ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৪

ঘুরে এলাম লামাদের দেশে,  পর্ব - ৪ 




ladakh-tour,Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


সাউথ পুল্লু থেকে একটু একটু করে দুরের বরফ ঢাকা চূড়া গুলো যেন একেবারে ধরা ছোঁয়ার সীমার মধ্যে এসে দাঁড়ালো। এক বিশাল গ্লেসিয়ার ঠিক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, যেন এক্ষুনি গড়গড়িয়ে নেমে আসবে রাস্তা জুড়ে। 


অবিস্মরণীয় দৃশ্য। দেখে দেখে যেন আশ মিটছে না আমাদের। নাজির ভাই আমার কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো, এবারে আমরা বরফ ছুঁড়ে খেলবো।রাস্তা এতটাই খারাপ এখানে যে পাঁচ মিনিটের পথ যেতে প্রায় আধ ঘন্টা লেগে গেল। রাস্তার দুধারে বরফ। পথের খানা খন্দের যেখানে জল জমে থাকার কথা সে গুলোতেও জমাট বরফ।

ladakh-tour,Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


দেখতে দেখতে এসে পড়লাম পৃথিবীর সর্বোচ্চ পথের শীর্ষ বিন্দুতে।  এই সেই খারদুং লাটপ। বেশ কিছু গাড়ী আমাদের আগেই পৌঁছে গিয়েছে এখানে। সীমানা স্মারক ঘিরে ছবি তোলবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। আমেরিকান, জার্মান, রাশিয়ান, মালয়েশিয়ান তো আছেই সেই দলে, ভারতীয়রাও নিতান্ত কম নেই। যে যার নিজের দেশের পতাকা নিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত। এই রাস্তা ধরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী  কঠিন বিভীষিকাময়  সিয়াচেন হিমবাহ শাসন করতে যান। ধন্য সেই ভারত মাতার বীর সন্তানদের যারা নিজেদের বর্তমানকে অকাতরে বলিদান করেন কেবল আমাদের আগামীকাল যেন বিপদমুক্ত থাকে তার জন্য। 


ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


বরফ নিয়ে ছোঁড়াছুড়ি খেলাধুলা অনেক হল, ছবি ও অনেক তোলা হল, বারবার গাড়ী চালকেরা সতর্ক করছিলেন বেশীক্ষন এখানে থাকবেন না কেউ, শ্বাস কষ্ট শুরু হতে পারে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। বুঝিয়ে শুনিয়ে সকল্কে গাড়ীতে তুলে আবার শুরু হল পথ চলা।


খারদুং লা পাস ছাড়িয়ে এসে এবার দাঁড়ানো গেল খারদুং গ্রামে। ছোট্ট সুন্দর একফালি গ্রাম। এখানে আজ মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতি। বেশ বড়ো একটি রেস্টুরেন্ট, মালকিন একটি বেশ অল্প বয়েসী মেয়ে, তার বর আর মা অথবা শাশুড়িকে নিয়ে কি অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় ও ধৈর্যের সাথে যে প্রায় ৫০-৬০ জন বুভুক্ষু খরিদ্দারকে হাসি মুখে সামলে চলেছে তাভাবলেই অবাক লাগে। 

ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


খাবার পর এবার নেমে চলা। উৎরাইয়ের পথ। রাস্তার প্রতিকূলতা এতটাই যে প্রায় নাচতে নাচতে নেমে চলেছি আমরা। নেমে চলেছি খুব মিষ্টি একটা নদের প্রায় কোলে। অসম্ভব সুন্দর এই নদের নাম সায়ক। নাম শুনে পুরুষ মনে হল, তাই নদ বললাম। সায়ক শব্দের অর্থ তীক্ষ্ণ ধারালো অস্ত্র, খড়্গ। নিশ্চয়ই এই আপাত শান্ত নিরীহ স্রোতধারা মাঝে মাঝে অত্যন্ত ক্ষুরধার হয়ে  ওঠেন আর দুই পাশের এই নিরেট কঠিন নির্দয় পাথরের স্তুপকে সদর্পে গুঁড়োগুঁড়ো করে অট্টহাস্যে কলনিনাদে প্রবাহিত হন। কে জানে! শিবস্বরুপ প্রশান্তের সেই রুদ্রতাকেও মনে মনে প্রণাম জানালাম। এই সায়ক নদের অববাহিকাতেই শুরু হয়েছে রুক্ষ বালিয়াড়ি। কখনো ধার দিয়ে কখনো মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে ধারা। 


ladakh-tour,Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


কিছুদূর এগিয়ে পাহাড়ের মাথায় চোখে পড়লো এক বৌদ্ধ গুম্ফা বা মনাস্ট্রি। পাহাড় ঘুরে পৌঁছে গেলাম ওপরে। দিস্কিট মনাস্ট্রি। খুব সুন্দর পরিবেশ। শান্ত নির্জন। ধর্মচক্র ঘুরিয়ে আমরাও বললাম ওম মনিপদ্মে হুম।


ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour



এখানেও একটি সুউচ্চ বুদ্ধ মূর্তি দিগন্ত আলো করে শোভা পাচ্ছেন। মন ভরে গেল। দিস্কিট ছেড়ে আবার এগোনো। এবার চলেছি হিমালয়ের বিস্ময় সেই শীতল মরুভূমির দিকে। দুই ধারেই এখন রুক্ষ পাথুরে পাহাড়। মসৃন পিছলে পড়া ত্বক নিয়ে কোথাও হলুদ, কোথাও কালো আবার কোথাও পাটকিলে রঙের প্রসাধনীতে রঙিন হয়ে আছেন। শুধু পাথরেরও যে এত রঙ হয় তাএদেশে না এলে জানাই হতোনা হয়তো। 

ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


দেখতে দেখতে এসে পড়লাম বিখ্যাত ন্যুব্রা মরুভূমিতে। বেশ ঠান্ডা। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে।একেই বোধহয় হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বলে। অথচ দাঁড়িয়ে রয়েছি আদিগন্ত বিস্তৃত রুক্ষ মরুভূমির ওপর। ঢেউ খেলানো বালির ছোট ছোট টিলা আর কাঁটা ঝোপ সব কিছুই বিদ্যমান, কেবল যে দিকে চোখ যায় গগনচুম্বী পর্বতেশ্রেনী ঘিরে রেখেছে এই ধবল বর্ণ বালিয়াড়ীকে। এই মরুভূমি হলুদ নয়। সাদা। দুই কুঁজ বিশিষ্ট উট যার স্থানীয় নাম লামা এই মরুভূমির জাহাজ।

ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে উটের পিঠে চড়বার জন্য অনেক লোক অপেক্ষা করছেন তখন। গোধূলির রঙে  রাঙ্গা হয়ে উঠেছে পাহাড়ের পিছল গাত্র। এই মুহূর্তে যখন সমস্ত  পৃথিবীর মানুষ Corona Virus -এর চিন্তায় ভীত হয়ে আছে, সব দুশ্চিন্তা দূরে সরিয়ে একবার সেই   শান্ত সুশীতল বরফের চূড়া গুলোর মাঝখানে থাকা এই শীতল মরুভুমি আর তার সৌন্দর্যের  কথা চিন্তা করুন।সত্যি সত্যি মনে প্রশান্তি অনুভব করবেন। 


ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


সারি সারি উট চলেছে সওয়ারীকে পিঠে বসিয়ে। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। উটচালক কেবল সামনের প্রথম উটের দড়ি ধরে আছে। বাকি উটেরা ছোট ছোট দড়ি দিয়ে পরস্পরের সাথে যুক্ত। চলতে চলতে এ ওর পিঠে মুখ ঘসছে, ঘাড়ে কামড় বসাচ্ছে আর এই উটেদের পারস্পরিক ঘষাঘষির ফলে যাত্রীদের মহা সমস্যা। অল্প সময় পর হঠাৎ উঠলো বালির ঝড়। এটা নাকি এই শেষবেলাকার অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলোয় প্রকৃতি দেবীর নিত্যদিনের একটি খেলা। দেব-দেবীদের ব্যাপার স্যাপার বোঝা কি আর আমাদের মতো ছা-পোষা গেরস্তের কম্মো! কোন খেলা যে খেলবি কখন, ভাবি বসে সেই কথাটাই’, কবি তো সেই কবেই লিখে গেছেন। চোখে মুখে বালির দুরন্ত ঝাপ্টা সহ্য না করতে পেরে ফিরে এলাম। পেছনে তখন কেবল বালুকাময় আঁধার কুয়াষা যেন। এবার রাত্রির আশ্রয়ে ফিরতে হবে। 



ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


অনেক বড়ো এলাকা নিয়ে এই রিসোর্টটি। আপেল, আঙ্গুর যেমন ফলেছে তেমনই অনেক সবজিও রয়েছে বাগানে। বড়ো একটা স্থলপদ্মের গাছে ফুটে আছে ফুল। খুব ভালো পরিবেশ। তবে এই অঞ্চলে কেবল মাত্র সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিষেবা পাওয়া যায়। সারাদিন ও রাতের মধ্যে কেবল ওই সময়টাই ব্যাতিক্রম।আমাদের হোটেলে সকালের জল গরমের জন্য সোলার হিটার ছিল বলে ঐ ঠান্ডায় তবু স্নান বা মুখ হাত পা ধোওয়ার অসুবিধে হয় নি।

ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


ন্যুব্রা বেশ বর্ধিষ্ণু একটি অঞ্চল। প্রচুর বাড়ীঘর, মানুষ জনের বসবাস।এই যে আমরা শহুরে সভ্যতার ধ্বজাধারীরা এখনকার কালে টেলিভিশন, ইন্টারনেট, প্রভৃতির ওপর প্রায় সমস্তটা নির্ভর করে বসে আছি, এই মুহূর্তে, একবার ভেবে দেখুন দেখি এই অধুনা অপরিহার্য জিনিষ গুলি থেকে মাসের পর মাস বছরের পর বছর আপনি বঞ্চিত রয়েছেন।ইদানীং কালে এমন ভাবতেই পারবেন না হয়তো। অথচ এই একেবারে প্রান্তিক জায়গাগুলোতে বিদ্যুতের পরিষেবাটাও পুরোপুরি পৌঁছয় নি। ন্যুব্রাতে শুনলাম একটা ডিজেল চালিত অতি ছোট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আছে। রাত্রে কেবল মাত্র ৪ ঘন্টার জন্য বিদ্যুৎ পরিষেবা দিতে প্রতিদিন নাকি ৫ গ্যালন করে ডিজেল লাগে। অবিশ্বাস্য হিসাব। এই প্রান্তিক অধিবাসীবৃন্দ কিন্তু নির্বিরোধী অবস্থানটাই শ্রেয় বলে মেনে নিয়েছেন।ধন্য এই সব মানুষের সহনশীলতা। আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে এটাও আমার দেশ, আমার ভারতবর্ষ। 


ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


নাজির ভাই সকাল বেলাতেই হোটেলের রান্নাঘরে গিয়ে হাত লাগিয়েছে রাঁধুনির সঙ্গে। এই মানুষটিকে যত দেখি ততই ভালবাসতে ইচ্ছে হয়।আমায় দেখেই বলল তাড়াতাড়ি গরম পুরি আর সবজি খেয়ে নিয়ে চলো বেড়িয়ে পড়ি। আমরা তৈরিই ছিলাম। গরম গরম পুরি, আলুর তরকারি তাতে বাগান থেকে তোলা কাঁচালঙ্কা আর টম্যাটো দেওয়া, আহা, কি যে অমৃত সে স্বাদ! সকাল নটার মধ্যে বেড়িয়ে পড়া গেল। দূরের পাহাড় গুলো তখন এক গা রোদ্দুরের গয়না পরে মিষ্টি হাসছে। সেই একই পথে ফিরে চলা আজকে। 

ন্যুব্রা ছাড়িয়ে ডিস্কিট মনাস্ট্রির গা ঘেঁষে সায়ক নদের কলহাস্য মুখরিত গুঞ্জরনকে পেছনে ফেলে ফিরে চলেছি, তবে মন পরে রইলো ওই পেছনের সাদা বালির ধুলো মাখান পথগুলিতে। আবার আসব, নিশ্চয়ই আসব। 

ফেরার পথে ডিস্কিট বাজারের সামনে সেনা জওয়ানেরা হঠাৎই পথ আটকালেন। অনুরোধ করে বললেন রাস্তার পাশে কিছুক্ষন অপেক্ষা করবার। জানা গেল এই রাস্তায় একটি বড়ো ট্রাক আসছে এবং সেটা নাকি একটি অতিকায় হেলিকপ্টারকে বয়ে নিয়ে আসছে। নাজির ভাই এই শুনেই হেসে কুটোপাটি। বলল এই হেলিকপ্টারটার ইজ্জত চলে গেল গো, এমন দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখার চেয়ে এখান থেকে পালানো ভালো। বলেই গাড়ী ঘোরালো। সেনা ভাইয়েরা হাঁ হাঁ করে উঠলো। নাজির ভাই বললো চা খেতে বাজারে  যাচ্ছি, বলেই পিঠটান। তারপর ডিস্কিট গ্রামের ভেতর দিয়ে এ গলি সে গলি করে বেশ কিছু পরে আবার হাইওয়েতে উঠে বলল, অত সম্মানের আর শ্রদ্ধার হেলিকপ্টারের এমন দুর্দশা যাতে নিজের চোখে না দেখতে হয় তাই এই ব্যবস্থা। ভারী মজার এই বন্ধুটি আমার। 


ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour


ফেরার পথে নর্থ পুল্লু থেকে সুরু হলো তুষারপাত। গাড়ীর উইন্ড স্ক্রিন বরফে ভরে যাচ্ছে। মুহূর্তে মুহূর্তে এতো বরফ টেনে সরানো ওয়াইপারের  সাধ্যের বাইরে! দেখলাম ওই ঘন তুষারপাতের ভেতরেও কি অক্লান্ত পরিশ্রম করে কাজ    করে যাচ্ছেন  শ্রমিক ভাইয়েরা। এদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে আপনা থেকে।



ladakh-tour, Leh-Ladakh Tour plan,
Ladakh Tour



তুষারবৃষ্টির মধ্যেই দাঁড়ানো গেলো খারদুং লা টপে। পুরু বরফে ঢেকে গেছে চার পাশ। চির আপন তুষার মৌলী গিরিরাজ তার রাজবেশখানি পরে যেন সযতনে প্রকটিত হয়েছেন আজ। মন ভরে গেল। "কে গো অন্তরতর সে, আমার চেতনা আমার বেদনা, তারি সুগভীর পরশে।" অপূর্ব তোমার রুপ। এ দৃশ্য কখনো ভুলবোনা। 

সাউথ পুল্লুতেও দাঁড়ানো হলো পুলিস চৌকিতে ফেরার বার্তা জানাবার জন্য। চা খেয়ে আবার এগোলাম। লেহ পৌঁছলাম প্রায় দুপুর তিনটের সময়। আজ দুপুরে খাওয়া হয়নি। হোটেল মালিক জুম ভাই আর তার স্ত্রী এই কথা শুনেই সেই শেষ বিকেলে ডাল, ভা্‌ত, মাখন আর সব্জীর বন্দোবস্ত করে ফেললেন আধ  ঘন্টার ভেতর। সদ্য নামানো ধোঁয়া ওঠা গরম ডাল ভাত সেই বন্ধুদের  আন্তরিকতা আর ভালবাসার সুবাসে মাখামাখি হয়ে রসনা আর মন দুটোকেই এক অনির্বচনীয় প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল যেন।

চলবে........................................................................................................................

    

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ