ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ১

ঘুরে এলাম লামাদের দেশে,  পর্ব - ১ 




অনেকদিনের একটা পাথর চাপা ইচ্ছে একটু একটু করে বুকের ভেতর হলুদ হতে হতে হয়ত বা শুকিয়েই মরে যেত যদিনা হঠাৎ করেই এই সুযোগটা আসত।আমি ভ্রমণ বিলাসী এবং ভ্রমণ করাই যেহেতু আমার পেশা তাই অতি পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কয়েকজনকে সঙ্গী করে বেড়িয়ে পড়লাম লাদাখ ভ্রমণে। প্রথম থেকেই ঠিক করেছিলাম উত্তুঙ্গ হিমালয় কে সঙ্গী করে সমস্ত চড়াই উৎরাইয়ের ভয় দূরে রেখে ধীরে ধীরে এগোব, সেই মতো ভোরবেলা উদিত সূর্যের প্রথম আলো গায়ে মেখে যাত্রা শুরু করলাম চন্ডীগড় রেল স্টেশন থেকে। আমাদের প্রথম গন্তব্য মানালী।

মহাত্মা মনুর নাম অনুসারে এই জায়গার নাম। মনুর আলয় থেকে আজকের মানালী। রাস্তায় পড়লো মান্ডী ও কুলু। বারবার ফিরে ফিরে আসি আমি এই জায়গাগুলিতে। প্রকৃতি দু হাত ভরে উজাড় করে রুপ লাবন্যে ভরিয়ে তুলেছে এই জায়গাগুলিকে। সারা রাস্তা আমাদের সাথে খেলতে খেলতে চলেছেন কলস্বিনী বিপাশা। ফেনিল উত্তাল জলরাশি পাথরে, নুড়িতে আঘাত করতে করতে চলেছেন, কলহাস্যে মুখরিতা নৃত্যরতা চঞ্চলা কিশোরী টি যেন।


কুলু থেকে আর একটি ধারা ডান দিকে বেঁকে গেছে পার্বতী নাম নিয়ে। ঐ পার্বতী নাম থেকেই ডান দিকের উপত্যকাটিকে পার্বতী ভ্যালী বলা হয়। ঐ পথ সোজা মনিকরণ গিয়েছে। হিন্দু এবং শিখদের বড় পবিত্র তীর্থস্থান এই মনিকরণ। এ যাত্রায় অবশ্য আমরা ঐ পথে যাচ্ছি না। সময় নেই। এই সময় মানালী, কুলু, মান্ডীতে গাছ ভরে আছে লাল লাল আপেলে। মানালী ম্যাল খুব সুন্দর। সাথে দেখে নিলাম বশিষ্ঠ মুনির আশ্রম আর হিড়িম্বা মন্দির।





মানালীর সন্ধ্যায় আকাশের ভারি মুখ ভার। হবেই তো,আসলে আগে কখনো মানালী এসে দু দিন না থেকে এমন চলে যাইনি। কে বলেছে যে পাহাড় কেবল একটি নিরেট জড় পদার্থ? এই আপাত নিশ্চল অপার গাম্ভীর্য মন্ডিত নিটোল ঢেউ খেলানো গিরিশ্রেনী তার অন্তরে নিশ্চুপে বহন করে চলেছে একটি অসম্ভব ভালবাসা জড়ানো মন। যে বোঝে সেই তাকে পায়।পাহাড়ের বুঝি অভিমান হয়েছে। বৃষ্টিস্নাত মানালীর ম্যালে দাঁড়িয়ে জোড় হাতে বন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইলাম। আবার আসব বন্ধু, এইবারটা আমায় ক্ষমা করো।

পরদিন সকালে ঝকঝকে আকাশ একগাল হাসি নিয়ে অভ্যর্থণা করলো আমাদের। জলখাবার পর্ব শেষ করেই বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। আজ যাব রোটাং পাস পেরিয়ে হিমাচলের লাহুল-স্পিতি জেলার শহর কেলং। ওখানেই আজকের রাত্রিবাস।

মানালী থেকে রোটাং পাস প্রায় ৫৫ কিমি পথ। বড় সুন্দর এই রাস্তাটুকু। সবুজ .শ্যামলিমায় আছন্ন হয়ে থাকা নরম পাহাড়, চূড়ায় জড়ানো বরফের শ্বেত উষ্ণীষ, আকুল দু হাত বাড়িয়ে আহ্বান করছে অতিথিদের। আমরা মোহাবিষ্টের মত ভালবাসার টানে ভাসতে ভাসতে চলেছি যেন।

রোটাং পাসের একটু আগে পথের ডান দিকে এক অপার বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল আমাদের জন্য। ঝরনার নাম রাহালা। অনেক উঁচু থেকে ঝরঝরিয়ে নেমে এসেছে একেবারে পথের ওপর। অপার্থিব পরিবেশ। খানিক ক্ষণ কাটানো গেল ঝরনার সাথে। এরপর রোটাং পাস। যতবার আসি ততবারই এক মধুর আনন্দে মন ভরে যায়। 

"অস্ত্ত্যত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা হিমালয়ো নাম নগাধিরাজ। পূর্ব্বাপরৌ তোয়নিধী বগাহ্য স্থিতঃ পৃথিব্যা ইব মানদ্ডঃ।।" মহাকবি কালিদাস তার কুমারসম্ভব কাব্য শুরুই করেছেন এই ভাবে। দেবতাদের আত্মা স্বরুপ গিরিরাজ হিমালয় এই দেশের উত্তর সীমায় অবস্থান করছেন। পূর্ব সমুদ্র থেকে পশ্চিম সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহান হিমালয় যেন পৃথিবীর মান দন্ড সদৃশ বিরাজিত। এই সেই নগাধিরাজ। হে মহাভাগ, তোমার শ্রী চরণ পাদপদ্মে কোটি কোটি প্রনতি, জয় গিরিরাজ হিমালয়ের জয়।


রোটাং পাস অতিক্রম করে এবার চলেছি কেলং। কিছুক্ষন পরেই পথের বাঁ দিকে আমাদের সঙ্গী হলেন ভাগা নদ, গিরিখাতের কখনো অনেক নিচে কখনো একেবারে কাছে প্রবহমান ধারা। অল্প পরেই ডান পাশ থেকে প্রকটিত হলেন আর একটি ধারা, ইনি চন্দ্র নদ। দুই ধারা একসাথে প্রবল আনন্দে মিলিত হয়ে চন্দ্রভাগা নাম নিয়ে বাম পার্শ্বে বয়ে গেলেন।এই চন্দ্রভাগা নদ চেনাব নাম নিয়ে প্রবাহিত পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে।কোন নিষেধের বেড়াজাল প্রকৃতি কে বেঁধে রাখতে পারে না। বড় সুন্দর এই মিলন। মন ভরে গেল আমাদের।


অল্প সময়ের যাত্রা বিরতির পর মুহূর্তগুলিকে ফ্রেমে বন্দী করে আবার এগোনো। রোটাং থেকে কেলং পর্যন্ত রাস্তা খুব খারাপ। বিশেষতঃ রোটাং পাসের ঠিক পরে। তবু হিমালয়ের এই অংশের অমলিন সৌন্দর্য্য আমাদের এতটাই মুগ্ধ করে রেখেছিল যে পথের কোন বাধাই আমাদের ক্লান্তিকর মনে হয় নি। আবার বলি, জয় গিরিরাজ হিমালয়ের জয়।



কেলং একটি ছোট্ট সুন্দর সাজানো গোছানো শহরের নাম যদিও, কিন্তু এতোই ছোট্ট যে গ্রাম বা পাড়া বললেও ভুল হবে না। বিকেল বিকেল পৌঁছে এক রাউন্ড চা পর্ব শেষ করেই বেড়িয়ে পড়া গেল পাড়া বেড়াতে। শোনা গেল পাশেই একটা পাহাড়ী নদীর খাত থেকে নাকি অসাধারন সূ্র্যাস্ত দর্শন হয়। কিছুদূর হেঁটেই প্রবল হাওয়া এবং তীব্র ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচতে কোনোরকমে ফিরতে হল হোটেলের নিরাপদ উষ্ণ আশ্রয়ের আলিঙ্গনে। ততক্ষনে সূর্য দেব সামনের হাত ছোঁয়া দুরত্বের পাহাড়টার শ্বেত শুভ্র মুকুটে রক্তাঞ্জলি নিবেদন করে বিশ্রাম নিতে চলেছেন। এ যেন বিধাতার মন্দিরে ধূপ দীপ রক্তচন্দন নিবেদন করে রাত্রের মত দেবতার শয়ান সম্পূর্ণ হল। 


কেলং শহরে ঘন ঘন আলো চলে যায়। আবার চলেও আসে। আধো অন্ধকারে মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় এই তীব্র শীতের সন্ধ্যায় কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ ও তেল দিয়ে মাখা মুড়ি চানাচুর আর এক গ্লাস ভর্তি চা এবং ভুতের গল্পের অনুপান সহযোগে জলযোগ সমাপ্ত করলাম আমরা। রাত্রের ডিনার ও খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হল সেদিন। 


পরদিন আমাদের যাত্রা শুরু হল ঠিক ভোর পাঁচটায়, তখনো গভীর অন্ধকার। ঘুমন্ত কেলং শহরকে পেছনে ফেলে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম লেহ অভিমুখে। আজ প্রায় ১০ ঘণ্টার যাত্রা পথ। কেলং ছাড়িয়ে মাত্র ২৫ কিমি পরেই জিস্পা, সাজানো গোছানো সুন্দর জায়গা। তার পরেই ধারছা, ধারছার পরেই সুরজ তাল। অতি ছোট একটি তালাও বা পুকুর, মন ভরলো না দেখে। এই সুরজ তালের কিছু পরেই শুরু হলো বারালাছা লা পাস। 


লা শব্দের অর্থ পাস বা গিরিপথ। সাধারণত কোন একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের কোল ঘেঁষে যে গিরিপথের সৃষ্টি হয়েছে সেই গ্রামের নামেই সেই গিরিপথের নাম হয়, যেমন খারদুং লা, তাঞ্জাং লা। তেমনি বারালাছা লা। রোটাং পাস পেরিয়ে আসার পরে প্রথম এবড়ো খেবড়ো আর অসংখ্য সঙ্কীর্ণ বাঁকের এই গিরিপথ বেশ কষ্টকর।

আমরা অকুতোভয়। ক্যামেরা বাগিয়ে এগোচ্ছি সকলে। বারালাছলা পেরিয়ে সারচু। পথের ঝাঁকুনিতে সকলেরই কোমড় ধরে এসেছে, তাই চা পানের বিরতি। অনেকে মানালী থেকে ভোর ভোর যাত্রা করে এই সারচুতে এসে রাত কাটান। তাদের অনেকেরই শ্বাস কষ্ট হয়। একনাগাড়ে এতখানি উচ্চতায় হঠাত উঠে এলে সেটা কিন্তু হতেই পারে, তাই শরীর যতটুকু নিতে পারে ততটুকুই দিয়ে সইয়ে সইয়ে পথ চলাই শ্রেয়।



চলবে।.....................................................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ