রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৫

রেশম পথের কোলে কোলে,  পর্ব - ৫ 






 চা, পকৌড়া, গান, গল্প এবং আড্ডায় সন্ধ্যেটা খুব ভালো কাটলো। এই বাড়ীর তিন খুদে সদস্য নিজেদের ভাষায় গান এবং নাচ পরিবেশন করে অনেকটা সময় ভরিয়ে রাখলো আমাদের। ভাত, রুটি, ডাল, সব্জী, মুরগীর ঝোল সাথে পাঁপড় আর আচার, খুব ভালো হলো রাতের খাওয়াটাও। খাবার টেবিলে ঠিক হলো আগামী কাল ভোর তিনটের সময় উঠে সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায় আবার মাঙ্খিম ভিউ পয়েন্টে যাওয়া হবে। মাত্র কয়েকজন রাজী হলো, বাকীরা এই তীব্র শীতের রাত্রে এমন সুখশয্যা ত্যাগ করে নিদারুন কায়ক্লেশে পড়তে রাজী নয়।





যেমন কথা তেমন কাজ। ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে শুলাম। ঠিক সাড়ে তিনটের সময় উঠে হাত মুখ ধুয়ে বেড়িয়ে পড়া গেলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কনকনে শীত, বাতাসে নির্মল পবিত্রতা। রাত চরা দুয়েকটি পাখীর ডাক আর খাদের ধারের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝিঁর একটানা কলতান আর তার সাথে এখন যুক্ত হয়েছে আমাদের জুতোর মসমস শব্দ। এমন অপূর্ব ঘোর লাগা মাদকতাময় ভোর বেলা আমি আগে কখনো দেখিনি। প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে কেবল অনাবিল শুদ্ধতা যেন রোমকুপে রোমকুপে ছড়িয়ে পড়ছে। 





সকলের হাতেই ছোট বড়ো টর্চ। ধীরে ধীরে চড়াই আর সিঁড়ি ভেঙে অনেক উঁচুতে একেবারে ভিউ পয়েন্টের চূড়ায় হাজির হলাম আমরা। এই নিশ্ছিদ্র ঘন অন্ধকারে এমনকি পাশের জনের মুখও দেখা যাচ্ছে না, কেবল মাথার ওপরের গহীন তারা ভরা বিশাল আকাশটা হঠাৎ যেন কোন মন্ত্রবলে একেবারে হাতের নাগালে পৌঁছে গিয়েছে। ওই তো কালপুরুষ, কোমরের বন্ধনী সমেত নির্ভুলভাবে জ্বাজ্বল্যমান। ওইটাকেই বলে সপ্তর্ষি মন্ডল? আচ্ছা, মঙ্গল গ্রহ যেন কোনটা? অনেকটা সময় ধরে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় একজন অধ্যাপক দাদার কাছে আমরা সামান্য আকাশ চেনার পাঠ নিলাম, আক্ষেপ রয়ে গেলো, ‘চিরদিন কেন পাইনা। ওপর থেকে দূরে দূরে অসংখ্য বিন্দু বিন্দু আলোয় সেজে থাকা পাহাড়ের গ্রাম, শহর চোখে পড়ছে।আঁধারের নিঃসীম বুকের ভেতরে যেন লক্ষ লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে এই বিশ্ব ভুবন মহান আলোকোজ্বল দিনমনিকে বরণ করে নেবার প্রতীক্ষায় মগ্ন হয়ে আছে এই মুহূর্তে।





ধীরে ধীরে পুব আকাশে রক্তিম আল্পনা দেখা দিলো। সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো তার ঈষৎ অরুনাভা, হাত জোড় করে যে যার মতো করে গান গেয়ে আমরা এই অপাপবিদ্ধ মঙ্গলময় প্রভাতী সূর্যকে আবাহন করলাম। হেরো গগন ভরি জাগে সুন্দর, জাগে তরঙ্গে জীবন সাগর, নির্মল প্রাতে বিশ্বের সাথে জাগো অভয় অশোকে। ওই সদ্য প্রত্যুষে হঠাৎই মন্দির থেকে ঘন ঘন শাঁখ, ঘন্টা আর কাঁসরের ধ্বনি ভেসে এলো। সংলগ্ন শিবের মন্দিরে দেবতার মঙ্গলারতি শুরু হয়েছে। গিয়ে দেখি একটি মেয়ে ফুল, ধুপ দিয়ে শঙ্খ বাজিয়ে খুব ভক্তি ভরে পুজো করছে। ধুপ দীপের আরতির পর আমরা প্রসাদ পেলাম। এক অপূর্ব প্রশান্তি মাখানো ভোরবেলা নির্মল আনন্দের সৃষ্টি করলো আমাদের সমস্ত চেতনায়। 






ততক্ষনে পশ্চিম আকাশে একটু একটু করে প্রকাশিত হচ্ছেন কাঞ্চন জঙ্ঘা, তিনি যে জাগরুক কেবল সেইটুকু বোঝা যাচ্ছে, অথচ তাকে পূর্ণ অবয়বে ধরা যা্চ্ছেনা, পুঞ্জীভূত মেঘের অবগুণ্ঠনে ব্রীড়াবনতা নব বধুটির মতো তিনি অধরা রয়ে গেলেন এখনো। আরো বেশ কিছুক্ষন সেখানে কাটালাম আমরা। মাঝে এক লহমার জন্য সূর্যালোকে রক্তিম তার উষ্ণীষ খানি ধরা দিতে না দিতেই আবার কোথায় মুহূর্তের মধ্যে তিনি লুকিয়ে পড়লেন। আমাদের দু এক জন অতি ভাগ্যবানের বিদেশী ক্যামেরায় তা ধরা পড়লেও আমি নিতান্তই দীন হীন অধম, তাই সে দৃশ্য আমার ক্যামেরায় অধরাই রয়ে গেলো। সকাল ছটা নাগাদ একটু নেমে সিঁড়ির ধাপের মস্ত চাতালের চায়ের দোকানে চা খেলাম সবাই। কেমন একটা ঘোর লাগা আনন্দের সুরে ভাসতে ভাসতে ফিরে এলাম ঘরে। আরো একবার চা খেয়ে স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে বেরোতে বেরোতে সকাল সাড়ে আটটা বেজে গেলো। আজ আমরা যাচ্ছি পদমচেন। 





আরিতার থেকে বেরিয়ে পথে কালিখোলা ঝরনা এবং ব্রীজ পেরিয়ে রংলি হয়ে রাস্তার ওপর আরো এক মন ছুঁয়ে যাওয়া ঝরনা দর্শন করে নিমাচেন গ্রামের পাশ দিয়ে আমরা যাব পদমচেন। পথের দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৫ কিলোমিটার, সরাসরি গেলে প্রায় আড়াই ঘন্টার পথ, কিন্তু রংলিতে প্রায় ঘন্টা খানেক দাঁড়াতে হবে আজকে। ওখানে সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে দলের সকলের বৈধ কাগজ পত্র ও ছবি জমা করে, গাড়ীর কাগজের প্রমান পত্র দেখিয়ে তারপর মিলবে ছাড়পত্র। সিকিমের এই অংশে ভ্রমণের জন্য যা একান্ত আবশ্যক।





কালীখোলা ঝরনার পাশে অনেক ছবি তোলা হলো। অসাধারন সৌন্দর্য এই পথের। বিশেষ করে কালীখোলা ব্রীজের ওপর থেকে আদিগন্ত ঢেউ তোলা বাঙ্ময় পর্বত শ্রেনী সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তে শুষে নিয়ে মনের ভেতর এক নিঃসীম আনন্দের হাওয়া জাগিয়ে তুললো। খানিকক্ষন এখানে কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু। গাড়ী এসে দাঁড়ালো বেশ জমজমাট একটা গঞ্জের মতো জায়গায়। অনেক দোকান বাজার, স্কুল, কলেজ, ব্যাঙ্কের এটিএম, যাত্রীদের হাঁকাহাঁকি, গাড়ীওয়ালাদের একে অন্যের সাথে হাসি মস্করা, ঝগড়া সব কিছু নিয়ে বেশ বড়ো সড়ো হৈ চৈ হট্টগোল যেন। এই জায়গাটার নাম রংলি। এই খান থেকে রেশম পথের ছাড়পত্র মেলে যাকে পরিভাষায় আমরা আই এল পি বা ইনার লাইন পারমিট বলে থাকি। সকলের ভোটার কার্ডের ফটো কপি, এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা করে তারপর ছাড়পত্র পাওয়া যায়। আমাদের প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লাগলো এখানে। যা করবার মূলতঃ গাড়ী চালকেরাই করলেন। আমরা সদলে চা খেলাম, কেউ কেউ সময় কাটাতে গরম গরম মোমো, থুকপা খেয়ে আরো একবার চাঙ্গা হয়ে নিলেন। 





এরপরের দ্রষ্টব্য কিউ খোলা ফল্স। বেশ উঁচু থেকে ঝরঝরিয়ে ধেয়ে এসে একেবারে রাস্তার ওপরে আছড়ে পড়েছে। সহর্ষে এবং সঘোষে পিচ রাস্তা ভাসিয়ে নীচের বড়ো কালভার্টের ভেতর দিয়ে হু হু শব্দে বয়ে চলেছে পাহাড় ডিঙিয়ে। অপূর্ব দৃশ্য। ছবি শিকারীদের মনের মতো এই জায়গাটি। ছোট খাটো বেশ কয়েকটি দোকান হয়েছে এখানেও। একটি বড়ো খাবার দোকানে খুব ভীড়। আমরা সদলে এখানে চা বিস্কুট খেলাম। রাস্তার ধারে পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো পাইপ লাগিয় ঝরনার জল দিয়ে গাড়ী ধোবার ব্যবস্থা করা রয়েছে। অনেকে এক সঙ্গে গাড়ী ধুয়ে নিতে পারেন এখানে। আমাদের চালকেরাও দেখলাম গাড়ী ধুয়ে নিলেন সম্পূর্ণ বিনা খরচে। ছবি তোলা এবং চা পর্বের পরে আবার যাত্রা। 





একটু এগিয়েই নিমাচেন। সম্পূর্ণ চড়াই পথ। ঊর্ধ্ব দিকে মুখ করে গাড়ী ছুটে চলেছে। একপাশে গভীর খাদ অপর পার্শ্বে সুগম্ভীর শান্ত পরিবেশ সমৃদ্ধ নিটোল গ্রাম। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাড়ীঘর। প্রায় সব বাড়ী গুলিই রকমারি বাহারি ফুল গাছ দিয়ে সাজানো। নিমাচেন পেরিয়ে পদমচেন গ্রাম। বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম এই পদমচেন। গ্রামে ঢোকার ঠিক আগে বন বিভাগের চেকপোষ্ট। এখানে ছাড়পত্রের কপি এবং মাথাপিছু সরকারী খাজনা জমা করে রসিদ নিয়ে তারপর পুনরায় যাত্রা করবার অনুমতি পাওয়া গেলো। এই অফিসের কোন কর্মচারী সম্ভবত অফিস লাগোয়া তার এলাচের ক্ষেত থেকে সদ্য তুলে আনা কাঁচা বড়ো এলাচ ঝুড়ি করে এনে অবসর মত একটি একটি করে ফল ছাড়িয়ে রাখছিলেন। আমার কৌতূহল দেখে গাছ সুদ্ধু এক থোকা আমার হাতে দিলেন দলের সকলকে দেখানোর জন্য। তার থেকে কয়েকটি আমরা ছিঁড়েও দেখলাম। তাজা বড়ো এলাচের সুগন্ধে মোহিত হয়ে আবার রওয়ানা হওয়া গেলো। রোদ ঝলমল স্নিগ্ধ কোমল প্রকৃতি, বাতাসে হাল্কা ঠান্ডার আমেজ। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের বাসস্থানে। 





জুলুক যাবার বড়ো রাস্তার ধারে পুলিশ চৌকির পাশেই তিন তলা বেশ বড়ো বাড়ী। ঢোকবার মুখে রাস্তার ওপর ছোটখাটো একটা মুদির দোকান, সামনে বড়ো বাঁধানো চাতাল। তিনটে গাড়ী এক সঙ্গে দাঁড়াবার মতো বেশ বড়ো জায়গা।ডিকি বলে একটি মেয়ে সম্পর্কে মালিকের মাসী, দোকান থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের ঘর বুঝিয়ে দেবার কাজে লেগে পড়লো। অল্প বয়সী দুটি ছেলেও মালপত্র খুলে একতলা ও দোতলায় আমাদের ঘর বুঝিয়ে দিলো। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে আমরা খাবার ঘরে দৌড়লাম। তিনতলার এক পাশে মালিকের বাসস্থান ও রান্না ঘর। আর এক দিকে বেশ বড়ো হল ঘরের মতো ডাইনিং হল। লম্বা টেবিলে বড়ো বড়ো সুদৃশ্য পাত্রে খাবার সাজানো। থালা, চামচ, নুন, লেবু, লঙ্কা ও আচার আলাদা আলাদা পাত্রে সাজিয়ে রাখা। আমরা থালায় খাবার তুলে নিজেরাই গুছিয়ে খেতে বসে গেলাম। ভাত, ডাল, আলু ভাজা, আলু পোস্ত, ডিমের ডালনা আর পাঁপড়। প্রায় অবেলায় গরম গরম খাবারে বেশ পরিতৃপ্তি হল। 





খাবার ঘরের পাশ দিয়ে আরেকটি সিঁড়ি সোজা ছাদের দিকে চলে গেছে। খাবার পরে আমরা কয়েকজন ছাদের ওপর বেড়াতে গেলাম। ওপর থেকে ভারী সুন্দর চারপাশের দৃশ্যাবলী। নীচে বাঁ দিকে পাহাড়ের ধাপে ধাপে একটা দারুন সুন্দর অর্কিড হাউস, যে দিকে দু চোখ যায় কেবল ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড়। দূরে দূরে পাহাড়ের মাথায় বা ধাপে ধাপে কত বিচিত্র বর্ণের এবং সজ্জার বাড়ীঘর। ডানদিকে বড়ো রাস্তা, লম্বা অজগরের মতো মসৃন গা খানিকে অলস ভাবে বিস্তার করে শুয়ে রয়েছে যেন। প্রতিটা বাঁক সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে যেন পটে আঁকা সজীব একখানি ছবি । দেখে দেখে আর আশ মিটছে না আমাদের। পাহাড়ের গায়ে গায়ে কখনো ওপরে কখনো নীচের দিকে ছেঁড়া ছেঁড়া ভাসমান মেঘের রাশি, কি অবলীলায় পর্বত গাত্রের স্নিগ্ধ সবুজের ওপরে এক এক পোঁচ করে কোথাও ঘন সাদা, কোথাও ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের রঙ ছড়িয়ে রেখেছে যেন। বাড়ীটা পশ্চিম মুখী, তাই শেষ বিকেলের সূর্যাস্তের নিবিড় লাল আবির রঙা আকাশ আর দিগ্বিদিকে পাহাড়ের গায়ে গায়ে, মেঘেদের মাথায় মাথায় ছড়িয়ে পড়া তার রক্তিম আলোয় দু চোখ ভরিয়ে ঘরে এলাম। সব ঘরে ঘরে ততক্ষনে সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠেছে।

চলবে................................................................................................... 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ