ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৩


গাড়ী এগিয়ে চলেছে।
এসে দাঁড়ালাম আলচি মনাস্ট্রির প্রবেশ তোরণের সামনে। এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে। গলি
রাস্তা। দু ধারে অসংখ্য দোকান, সঙ্কীর্ণ পরিসর। দেশী থেকেও বিদেশী পর্যটকের ভিড়ে গমগম করছে ঐ সরু পথটুকু। কি
নেই দোকানে। পুঁতির মালা থেকে শুরু করে মোজা, দস্তানা মায় টুথ ব্রাশ পর্যন্ত। যে কোন জিনিষের অসম্ভব দাম। আমাদের মতো পাতি
দেশী লোকেদের কোন কদরই নেই দোকানীদের কাছে। আর থাকবেই বা কেন? চোখের সামনে দেখলাম এক বিদেশীনি একটা সাধারন ছড়া হার কিনলো ১৩০০ টাকা দিয়ে। মহিলা
১২০০ টাকায় রফা করতে চাইছিল কিন্তু দোকানী কিছুতেই ১৫০০-এর কমে দেবেনা, অবশেষে ১৩০০ টাকায় মালা কিনে বিজয় গরবে গরবিনী
হয়ে ফিরলেন ওই শ্বেতাঙ্গীনি। আমার স্থির বিশ্বাস ওই মালার দাম ৫০ টাকার বেশী
কিছুতেই হতে পারে না। মন টা খারাপ হয়ে গেল।
এই আলচি মনাস্ট্রি
অনেক প্রাচীন। বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের একটি পবিত্র তীর্থ স্থান। ঘুরে ঘুরে দেখা হলো।
মনাস্ট্রির পেছন দিকটায় একটা বাঁধানো রাস্তার ধার দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধু নদ। খুব
মনোরম এই জায়গাটি। সুন্দর বাঁধানো বসার ব্যবস্থা আছে এই সিন্ধুর তীরে। সময়ের
স্বল্পতার জন্য বেশীক্ষণ কাটান গেলনা। এবার আবার যেতে হবে লিকির মনাস্ট্রি।
খুবানির জুস খেয়ে তৃষ্ণা মিটিয়ে আবার চলা শুরু হল।
লিকির মনাস্ট্রির
পার্কিং লটে গাড়ী রাখতে রাখতে বিস্ময়ে দেখলাম এক অতি বৃহৎ, প্রায় সাত তলা বাড়ীর সমান উঁচু, অপূর্ব সুন্দর দিব্যকান্তি বুদ্ধ মূর্তি আকাশ
আলো করে শোভা দিচ্ছেন। যেমন তার রঙ তেমনই তার অনির্বচনীয় সৌন্দর্য।
তৎক্ষণাৎ মনে
হল যেন বুকের ভেতর উদারা মুদারা তারা এক সঙ্গে সপ্ত সুরে বেজে উঠলো, বাজল ভীম পলশ্রী, বাজল বেহাগ। সুরে সুরে মন্দ্র সপ্তকের যখন শেষ পর্দায় তখন চমক ভাঙল। চড়াই
ভেঙ্গে অনেক খানি উঠে তার পর ওই মহাপুরুষের চরণতলে পৌঁছনো যাবে। দিনমনি তখন মধ্য
গগনে। নিরালা শান্ত নিশ্চুপ এই লিকির মনাস্ট্রি। বড়ো ভাল লাগলো, সুন্দর এক প্রশান্তিতে মন ভরে গেল।
পার্কিঙের
পাশেই দুটি খাবার হোটেল পাওয়া গেল। একটি ততক্ষনে নো মিল নোটিস ঝুলিয়েছে, আর একটি আমাদের ক্ষুধার্ত মুখ গুলিকে দেখে
নিতান্তই অনিচ্ছা সহকারেই চাউমিন আর ভেজ মাঞ্চুরিয়ান বানিয়ে দিলো। আহা, সে যে কি মধুর অমৃত সমান সেই খিদের মুখে তা বলে
বোঝাতে পারবনা।
এবার আমরা চলেছি
কারগিল যুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন স্বরুপ সেনাবাহিনীর স্মারক স্থল ‘হল অফ ফেম’ দেখতে। সুন্দর করে সাজানো এই প্রদর্শনী গৃহ বেশ ভালো লাগলো সকলের।
এদেশে একটা জিনিষ
খুব ভাল লেগেছে আমার। এখানকার মানুষজন নিজেদের জাতিসত্ত্বা কখনো গুলিয়ে ফেলেনি। ইতিহাস ঘাঁটলে
দেখা যায় আজকের যে লাদাখ জম্মু ও কাশ্মীরের ভেতরে অবস্থান করছে তা কিন্তু এমন
ছিলনা। সম্পূর্ণ স্বাধীন এক জাতি এরা। মুলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, কিন্তু ধর্মের পরিচয়ের উর্ধে এরা নিজেদের পরিচয়
দেয় লাদাখী বলে। আজকের ভারতবর্ষে যখন পদে পদে ভয় ধর্ম নিয়ে ভাগাভাগি আর মারামারির
সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কি অক্লেশে এরা বলে আমরা লাদাখী। শুনে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়
যেন। এই মাটি সেই মহান বৌদ্ধ ধারা কে, সেই প্রাচীন ভারতীয় মহান সংস্কৃতিকে আজও এমন ভাবেই বহন করে নিয়ে চলেছে, তাইতো যাকেই জিজ্ঞাসা করেছি, সে দাওয়া নরবু ই হোক যে আমায় জয় শ্রী কৃষ্ণ বলে সম্ভাষন করলো, বা প্রফেসর জাভেদ মালিক ই হোক যে তিন বেলা পরম নিষ্ঠার সঙ্গে নমাজ সম্পন্ন করে, সে ই বলেছে আমরা লাদাখী।জয় হোক মহান
ভারতবর্ষের।
এতো বড় দেশ যখন
তখন নিশ্চয় কোন রাজা এবং তার বাড়ী থাকবে। এবার আমাদের গন্তব্য কিংস প্যালেস বা রাজার বাড়ী। অপূর্ব এই
দুর্গের মত প্রায় সাত তলা উঁচু এই বাড়ীটি। অন্দরে অন্দরে, প্রতিটি অলিন্দের আনাচে কানাচে কতো যে বিস্ময়
অধীর আগ্রহে প্রকাশিত হবার আকাঙ্খায় এখানে অপেক্ষা করে আছে তা বলে বোঝানো যাবে না।
দস্তাবেজ খানায় প্রায় ৮১ টি পুঁথি দেখলাম লাল শালুতে মোড়া হয়ে রাখা আছে পরম
লালিত্যে। সর্বোচ্চ তল থেকে লেহের শহর আর শহরের প্রাণ ভোমরা স্বরুপ শ্বেত শুভ্র
তুষার লাঞ্ছিত শিখর স্তোক কাঙ্গরি দেখে দেখে যেন আশ মিটতেই চায়না।
অনিচ্ছা সত্বেও
নেমে আস্তে হোল কারন এখনো যেতে হবে এই শহরের অন্যতম আকর্ষণ শান্তি স্তূপ দর্শন
করতে। অনেক বড় জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই শান্তি স্তূপ।
অনেক লোকের ভীড়। বিশেষতঃ
ফটো শিকারী পর্যটকদের ভীড়ে ছয়লাপ জায়গাটা। শেষ বিকেলের আলোয় মোহময়ী অতুলনীয়া লেহ
শহরের সমস্ত নির্যাসটুকু নিংড়ে নিতে নিতে এক অদ্ভুত ঘোর লাগা আচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরে
এলাম হোটেলে। স্তোক কাঙ্গরির নরম গায়ে তখন পড়ন্ত সূর্যের মন কেমন করা ভালবাসার লাল
ছোপ পড়েছে।
সকালে ভোর ভোর
বেড়োবার তাড়া। আজ আমরা যাব ন্যুব্রা ভ্যালী। পথে পেরোতে হবে খারদুং লা পাস, পৃথিবীর সর্বোচ্চ রাস্তা । ভেতরে ভেতরে এক চরম
উত্তেজনার গরম বাষ্প পাকিয়ে উঠছিল আমাদের সকলের মধ্যে। আমার বন্ধু সম সারথী নাজির
ভাই কাল রাতেই পই পই করে বলে দিয়েছে দেরী যেন না হয়।
হোটেল মালিক সদা হাস্যময় জুম
ভাই এক গাদা জলখাবারের আয়োজন করে পেট ভরে খেয়ে নেবার পরামর্শ দিয়ে গেলেন। এই
মানুষটির মতো সরল আর ভালো মনের মানুষ আমি কমই দেখেছি। এক সময় দেশের হয়ে আইস হকি
খেলেছেন বিদেশের অনেক দেশে। হকি ওনার প্রাণ। আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ নাম আছে ওনার
আইস হকি বিষয়ে। খেলার কথা
বলতে গেলেই আবেগে
চোখ বুজে আসে এই প্রবীন মানুষটির। একটাই আশা যে ছোট ছেলেটিও আইস হকি তে দেশের মধ্যে নাম
করেছে। সেলিম মালিক। বাচ্চা ছেলে কিন্তু পরিবারের নম্রতা, ভদ্রতা এবং সারল্য ওর ভেতরে পিতার রক্তের সাথেই
প্রবেশ করেছে। এই পরিবারটির আতিথ্য আমরা কখনো ভুলবো না।
বেরোতে বেরোতে সাড়ে আটটা
বেজে গেলো। নাজির ভাই লেহ শহরের অলিগলির বিস্তারিত বিবরণ দিতে দিতে চলেছেন। এমন আনন্দময় প্রাণোচ্ছল সঙ্গী
অনেক সৌভাগ্যে পাওয়া যায়। স্তোক কাঙ্গরি পাহাড়ের পাদদেশে এক বড় বর্ধিষ্ণু গ্রাম
যার নাম কাঙ্গরি, লেহ শহর থেকে প্রায় ২২ কিমি দূরে, সেই গ্রামে নাজির ভাই এর বাড়ী। দুই কন্যা এবং
এক বছর বয়সী শিশু পুত্র, স্ত্রী, ও বাবা মাকে নিয়ে ওর সাজানো সংসার। বড় মেয়েটি লেহ শহরের দিল্লী পাব্লিক স্কুল
এ পড়ছে। নিজের গ্রামের কথা বলতে শুরু করলে থামতে পারেনা নাজির ভাই। বার বার বলে এ
অঞ্চলের সব চেয়ে সবুজ গ্রাম হচ্ছে ওর গ্রাম। খুব ইচ্ছে ছিল ওর আমায় ওর গ্রামে নিয়ে
যাবে, কিন্তু আমাদের সময়-স্বল্পতায় তা আর হয়ে উঠলোনা।
গাড়ী ছুটে চলেছে পাহাড়ী পথ ধরে। বেরোবার সময় সেলিম একটা বড়ো অক্সিজেন সিলিন্ডার আর
মাস্ক গাড়ীতে তুলে দিয়ে তার ব্যাবহার পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের দলের সকলকে শিখিয়ে পড়িয়ে
দিয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে আমাদের ভরসা কেবল নাজির ভাই।লেহ শহর ছাড়ানোর পর বোঝা গেল
রাস্তার অবস্থা অতিশয় খারাপ। মাভৈঃ রবে এগিয়ে চলেছি আমরা।
গাড়ী এসে দাঁড়ালো সাউথ
পুল্লু পুলিশ চৌকিতে। পাহাড় ঘেরা ছোট্ট একটু জনপদ। নাজির ভাই কাগজ পত্র নিয়ে
লেখাতে গেল। এই পথে যাবার জন্য লেহ থেকেই ইনার লাইন পারমিট নিতে হয়, সেটা বাধ্যতা মূলক। কেবল ন্যুব্রা নয়, প্যাংগং এবং সুমোরিরি আর সুমোরিরি থেকে হাল্লে
যেতে হলেও এই পারমিট অবশ্যই নিতে হবে। আগে থেকে সেই অনুযায়ী ভ্রমন সূচী করা থাকলে
হোটেলই সব ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। যাত্রা পথে ITBP বা Indo Tibetian Border Police চৌকিতে সেই পারমিট দেখিয়ে তারপর এগোবার ছাড়পত্র
মিলবে।
চলবে...................................................................














0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.