ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ২
সারচু থেকে ৪০ কিমি পরেই আবার গিরিপথ। নাকি লা। ততক্ষনে আমরা গিরিপথের অভিঘাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়। যে মহাপুরুষ এই আপ্ত বাক্যটি রচনা করেছিলেন তাঁকে যে কী পরিমান ক্লেশ স্বীকার করে তারপর এই চরম সত্যে উপনীত হতে হয়েছিল, তা’ অনুমান করে শিউড়ে উঠতে হয়। এদের শ্রী চরণে আভূমি প্রণতি জানাই। নাকি লা ছাড়াতে না ছাড়াতেই আবার গিরিপথ। লাচুগ লাং লা। পেরিয়ে গেলাম নাতিদীর্ঘ এই রাস্তাও। এর পর পাং। ১৫২৮০ ফুট উচ্চতায় পাং। তীব্র হাওয়ার দাপট। এইখানেই আজকের মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতি। ছোট্ট একটা দোকান। এক বৃদ্ধ তিব্বতি ও তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী মিলে দোকানটি চালান। সদা ব্যাস্ত এই দুজন পরম যত্নে আমাদের জন্য থুকপা, মোমো বানিয়ে দিলেন। এ দেশের পাহাড়ী রাস্তার ধারে ছোট বড়ো সমস্ত খাবার দোকানে দেখেছি কম্বল বালিশ দিয়ে মোটা গদীর বিছানার ব্যবস্থা করা আছে। বেশ পরিস্কার পরিছন্ন। ক্লান্ত পথিকের দু দন্ড শান্তির বিশ্রামের জন্য অসাধারন আয়োজন।

পাং এর পর থেকে রাস্তা ভালো। আমাদের সারথী নাজির ভাইয়ের ভাষায় ‘মখমল জেইসি’। এই রাস্তার দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন B.R.O বা BORDER ROAD ORGANISATION. । পাং পেরিয়ে এসে আবার গিরিপথ। পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম মোটর গাড়ী চলাচলের রাস্তা বলে যা বিখ্যাত। তাং লাং লা। এর উচ্চতা ১৭৪৮০ ফুট। যদিও এ বিষয়ে একটু খটকা আছে আমার। সেটা যথা সময়ে বলব।

রাস্তা যেহেতু মসৃন তাই এবার হু হু করে পৌঁছে গেলাম সেই পরম কাঙ্খিত, মধুময় অথচ কাঠিন্যে ভরা লেহ শহরে। গমগমে শহর, প্রাণ প্রাচুর্য্যে উপচে পড়া শহর। প্রায় ১২০০০ ফুট উচ্চতায় এমন একটি প্রাচীন শহর যা শ্রদ্ধা আকর্ষণ না করে পারে না। শহরের এক দিক ঘিরে আছে অসাধারন এক তুষার মণ্ডিত পর্বত স্তোক কাঙ্গরি। তার সমস্ত শিখর গুলিতে যেন হীরকচ্ছটা। ‘কী অপূর্ব্ব শোভা তোমার কী অপূর্ব্ব সাজ’। হে ভারত ঈশ্বর, তোমার উপমা কেবল তুমিই।
সন্ধ্যার আলোকোজ্জ্বল লেহ শহরের এক অদ্ভুত মাদকতা আছে।কিসের একটা অদ্ভুত আকর্ষণ। হোটেল থেকে হাত ছোঁয়ালেই সামনে যেন অতুল উৎসারিত আনন্দের অপরিসীম প্রাচুর্য নিয়ে বিরাজিত শিখররাজি।স্তোক কাঙ্গরি।অস্তাচলের অরুণ আভায় সোনা রঙে মাখামাখি হয়ে আছে। তাড়াতাড়ি এক কাপ চা খেয়েই স্নান করে সারাদিনের ক্লান্তির নিরসনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। রাতের আহারাদিও বেশ পরিপাটি করে শেষ হল। অতি প্রত্যুষে ঘুম ভাঙল পাখীর কাকলীতে।গায়ে চাদর জড়িয়ে ধুমায়িত চায়ের গ্লাসের ওম দু হাতে নিতে নিতে বাইরে এসেই অনির্বচনীয় ভাললাগায় মন ভরে গেল। ভোরের আলো মাখা চিরনবীন আনন্দ স্বরুপ হিমালয় মধুর হাসি হেসে বিরাজমান। হে হৃদি বল্লভ, হে হৃদয়েশ, বারবার জন্ম জন্ম ভরে যেন তোমার পদতলে এ ভাবেই প্রণাম জানাতে পারি।
আজ আমাদের লেহ
বেড়ানোর দিন। পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়াটা এই খানে খুব জরুরী। আমরা সমতলের লোক, এত উচ্চতার জন্য শরীরের যে স্বাভাবিক সহনশীলতার ভারসাম্য তা কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেও হতে
পারে। তাই আজ সারাদিন আমরা লেহ শহরের এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে বেড়াবো। তাড়াতাড়ি তৈরি
হয়ে জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম আমরা।
সকালের লেহ শহরের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো, আর পাঁচটা ভারতীয় শহরের এই সময়ের ব্যস্ততার সাথে কোনই পার্থক্য নেই। ব্যাগ হাতে গেরস্ত দরাদরি করছে দোকানির সঙ্গে, এক বাস কচিকাঁচার কলকল স্বরে ইস্কুল যাবার তাড়া, সব একই রকম। কেবল সমস্তটাই ঘটছে অমসৃ্ন পাহাড়ী পথের হঠাত বাঁকের ভেতর।
সকালের লেহ শহরের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো, আর পাঁচটা ভারতীয় শহরের এই সময়ের ব্যস্ততার সাথে কোনই পার্থক্য নেই। ব্যাগ হাতে গেরস্ত দরাদরি করছে দোকানির সঙ্গে, এক বাস কচিকাঁচার কলকল স্বরে ইস্কুল যাবার তাড়া, সব একই রকম। কেবল সমস্তটাই ঘটছে অমসৃ্ন পাহাড়ী পথের হঠাত বাঁকের ভেতর।

আমরা এগিয়ে চলেছি লেহ শহর কে দুচোখ ভরে দেখে নিতে নিতে। রাজপথের বাঁ দিকে রেখে এলাম বিমান বন্দর, আমাদের সামনে সদা প্রকটিত আনন্দময় স্তোক কাঙ্গরি। আমরা ধরবো লেহ-শ্রীনগর রোড। চলতে চলতে প্রথম গন্তব্য শিখগুরু নানকজীর স্মৃতি বিজড়িত শ্রী গুরু পাথ্থর সাহিব। ভারতীয় সেনাবাহিনী অতি নিষ্ঠার সাথে রক্ষনাবেক্ষন করে চলেছে এই পবিত্র ধর্মস্থানের। কথিত আছে শিখ গুরু নানকজী পূর্ব ভারতের সিকিম প্রভৃতি রাজ্যগুলিতে পরিক্রমা শেষে কাশ্মীরের দিকে লেহ-এর পথে রওয়ানা হয়ে একদিন এই স্থানে উপস্থিত হন। সেই সময় এই অঞ্চলে এক অত্যন্ত দুষ্ট রাক্ষস বাস করত। আশপাশের গ্রামগুলির মানুষ এই দীনহীন সন্ন্যাসীকে পেয়ে তাদের দুঃখের কথা এবং রাক্ষসের অত্যাচারের কথা সবিস্তারে গুরুজীর কাছে ব্যক্ত করলো। গুরুজী কেবল তাদের ভগবানের কাছে আর্জি জানাতে বললেন। এই শুনে রাক্ষস ভাবল এই লোকটা হয়ত তার সর্বনাশ করতে এসেছে।এক দিন যখন গুরুজী ধ্যানমগ্ন সেই সময় দুষ্ট রাক্ষস এক বিরাট পাথর তুলে এনে গুরুজীকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। গুরুজীর ধ্যান তাতে বিন্দুমাত্র ভাঙ্গল না, কিন্তু ওই অতো বড় পাথরটি মুহূর্তে একটি বৃহৎ মোমের দলায় পরিণত হোল। পরবর্তীতে এই রাক্ষস গুরু নানকের আশ্রিত হয়ে ঈশ্বরের সেবায় মানুষের কল্যানে নিজেকে নিয়োজিত করেই কালাতিপাত করেন। সেই পবিত্র পাথর খন্ডকে নিয়েই এই তীর্থস্থান। আমরা মাথায় বস্ত্রখন্ড জড়িয়ে দর্শন ও পরিক্রমা শেষ করলাম। সেনা ভাইরা যত্ন করে লঙ্গড়ে বসিয়ে বাটি ভর্তি করে সেউ ভাজা আর বোঁদে সাথে চা খাওয়ালো।

এর পর চললাম চুম্বক পাহাড় দর্শন করতে। বস্তুতঃ বেশ কিছুটা অঞ্চল জুড়েই এই অদ্ভুত পাহাড় গুলো ছড়িয়ে আছে। গাড়ী সম্পূর্ণ বন্ধ করে কোন উৎরাইয়ের দিকে না রেখেও দেখেছি এক অজানা অমোঘ আকর্ষণে যাত্রী সমেত বড়ো বড়ো গাড়ীগুলো কেমন অক্লেশে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। সমগ্র অঞ্চলটাই চৌম্বকীয় ক্ষেত্র যেন। কিছুক্ষন এইখানে কাটিয়ে আবার চলা।

কিছুদূর গিয়েই বাঁ দিকে প্রথম দেখা গেল এক নবীন কিশোরের মতো চঞ্চল অথচ প্রায় গৈরিক বরনের এক নদ। ভারতের ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণই হতোনা এই ধারাটি না থাকলে। শিশু বয়স থেকে শুনে এসেছি এই নদের ধারায় আমার এই ভারত ভূমি পরিপুষ্ট ও পরিশীলিত হয়ে চলেছে যুগ যুগান্ত ধরে। এই সেই সিন্ধু নদ। যার নাম থেকেই আমার এই দেশ আর আমাদের পুরো সভ্যতার নামকরণ। সিন্ধু থেকেই হিন্দু এবং ইন্ডিয়া। এই নদের তীরেতেই লেখা হয়ে আছে শত শতাব্দীর ঘাত প্রতিঘাত বেদনা লাঞ্ছনা হাসি আনন্দের করুণ ভাস্বর কাহিনী।
আবেগে বিহ্বল হয়ে আপনা আপনি নত হয়ে এল মাথা। তোমার এই তীরই সমগ্র ভারতবাসীর কাছে মন্দির স্বরুপ।আজ আমি ধন্য। হে দেব, তোমায় শত কোটি নমস্কার। আরো কিছুটা এগোনোর পর আর একটি ধারা এসে মিলিত হয়েছে সিন্ধুর সঙ্গে। জাস্কার। এই দুই ধারা একসাথে মিলিত হয়েছে এখানে। উত্তুঙ্গ উত্তাল সামান্য শ্যামলিমা বর্জিত এই মসৃন পর্বত শ্রেনীর ফাঁকের মধ্যে এ এক মহা আয়োজন যেন। মোহনার এই আনন্দ মিলনের দৃশ্য দু চোখ ভরে দর্শন করে আবার যাত্রা করলাম।

এবার চলেছি লাদাখের বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির আলচি মনাস্ট্রী দেখতে। ঝকঝকে পিচ ঢালা মসৃন রাস্তা। রাস্তার ধারে গাড়ী দাঁড় করিয়ে দূর থেকে দেখে নেওয়া গেল বসগো প্যালেস।গাড়ী ছুটছে হু হু করে। দুই পাশে কত গ্রাম, বাড়ী ঘর, স্কুল, কলেজ। কখনো ডান ধারে চকচকে পাহাড়, কখনো বা বাঁ দিকে। পাহাড়ের গা দিয়ে রোদ ঠিকরে পড়েছে যেন।

এবার চলেছি লাদাখের বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির আলচি মনাস্ট্রী দেখতে। ঝকঝকে পিচ ঢালা মসৃন রাস্তা। রাস্তার ধারে গাড়ী দাঁড় করিয়ে দূর থেকে দেখে নেওয়া গেল বসগো প্যালেস।গাড়ী ছুটছে হু হু করে। দুই পাশে কত গ্রাম, বাড়ী ঘর, স্কুল, কলেজ। কখনো ডান ধারে চকচকে পাহাড়, কখনো বা বাঁ দিকে। পাহাড়ের গা দিয়ে রোদ ঠিকরে পড়েছে যেন।
এই সময়টা এখানে যেমন প্রচুর আপেল হয় তেমনি প্রচুর পরিমানে অ্যাপ্রিকট,যা বাংলায় আমরা খুবানি বলে জানি, ফলে থাকে গাছে গাছে। যেমন তাদের রুপ তেমনই তাদের স্বাদ আর গন্ধ। কোনটা কমলা, কোনটা আবার পেকে একেবারে টুসটুসে লাল। রাস্তার ধারে ছোটো ছোটো টুকরিতে বোঝাই করে স্থানীয় মেয়ে বউরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। রসে ভরা পাকা খুবানি, বীজ বের করে নেওয়া শুকনো খুবানি, বীজের ভেতর থেকে বের করে নেওয়া সুমিষ্ট খুবানি বাদাম, আখরোট, আপেল আরো কত কি। আমরা মনের আনন্দে দরাদরি করে অনেক কিনলাম গাড়ীতে খাব বলে। বৌ গুলি আমাদের আনন্দ আর উচ্ছাস দেখে কোঁচড় ভরে আরো একগাদা করে দিয়ে গেল গাড়ীতে এসে। পয়সাই নিলনা এই ফাউ এর। চলে আসার সময় সবাই বলল আবার এসো। সবাই কে হাত জোড় করে বলে এলাম ‘জুলে’। এই শব্দটা এদেশে এসেই শিখে নিয়েছি। ভারী মিষ্টি এই জুলে শব্দটির অর্থ হল নমস্কার। এই আমার দেশ। আমার মাতৃভূমি, সকলকে ভালবেসে বুকে টেনে নিতে জানে আপামর ভারতবাসী। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ আমাদের আসল ধর্ম।
চলবে।.................................................................................................




0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.