রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৭
জুলুক
ছাড়ানোর পর থেকে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের পাথুরে রুক্ষ প্রকৃতি প্রকট হতে শুরু করে।
নাথাং ভ্যালী থেকেই কেবল ন্যাড়া রুক্ষ পাহাড়। ঠিক যেন কাশ্মীর হিমালয়ের লাদাখ
উপত্যকা অঞ্চল। পাহাড়ের মাথায় মাথায় কখনো যাত্রা পথের পাশেই সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত
বাঙ্কার চোখে পড়তে লাগলো। জুলুকের পরে নাথাংযের কাছ বরাবর জায়গা থেকে বাঁ দিকে বিস্তীর্ণ
ভারত-ভূটান সীমান্ত। যদিও ভূটানের সাথে চীনের অংশটুকুও পাহারা দেবার গুরুদায়িত্ব
সামলান আমাদের ভারতীয় জওয়ানেরাই। অসীম সাহসী আমাদের এই বীর ভাইদের নিষ্ঠা ও
দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে সততই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
আমরা চলেছি কুপুপ লেক দেখতে।
কুপুপ থেকে নাথুলা পাসের কোল ঘেঁষে এই রাস্তা ছাঙ্গু লেক পেরিয়ে সোজা চলে গিয়েছে
সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকের দিকে। আমরা কেবল কুপুপ পর্যন্তই যাব। এবড়ো খেবড়ো অসংখ্য
পাহাড়ী বাঁক পেরিয়ে গাড়ী পৌঁছল কুপুপ। স্বচ্ছ নীল জলের ছোট একটি হ্রদ। স্থানীয়রা
বলে হাতী পোখরি লেক আর সর্বসাধারণের কাছে এই লেকের আর একটি নাম এলিফ্যান্ট লেক।
লেকের ডান প্রান্তের সঙ্গে হাতীর শুঁড়ের আর বাম প্রান্তটির সঙ্গে হাতীর লেজের মিল
রয়েছে, তাই এমন নাম। কুপুপ থেকে খানিকটা
দূরে নাথুলা পাসের পাহাড়ের মাথার ওপর চীন সেনাদের বাঙ্কারগুলোও চোখে পড়ে এখান
থেকে।বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া গুলি শেষ দুপুরের খর রৌদ্রে চকচক করছে। সেই দিকে চেয়ে
এক শ্রদ্ধা মিশ্রিত সুগভীর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে রইলাম বেশ খানিকক্ষণ। এই আমার দেশ, কোথাও রুক্ষ পর্বতময়, কোথাও মরু বালুরাশির ধুলি কণায়
ধূসরিত,
আবার কোথাও নিবিড় শ্যাম
ছায়া ঘন শান্ত স্নিগ্ধ রসে মহিমান্বিত, অথচ
কি আশ্চর্য পরমানন্দময় এক প্রশান্তি সর্বক্ষণ এই দেশের অন্তরে অনুরণিত হয়ে চলেছে।
ভারত আত্মার সেই গম্ভীর প্রাণ সঙ্গীত কেবলমাত্র একজন ভারতীয়ই অনুভব করতে পারে।
কুপুপ
থেকে এবার আবার নেমে চলা আমাদের ফিরতি পথেই। আজ আমরা পদমচেন ফিরে ওইখানেই রাত্রি
বাস করবো। নাথাং এর পরে এক জায়গায় সেনা বাহিনী রাস্তা মেরামতির কাজ করছে দেখা
গেলো। পিচ ঢালা চলছে তখন। বেশ কিছুক্ষন এইখানে আটকে রইলাম আমরা।
বেশ বড়ো সড়ো একটি
সেনা ছাউনি এটি। পাহাড়ের ঢালে টিনের চাল দেওয়া বড় বড় ঘর, কোয়ার্টার, স্কুল, ব্যাঙ্ক সব আছে এই মিলিটারি
ক্যাম্পে। একটি আর্মি স্কুলে তখন ছুটি হয়েছে বোধহয়। লাইন করে রাস্তার ধার দিয়ে
বাড়ী ফিরছে স্কুলের ছেলে মেয়েরা। একজন অল্পবয়সী সুপুরুষ সম্ভবত সেনা ক্যান্টিন
থেকে বাজার করে ফিরছিলেন, ওনাকেই
জিগ্যেস করলাম আর কত সময় লাগবে এই রাস্তা মেরামতির কাজে। দাঁড়িয়ে পড়ে বেশ কিছুক্ষন
গল্প করে গেলেন ভদ্রলোক। সুদূর হরিয়ানা থেকে এসেছেন এই ইঞ্জিনিয়র ছেলেটি। প্রায় দু
বছর আছেন সিকিমে। কোলকাতা আসেননি কখনো, কোলকাতা
সম্পর্কে টি ভি তে খবরের কাগজে আর বইতে পড়েছেন। খুব আগ্রহ কোলকাতার দুর্গাপূজা
সম্বন্ধে জানবার। বললাম চলে আসুন একবার পুজোর সময়, নিজের চোখে দেখে যান বাঙালীর
প্রাণের উৎসবকে। বললেন, ইচ্ছা
তো হয়, কিন্ত উপায় হয় না, ফি বছর বাড়ীতে মার কাছেও যেতে
পারেন না ইউনিট ছেড়ে। ভারী কষ্ট হলো এই ছেলেটির জন্য। হরিয়ানার কোন গ্রামের বাড়ীতে
পথ চেয়ে বসে আছেন ওর মা। আর ওনার বীর সন্তান আমাদের সকলের স্বার্থে, সমগ্র দেশের স্বার্থে, আপনার সমস্ত ক্ষুদ্রতাটুকু
বিসর্জন দিয়ে দেশমাতৃকার রক্ষা কবচ হয়ে সুদূর চীন সীমান্তে কর্তব্যে লীন হয়ে আছেন।
মনে মনে প্রণাম জানালাম সেই সব মায়েদের যারা এদের মতো বীর সন্তান দের গর্ভে ধারণ
করেছেন।
গাড়ী আবার এগোতে শুরু করেছে এতক্ষনে। উৎরাই পথে নামতে বেশিক্ষন সময় লাগলো
না। ঘরে পৌঁছে সেই পাহাড়ী শেষ বিকেলে যখন খেতে বসলাম ঘড়িতে তখন বেলা সোয়া চারটে।
রাস্তার
পাশে এই বাড়ীর বড়ো চাতালে চেয়ার পেতে বসে পাহাড়ের আড়ালে একটু একটু করে ডুবে যাওয়া
অস্তগামী সূর্যের রঙে রঙিন হয়ে থাকা সিঁদুর মাখা আকাশ দেখছিলাম। আশ্বিনের শেষ
বিকেল। পেঁজা তুলোর মতো গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘের ভেলা এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ের
মাথায় বৈকালিক ভ্রমণে বেড়িয়েছে যেন। পড়ন্ত সূর্যের রঙ থেকে রঙ নিয়ে কি অপরুপ সাজেই
না সাজুগুজু করে বেড়াতে চলেছে তারা, কোথাও
হাল্কা গোলাপী, কোথাও
পোড়ামাটির রঙ, কেউ
আবার মাথার ওপর চূড়ো করে কুচকুচে কালো চুল গুছিয়ে বেধে রেখেছে। যত দেখছি আশ যেন
কিছুতেই মিটছে না।
বাইরের
আলো জ্বেলে ডিকি এসে আমার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলো। এবার ওর দোকান খোলার সময়।
আমাদের জন্য চায়ের ব্যবস্থা করে তারপর দোকান খুলবে। বললো বাবা মন্দির থেকে মন্ত্র
পড়া জল আনোনি? আমি
আনিনি শুনে বললো বাবার নামে মন্ত্রপূত ওই জল সবসময় বাড়ীতে রাখতে হয়। তাহলে
গৃহস্থের কল্যান হয়, রোগ
জ্বালা,
আধি ব্যধি প্রভৃতি কাছে
ঘেঁষতেও ভয় পায়। বাবা সর্বদা গৃহস্থকে যে কোন বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন। বারবার
বলে দিলো এর পরের বার যেন অবশ্যই এই জল নিয়ে যাই। হাসিমুখে ওকে আশ্বস্ত করলাম যে
পরের বার আর ভুল করবো না। আশ্চর্য হলাম ওর সরল বিশ্বাসের কথা ভেবে। এই সুদূর
সীমান্তবর্তী প্রান্তিক গ্রামে ওর এই বিশ্বাসটুকুই একমাত্র পাথেয়, নইলে সেনাবাহিনীর সিপাহী বীর
সৈনিক হরভজন সিং, যাঁর
কর্তব্যে অবিচল থেকে দেশমাতৃকার সেবায় প্রাণ উৎসর্গ করার কথা আজও সারা দেশ অত্যন্ত
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকে, তাকেও
কতো অনায়াসে সরাসরি মঙ্গলময় দেবতার আসনে উন্নীত করেছে এঁরা। মানুষই যে কর্মফলের
দ্বারা দেবত্বে উন্নীত হয় আজ এই মেয়েটি কেমন করে যেন নিজের মতো করে শিখিয়ে দিয়ে
গেলো আমায়। আনন্দময়তায় যেন পূর্ণ হয়ে উঠলাম আরো একবার।
বিকেলের
চা পকৌড়া নিয়ে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া গেলো ঘরে একসাথে সকলকে নিয়ে। হাসি,ঠাট্টা, গল্প গান দিয়ে কখন যে ঘড়ির কাঁটা
রাত ন’টা পেরিয়ে গেলো বুঝতেই পারিনি।
খাবার ঘর থেকে ডাক এসেছে। এই ঠান্ডায় তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া শেষ হলে এই বাড়ীর লোকেদেরও
কিছুটা স্বস্তি হয়। ভাত, রূটি, ডাল, ফুলকপির তরকারি, আলুভাজা, মুরগীর ঝোল, স্যালাড, আচার, পাঁপড়।
খাবার পর অন্ধকারে ছাদের
ওপর কিছুক্ষন পায়চারী করছিলাম। নির্মেঘ আকাশ, তমসা
মগ্ন মৌনী নিশীথিনী । অসংখ্য নক্ষত্র রাজি, যেন
লক্ষ লক্ষ হীরে মনি মানিক্যের বিশাল এক চাঁদোয়া জড়িয়ে সম্পূর্ণ আকাশটা আমায়
আলিঙ্গন করবে বলে উন্মুখ হয়ে আছে। যতদূর চোখ যায় কেবল সীমাহীন অনন্ত পাহাড়ের মসি
লিপ্ত চূড়া গুলি আবছা বাসনার মতো সেই আভরণ দ্যুতিতে বাঙ্ময় হয়ে জেগে আছে যেন। অতুল
বিস্ময়ে আপনা হতে হাত জোড় হয়ে এলো। হে অবিনশ্বর চির জাগ্রত পৃথিবী, আশীর্বাদ করো যেন যুগে যুগে যে
কোন অনাগত কালের স্নেহচ্ছায়ায় তোমার বিস্তীর্ণ কোলে আমার ঠাঁই হয়। তোমার এ অকুন্ঠ
রুপরাশি থেকে কখনো কোন যুগে আমায় বঞ্চিত করোনা প্রভু।
যথারীতি
সকাল ছ’টায় চা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে
গেলো এই বাড়ীর দুই গিন্নি। স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে আটটা
বেজে গেলো। আজ আমরা যাব রোলেপ। সেখানেই রাত্রিবাস আজকের। পদমচেন থেকে রোলেপ খুব
একটা দূরে নয়। এক পাহাড়ের পথ যদিও, কিন্তু
সে পথ এতোটাই খারাপ যে গাড়ী চলাচলের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। তাই অন্য পথে রংলি
ঘুরে ডান হাতে পিচ ঢালা গ্রাম্য পথ ধরে এগোনো গেলো। সময় লাগলো বেশী, তবে আমাদেরও এমন কোন রাজকার্য্য
নেই, বিশেষতঃ যখন দেশ দেখতেই বেড়িয়েছি
তখন যতটা সম্ভব ধীরে ধীরে একটু একটু করে দুই চক্ষুর ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে
আস্বাদন করাটাই শ্রেয় ও বিবেচিত যাতে ভবিষ্যতের কোন কুব্জ্ঝটিকাতেও তা আর বিনষ্ট
হতে না পারে।
রংলি
বাজার ছাড়িয়ে এসে একটা নিরালা চায়ের দোকান দেখে দাঁড়ানো গেলো। বেশ ফাঁকা ফাঁকা এই
জায়গাটা,
রংলি স্ট্যান্ডের মতো
ভীড় নেই এখানে। চা বিস্কুট খেয়ে আবার চললাম আমরা। একটু এগিয়েই ডান দিকে রাস্তা
সোজা পাহাড়ের খাদ ঘেঁষে পৌঁছে গিয়েছে রোলেপ। এখান থেকে দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার।
সুন্দর ছায়া ঘন পথ। একটু এবড়ো খেবড়ো আর মাঝে মধ্যে পিচ উঠে গিয়ে গর্ত হয়ে পড়েছে
কিছু কিছু জায়গায়। তা হোক, তবে
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট ছোট বাড়ী গুলোর রঙিন সজ্জা, কোথাও পাতাবাহার, কোথাও কেয়ারী করা সার সার লাল
বোগেনভালিয়া,
কেউ কেউ আবার কাঁটা
তারের বেড়ায় ঘেরা বাড়ীর ছোট্ট বাগানে বাহারী মরশুমি ফুলের রঙিন কার্পেট বিছিয়ে
রেখেছে যেন,
এই সব দেখতে দেখতে বেলা
প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ পৌঁছলাম রাস্তার ওপর খাদের কোলে আমাদের আজকের বাসস্থানে।
ধাপে ধাপে নীচের দিকে নেমে গেছে বাড়ীটা। প্রথম ধাপে প্রায় ছ’টা ঘর, সিড়ি দিয়ে নেমে পরের ধাপেও ঠিক
একই রকম ছ’টা ঘর। এই ভাবে ধীরে ধীরে নীচের
দিকে নেমে প্রায় চার তলা বাড়ী। একেবারে শেষের তলাটি বেশ বড়ো আধুনিক রান্না ঘর, সাথে বড়ো একটি খাবার ঘর। বেশ
সুন্দর পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা। আমরা গাড়ী থেকে মাল পত্র নামিয়ে একটা ঘরে আপাততঃ
ঢুকিয়ে দিয়ে আবার গাড়ীতে চেপে বেড়িয়ে পড়লাম।
চলবে.................................................................................





0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.