রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৬

রেশম পথের কোলে কোলে,  পর্ব - ৬





বিকেলের চা পর্ব আজ একটু দেরীতেই হলো। সব ঘরেই কম্বল মুড়ি দিয়ে কেউ না কেউ তখনো শুয়ে আছেন। নীচের চাতালে চেয়ার পেতে ধুমায়িত চায়ের কাপ হাতে আমি আর আমার বন্ধু সম এক দাদা এই নিবিড় শীতের মায়াময় মধ্য সন্ধ্যা উপভোগ করছিলাম।
সামনের বড়ো রাস্তায় দুয়েকটি জায়গায় কেবল সোলার ল্যাম্প পোষ্ট রয়েছে, রাস্তার ধারের কিছু বাড়ী ঘর নিজেদের উদ্যোগে কোথাও কোথাও সোলার ল্যাম্প পোষ্টের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন, এ ছাড়া সম্পূর্ণ রাস্তায় কোন স্ট্রীট লাইটের ব্যবহার আমার চোখে পড়েনি। এই বাড়ীর উল্টো দিকের পুলিশ চৌকির সামনেও একই রকমের সোলার লাইটের একটি পোষ্ট। যদিও প্রশাসনের ব্যবস্থা বলেই কিনা জানিনা, ঘরের ভেতর থেকে লাইন টেনে বড়ো হ্যালোজেন ল্যাম্প জ্বালিয়ে সার্চ লাইটের মতো একটা তীব্র আলোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে চেক পোষ্টের সামনেটায়। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে দুই জনে ওইদিকে গেলাম। 


চৌকি ছাড়িয়েই আবার যথারীতি জমাট ঘন অন্ধকার, একটু এগিয়ে ডান দিকে বেশ বড়ো বড়ো দুখানা তিন তলা বাড়ী, তাদের ঘর গুলো থেকে তেরছা সামান্য আলোর রেখা বেড়িয়ে এসে অদ্ভুত এক মায়াময় আধিভৌতক আবছায়া জগত তৈরি করেছে। আমাদের সাথে দুটো কুকুর এতো দূর পর্যন্ত বেশ ল্যাজ নাড়তে নাড়তে এসেছিল, তারাও এরপরে আর এগোলো না। নিবিড় নিশ্ছিদ্র সেই অমানিশার সুদৃঢ় বেষ্টনী ভেদ করে এক বিন্দু আলোককনাও কোথাও কোনোদিকে না দেখতে পেয়ে আমরা ফেরার পথ ধরলুম। খাদের দিক থেকে গড়ানো আকাশটাতে কেবল অগনিত নক্ষত্র রাশি তাদের ক্ষীণ আলোক প্রদীপ দিয়ে পথ দেখাবার জন্য হয়তোবা প্রস্তুত ছিলো, তবে আমরা দুই নিতান্ত বঙ্গ সন্তান ওইটুকুতে ঠিক ভরসা না করতে পেরে ধীরে ধীরে নেমে এলাম চেক পোষ্টের সামনে। উজ্জ্বল সাদা আলোর ঝরনায় স্নান করে আছে ওই জায়গাটুকু। 


চেক পোষ্টের পাহারাদার ভদ্রলোকটি নিজে থেকেই যেচে এগিয়ে এলেন আলাপ করবার জন্য। ওনার বাড়ী পশ্চিম সিকিমের একটি গ্রামে। জীবনে কখনো কোলকাতা আসেননি উনি। গত তিন বছর পদমচেনে এই চেক পোষ্টে বদলী হয়ে এসেছেন। পরিবার সমেত নিমাচেনে বাড়ী ভাড়া করে বাস করেন। জানালেন এখানে কোথাও রাস্তায় সরকারী আলো নেই। যেখানে দরকার সেখানে স্থানীয়রাই নিজেদের উদ্যোগে সোলার লাইট লাগিয়ে নিয়েছে, জিগ্যেস করলাম ওই আলো গুলো চুরি হয়ে যাবার ভয় নেই? প্রশ্নটা করেই নিজের কাছেই কেমন বোকা বোকা লজ্জিত হলাম, আমাদের শহুরে মানসিকতায় আমরা এমনই চুরির ভয় পাই, কিন্তু পাহাড়ী মানুষ গুলি নিতান্ত নিরীহ এবং সৎ, এমন বাজে কথা ওঁরা হয়তো ভাবতেও পারেননা। ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন কে চুরি করবে? চোরের ও তো ওই আলোটুকুর নেহাতই দরকার, তাই কখনো চুরি হয়না ওই সব। মনে হলো ওঁরাই ঠিক ঠিক আলোকপ্রাপ্ত, আমরা এই শহুরে মানূষ গুলি হয়তো এখনো আঁধারে দুষ্ট হয়েই রয়ে গেলাম এই রকমই। 

ওনার কাছেই শুনলাম শীতকালে ভয়ানক ঠান্ডায় এবং কখনো কখনো বরফের ভেতরে কত কষ্ট করে ডিউটি করতে হয় ওনাদের। গল্প করতে করতে আমাদের এগিয়ে দিলেন ভদ্রলোক বাড়ী পর্যন্ত। রান্না ঘরে তখন ভারী ব্যস্ততা। রাত নটার ভেতর খাবার পর্ব মিটিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম আমরা। আগামীকাল সকাল থেকে অনেক ঘুরতে হবে। এই পথেও উচ্চতা জনিত শরীর খারাপ হয় অনেকেরই। প্রায় সাড়ে পনেরো হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছোতে হবে কালকে।প্রকৃতি দেবীকে জোড় হস্তে প্রণাম জানিয়ে সকলের মঙ্গল কামনা করে এবং যাত্রা পথে তাঁর অশেষ কৃপা কামনা করে সেই তীব্র শীতার্ত রাত্রিতে নরম কম্বলের ভেতর আত্মসমর্পণ করে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা।


ঠিক সকাল ছটায় দরজায় ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গালো দুই মহিলা। মিস্টি হাসির সঙ্গে গুড মর্নিং জানিয়ে হাতে তুলে দিলো গরম ধুমায়িত চায়ের কাপ, সাথে বিস্কুট। জানিয়ে গেলো যে আজ সকাল সাড়ে সাতটায় জলখাবার দেওয়া হবে, কারন আমাদের সারথী ওদের বলেছেন সবাইকে আটটার ভেতর খাইয়ে দাইয়ে গাড়ী তে তুলে দেবার জন্য। আজ আমরা কুপুপ পর্যন্ত যাব।তাড়াতাড়ি গীজার চালিয়ে গরম জলে হাত মুখ ধুয়ে চা পর্ব শেষ করলাম। 

স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে বেরোতে বেরোতে সাড়ে আটটা বেজে গেলো। পদমচেন থেকে আজকের সমস্ত যাত্রা পথ কেবল চড়াই আর চড়াই। সুন্দর পিচ ঢালা রাস্তা, সেনাবাহিনীর যাতায়াতের জন্য সদা ব্যাস্ত এই রাস্তা। পদমচেনের উচ্চতা মোটামুটি সাড়ে সাত হাজার ফুটের মতো, পদমচেনকে অনেকে লোয়ার জুলুক ও বলে থাকেন।


পদমচেন ছাড়িয়ে অল্প এগোলেই জুলুক। জুলুক থেকে নীচের দিকে তাকালে পাহাড়ের ধাপে ধাপে অনেক নীচে পর্যন্ত আমাদের ফেলে আসা পথের সর্পিল রেখা চিত্র নজরে আসে। পাহাড়ের বেষ্টনীতে এই পাক দন্ডী পথের নয়নাভিরাম শোভা অনেকদিন মনে থাকবে।এটাই সেই বিখ্যাত জিগজাগ ওয়ে।


জুলুক পেরিয়ে আবার চড়াই ধরে গাড়ী গিয়ে থামলো থাম্বি ভিউ পয়েন্টে। ঝকঝকে অমলিন মেঘহীন আকাশ। ডানদিকে খাড়াই পাহাড়, বাঁ দিকে চোখ পড়তেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলাম। চির তুষার মৌলী এই রুপ দেখার জন্যই যে বারে বারে ছুটে ছুটে আসা। শ্বেত শুভ্র কাঞ্চন জঙ্ঘা সমস্ত আকাশ জুড়ে বিরাজিত হয়ে রয়েছেন। সূর্যের প্রখর কিরণে রুপোর মতো ঝকঝক করছে তার সর্বাঙ্গ। যত দেখছি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি, চোখ সরছেনা এই অবিস্মরণীয় রুপের ঝলক থেকে। বেশ কিছুক্ষন এখানে কাটিয়ে অনেক ছবি তুলে চা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো।


থাম্বি ভিউ পয়েন্টের উচ্চতা প্রায় ১৩৫০০ ফুট, যারা উচ্চতা জনিত অসুস্থতায় ভোগেন এই পথে তারা যত কম কথা বলবেন, বা যত কম তাড়াহুড়ো, দৌড়াদৌড়ি করবেন ততই মঙ্গল। গাড়ী থেকে নেমেই দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি করলে অক্সিজেন বেশী খরচ হবে এবং এত উচ্চতায় যেহেতু অক্সিজেন স্বাভাবিক ভাবেই কম তাই শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যাথা, বমি হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই শান্ত ভাবে কেবল দুই চক্ষু মেলে প্রকৃতির অমলিন সৌন্দর্য উপভোগ করুন। যাবার আগেই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত ওষুধ সঙ্গে নিয়ে চলুন। প্রচুর জল খাবেন, সঙ্গে টোটকা হিসেবে পপকর্ন, ডার্ক চকোলেট ইত্যাদি রাখতে পারেন, যদি সম্ভব হয় তাহলে ছোট পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্গে রাখতে পারেন।



যত ওপরে উঠছি ঠান্ডার প্রকোপ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। থাম্বি ভিউ পয়েন্ট ছাড়িয়ে এরপর আমরা দাঁড়ালাম নাথাং ভ্যালী তে এসে। প্রবল শীত এখানে। খাদের পাশে রাস্তার ধারে ধারে বরফ জমে আছে। বেশ কিছু দল আগেই এসে পৌঁছে গেছেন এখানে। পাথর ডিঙ্গিয়ে কেউ কেউ পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে চড়ে বরফ হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন। জমজমাট জায়গা। ওপর থেকে ভ্যালীটা অসাধারন দেখতে লাগছে। আমরাও অনেক ছবি তুললাম এখানে।


এরপরের দ্রষ্টব্য পুরোনো বাবা মন্দির। 


বাবা হরভজন সিং ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন সিপাহী। ১৯৪৬ সালে পঞ্জাবের কাপুরথালার এক গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি ভারতীয় সেনা বিভাগে যোগ দেন। সিকিমের নাথুলা পাস ও বর্তমানের এই পুরোনো রেশম পথের টুকলা ভ্যালীর মাঝামাঝি এক জায়গায় তাঁর কর্মস্থল নির্ধারিত হয়। এই অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল তখন অনেক বেশী দুর্গম ও প্রতিকুল ছিল। কিন্তু অকুতোভয় ভারতীয় জওয়ানেরা তীব্র ঠান্ডা ও নিদারুন বরফের কামড় সহ্য করেও দিনের পর দিন রাতের পর রাত সেনাবাহিনীর ছোট ছোট বাঙ্কারে অতন্দ্র থেকে ভারত-চীন সীমান্ত পাহারা দিয়ে চলতেন, যেমন আজও দিয়ে চলেছেন। 



১৯৬৮ সালের কোনো এক দিন ওই বাঙ্কার গুলিতে খাবার ও রসদ পৌঁছে দিতে যাবার সময় সিপাহী হরভজন সিং ঘোড়া এবং সমস্ত জিনিষ পত্র সমেত এক বিরাট বরফের গড়িয়ে আসা স্রোতের ভেতর পড়ে তলিয়ে যান। তিন দিন পর এই জওয়ানের দেহ উদ্ধার হয়।


শোনা যায় এই বীর সিপাহী তার পর থেকে অতন্দ্র থেকে আজও দিনের পর দিন এই বিস্তীর্ণ সী্মান্ত অঞ্চল পাহারা দিয়ে চলেছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী আজও এই সিপাহীকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে চলেছেন। আমাদের জওয়ানদের বিশ্বাস যে বাবা যে কোন বিপদ থেকে কর্তব্যে অবিচল সেনা জওয়ানদের যথাসম্ভব রক্ষা করে থাকেন। 



বাবা হরভজন সিংযের পূন্য স্মৃতিতে তাই এই অঞ্চলে হরভজন সিংযের সেনা বাঙ্কার টিকে ঘিরে স্মৃতি মন্দির তৈরি করা হয়েছে। পুরোনো রেশম পথের এই বাঙ্কারটি আদি মন্দির, পরবর্তীতে নাথুলা পেরিয়ে গ্যাংটকের দিকে ছাঙ্গু লেকের কাছে আরো একটি স্মৃতি মন্দির তৈরি করে বাবা হরভজন সিংযের উদ্দ্যেশে নিবেদিত হয়েছে। 


প্রতিদিন সমস্ত নিয়ম মেনে নির্ধারিত সময়ে জওয়ানেরা বাবার পূজা করে থাকেন। কোনো জাতি, ধর্মের বাঁধা গণ্ডীর পূজো নয়, মন থেকে স্মরণ ও মনন করার নামই পূজো। কিশমিশ ভোগ বিতরন করা হয় সকলের মধ্যে। আরতি ও বাবার উদ্দ্যেশে প্রার্থনা সঙ্গীতও পরিবেশিত হয়। বেশ মনোমুগ্ধকর ভাবগম্ভীর পরিবেশ। 



সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে সকলের জন্য এই ঠান্ডায় চায়ের ব্যবস্থাও আছে এখানে। ইদানীং দেখলাম সেনাবাহিনীর ক্যান্টিনে সিঙ্গারা, পকৌড়া প্রভৃতিও বিক্রি হচ্ছে। বাবা হরভজন সিংযের ব্যবহৃত জিনিষ পত্র এমনকি তাঁর ব্যবহৃত পোশাক, বিছানা প্রভৃতি সমস্ত কিছু প্রদর্শিত হয়ে থাকে এখানে। প্রায় ১৪০০০ ফুট উঁচুতে এই জায়গায় অক্সিজেনের পরিমান কম, তাই ধীরে ধীরে ঘুরে সব কিছু আস্তে আস্তে দেখে নিয়ে বাবার মন্দিরে পূজো দিয়ে কিশমিশ প্রসাদ আর সেনা জওয়ানদের তৈরি করা গরম চা খেয়ে আবার এগোলাম আমরা।

চলবে......................................................................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. আপনার লেখা আমার বরাবরই ভালো লাগে। দূরের অজানা বা আধাচেনা জায়গাগুলোকেমন মূর্ত হয়ে ওঠে যেন। চোখ বন্ধ করে কতবার যে ছুঁয়েছি ওদের। চলুক এই মানসভ্রম! চরৈবেত!!

    উত্তরমুছুন

Please do not enter any spam link in the comment box.