রান্ত কোষগুলিকে মারতে শুরু করে
দেয়, যার ফলে রোগটি আর বাড়তেই পারেনা। বাঁদরের ক্ষেত্রে যে নাকের মধ্যে ছাড়া ফুসফুসে বা অন্য
কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে নি তার
কারণও সম্ভবত এই টি সেল। আর একটা কথা, গবেষনায়
এটাও দেখা গেছে যে একশো শতাংশ কোভিড আক্রান্তদের ভেতরেই এই টি সেল মেকানিজম কাজ করছে, উপসর্গ যুক্ত এবং উপসর্গ বিহীন দু-ধরনের রোগীদের মধ্যেই।
![]() |
| Covid 19 antibody test |
তৃতীয় যুক্তি।
আরেকটি
বিরোধী যুক্তি হচ্ছে এই যে
ভাইরাস
সব সময়েই তার চরিত্র বদলায় অর্থাৎ ‘মিউটেট’ করে। মনে করা যাক ভাইরাসটির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলো এবং অল্পদিনের ভেতরেই ভাইরাসটি তার
চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে ফেললো, যার ফলে তার আগের কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা আর কার্যকরী থাকলো না। এমনটা হলে সত্যিই বেশ মুস্কিল। কয়েক বছর পরপর যে আমাদের ফ্লু হয়, তারও কারন মুখ্যত এইটাই, ভাইরাসের ‘মিউটেশন’।
তবে ২০১৩ সালের আর এন এ বায়োলজি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে যে ফ্লু ভাইরাসের তুলনায় এই করোনা ভাইরাসের মিউটেশনের হার অনেকটাই কম। এছাড়াও আগে যে টি সেল নিয়ে গবেষনার কথা বলেছি, সেখানে আরো বলছে যে এই টি সেল গুলি করোনা ভাইরাসকে কেবল সামান্য একটি বা দুটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিনে রাখে না। এই ভাইরাসটির প্রায় তিরিশটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে্র খবর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তার স্মৃতিতে ধরে রেখে দেয় এই টি সেলগুলি। তাই একটা বা দুটো মিউটেশনে ভাইরাসটি অচেনা হয়ে যাবেনা, তার জন্য দরকার অনেক কটি মিউটেশন যেটা খুব সহজ নয়।
চতুর্থ যুক্তি।
এন্টিবডি
পরীক্ষার বিরুদ্ধে কেউ কেউ এই যুক্তিও দিচ্ছেন যে সংক্রমিত হবার প্রথম দশ দিনের ভেতর মাত্র ৩০-৪০শতাংশ রোগীর শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে সংক্রমণের প্রথম দিকে কেউ টেস্ট করালে পজিটিভ আসার সম্ভাবনা কম এবং সেই ব্যক্তিটি ক্যাম্পে আসা বাকিদেরও সংক্রমিত করবে এবং পরীক্ষা নেগেটিভ
এলে নিজেকে আইসোলেট না করে ঘুরে বেড়াবে এবং রোগটিকে ছড়াবে। অদ্ভুত হাস্যকর যুক্তি এটি। প্রথমত এন্টিবডি টেস্টটি কোনো করোনা টেস্ট নয়, সেটা বোঝা দরকার। এটা শরীরের ভেতর করোনা রোগটিকে প্রতিরোধ করবার মতো এন্টিবডি আছে কিনা তা’ জানবার পরীক্ষা। যারা ক্যাম্পটি করবেন, তারাও আশাকরি এমন হাস্যকর কোনো দাবী করছেন না। এন্টিবডি
শরীরে না থাকলে ভবিষ্যতে সেই ব্যক্তিটি করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতেই পারেন এটা আশাকরি তিনি বুঝেই ক্যাম্পে আসবেন। এছাড়াও যদি ধরে নিলাম যে কোনো উপসর্গ বিহীন রোগী ক্যাম্পে এলেন এবং পরীক্ষার ফলাফলটিকে বুঝতে না পেরে যথেচ্ছ ভাবে ঘুরে বেড়ালেন এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে বেড়ালেন, সেক্ষেত্রে ভাবুন তো তিনি এই এন্টিবডি টেস্টটি করাতে না
এলেই
বা কি হতো? এই ব্যক্তিটি তো নিজের ইচ্ছায় কখনোই RTPCR টেস্ট করাতেন না, কারন তার কোনো উপসর্গই নেই। সেক্ষেত্রেও এই ব্যক্তিটি যথেচ্ছ ভাবে ঘুরেই তো বেড়াতেন এবং রোগটি ছড়াতেন। তাহলে এই ক্যাম্পের জন্য আলাদা করে কি ক্ষতিবৃদ্ধি হলো বলুন তো?
পঞ্চম যুক্তি।
পঞ্চম
বা শেষতম বিরুদ্ধ যুক্তিটি হলো যে কয়েকজন বলছেন এন্টিবডি টেস্ট না করে এন্টিজেন টেস্ট কেন করানো হচ্ছে না। এরা বলছেন যে এন্টিজেন টেস্ট গোষ্ঠী সংক্রমণ আটকাতে বেশি কাজে দেবে কারন এর থেকে সরাসরি কে আক্রান্ত তা ধরা পরবে। এই বিষয়ে দুটো যুক্তি আছে। প্রথমটি হলো, এন্টিজেন টেস্ট করোনা ডিটেকশন টেস্ট, এটি সরকারের অনুমতি ছাড়া করা যায় না। দ্বিতীয়টি হলো, এন্টিজেন টেস্টে অনেক
সময়েই করোনা ধরা পড়ে না যার ফলে সংক্রমিত কাউকে ভুল করে করোনা হয়নি বলে ছাড়পত্র দিয়ে
দেওয়া হলে তার বিপদ আরো মারাত্মক হবে। এই প্রসঙ্গে আর একটি কথা আবারো বলবার আছে এখানে,
এন্টিবডি টেস্টের উদ্দ্যেশ্য
বর্তমান করোনা আক্রান্ত রোগীদের খুঁজে বের করা নয়, সংক্রমণ কাটিয়ে যারা ভালো হয়ে উঠেছেন তাদের চিহ্নিত করাই এর মুখ্য উদ্দ্যেশ্য।
মনে
রাখবেন সারা পৃথিবীতেই বর্তমানে ব্যাপক হারে এন্টিবডি টেস্ট করা হচ্ছে। লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের মতো শহর গুলি, যেখানে আক্রান্তের সঙ্খ্যা অনেক বেশি সেখানেও এন্টিবডি টেস্ট হচ্ছে ব্যাপক ভাবে। অন্তত মানুষ যদি জানতে পারে যে তার শরীরে রোগ প্রতিরোধকারি এন্টিবডি কাজ করছে তাহলে আতঙ্ক এবং চিন্তা মুক্ত জনগন অপর রোগীকে দেখে অমানবিক হয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে না। আশাকরি আবার আমরা মনুষ্যত্ব ফিরে পাবো, আশাকরি আবার আমরা মানুষ হয়ে উঠবো খুব তাড়াতাড়ি।
![]() |
| Covid 19 antibody test |




0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.