রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৪
আমার আগেই দলের আরো কয়েকজন ক্যামেরা নিয়ে চাঁদ শিকারে সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন ততক্ষনে। নির্মেঘ আকাশ, সমস্ত উপত্যকাটি যেন সেই স্বর্গীয় কিরনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। পুব আকাশে চাঁদের গায়ে দলা পাকানো মেঘ রাশি, মদালস অংশুমান কখনো সম্পূর্ণ কখনো কিয়দংশ যেন কোন এক অজানা লজ্জায় বারবার মেঘের ভেতর মুখ লুকোচ্ছে। এ যেন ভুবনেশ্বরীর নিপুন খেলা। ওই শীতার্ত মাঝ সন্ধ্যায় আমরা কয়েকজন প্রকৃতি দেবীর অতি ক্ষুদ্র সন্তান বিহ্বল ব্যাকুলতায় তার এই অবিস্মরণীয় শান্ত খেলার সাক্ষী হয়ে রইলাম।
খাবার ঘর থেকে ডাক এলো। নিতান্ত অনিচ্ছায় গুটি গুটি পা বাড়ালাম সকলে। ভাত, রুটি, সব্জি, ডাল, আচার, মুরগীর ঝোল সাথে পাঁপড় আর সিমুইয়ের পায়েস। ভোজন পর্ব শেষ করে আরো বেশ কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে শুতে গেলাম। বাইরে জ্যোৎস্নাময় নিশুতি রাত্রি নিভৃত উন্মাদনায় ঝিঁঝিঁ পোকার কলতান সঙ্গীতে মুখর হয়ে রইলো।
অতি ভোরে ঘুম ভাঙল, ঘড়িতে তখন মাত্র সাড়ে চারটে। তাড়াতাড়ি ব্রাশ নিয়ে কলঘরে ঢুকলাম। বাইরে দলের অন্যান্য সদস্যদেরও গলার আওয়াজ পাচ্ছি। তৈরি হয়ে হাতে টর্চ নিয়ে ওপরে উঠলাম। আলতো ভোরের আবছা আলোয় স্নিগ্ধ মৌন চরাচর। ফুলগু্লো সারা রাতের শিশিরে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, এক্ষুনি দেবতার পুজায় নিবেদিত হবার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে যেন। লোহার চেয়ার আর বেঞ্চ গুলো পুরো ভিজে, বসার উপায় নেই। সূর্যোদয়ের এখনো কিছুটা দেরী আছে। পশ্চিম আকাশে অর্থাৎ যে দিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা সেই দিকে মেঘে ভরে রয়েছে। এই স্তুপাকার মেঘরাশি যে খুব তাড়াতাড়ি সরে যাবে তাও বোধ হচ্ছে না এই মুহূর্তে। আপাতত তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো একবার পুব আকাশ আর একবার পশ্চিম আকাশের দিকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। ঘন ঘন ফ্ল্যাশ এর শব্দ উঠছে আশপাশ থেকে। ফুল গাছ লতা পাতা ভোরের আবছা কুয়াশা সব কিছুই মুহু্র্তে মুহুর্তে বন্দী হয়ে পড়ছে ক্যামেরার অলিন্দে। ধীরে ধীরে পুব আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হতে লাগলো, অথচ পশ্চিম আকাশে কোথা থেকে যেন দল বেঁধে দফায় দফায় মেঘেদের আগমন চলতে থাকলো। জানিনা কি অপরাধ করেছিলাম, আজ ভোরে তাই কাঞ্চনজঙ্ঘা বিরুপ হয়ে আমাদের দর্শন না দিয়েই রইলেন, ভগ্ন মনোরথ হয়ে নীচে নেমে এলাম। প্রভা দিদির রান্না ঘর থেকে প্রভাতী চা-বিস্কুট নিয়ে দুজন হাজির। চা খেয়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে জলখাবারের পর্ব মিটিয়ে আবার যাত্রা করতে হবে আমাদের। আজ সামান্য পথ। যাবো আরিতার, ওখানেই আজকের রাত্রিবাস।
বেরোতে বেরোতে বেশ দেরী হয়ে গেলো। দুটো ঘরের গীজার হঠাৎ করে কাজ না করার ফলে আর বার দুই করে ঠিক হয়েও পুনরায় বিগড়ে যাবার ফলে গরম জলের সমস্যা দেখা দিয়েছিলো। অবশেষে রান্না ঘর থেকে তিন বালতি গরম জল এনে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা গেলো। জলখাবার খেয়ে যখন রওয়ানা হলাম তখন ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে।
বেশ ঘন মিস্টি মিস্টি রোদ্দুরে ভরে আছে চার পাশ। পাকদণ্ডী বেয়ে ধীরে ধীরে গড়িয়ে নেমে এলাম আমরা। আমাদের আজকের প্রথম গন্তব্য আরিতার লেক। স্থানীয়রা আদর করে এই লেক কে লামপোখরি লেক ও বলে থাকে। বড়ো চওড়া গেটের মুখেই টিকিট কাউন্টার। বাইরে বেড়িয়ে এসে গাড়ী এবং সওয়ারী পিছু মাথা গুনে টিকিট কাটলেন কাউন্টারের লোকটি। সামনে খানিকটা উন্মুক্ত জায়গা গাড়ী পার্ক করবার। রেলিং ঘেরা বিরাট লেকের চারপাশ ঘিরে রয়েছে অনন্ত বিশাল পর্বত রাজি। পাহাড়ের সবুজ ছায়া পড়েছে লেকের জলে। দুই পাশ দিয়ে সুন্দর বাঁধানো রাস্তা গোল করে ঘিরে আছে লেকটিকে।ডান দিক দিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বড়ো বড়ো পাইনের ছায়া ঘেরা পথ দিয়ে হেঁটে গিয়ে একটা সুন্দর দু তল বিশিষ্ট মন্দির, ওপর থেকে লেকটাকে আরো সুন্দর লাগছে। বাঁ দিকে গেলে সুন্দর বাঁধানো বোট ছাড়বার জেটি, টিকিট কাউন্টার। অনেকে প্যাডেল বোট ভাড়া করে আধ ঘন্টা-এক ঘন্টা নৌকা বিহারের মজা নিচ্ছেন দেখলাম। বেশ মনোরম স্বর্গীয় পরিবেশ। দুই ধারের পথের মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো রঙ্গিন সিমেন্টের ছাতা এবং তার নীচে লোহার বেঞ্চ পাতা। প্রাকৃতিক মধুরতার মাঝে ক্লান্তি এলে ক্ষণিকের বিশ্রাম স্থল। অনেক গুলো বড়ো বড়ো রাজ হাঁস এবং আরো বেশ কিছু প্রজাতির হাঁস জাতীয় পাখী জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে। তাদের মধুর কোলাহলে মুখরিত হয়ে আছে লেকের পাড়। অনেকে এদের জন্য খাবার কিনে এনে খেতেও দিচ্ছেন দেখলাম। লেকের জলে অসংখ্য বড়ো বড়ো মাছ, এই মাছ ধরা নিষিদ্ধ। লোকে লেকের জলে মুড়ি ছুঁড়ে ছুঁড়ে এদের খাওয়াচ্ছে। জল তোলপাড় করে এর ওর ঘাড়ের অপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে মুড়ি খাচ্ছে ওই রাক্ষুসে মাছেরা। বেশ অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে এবার আমাদের আজকের বাসস্থান অভিমুখে এগোনো গেলো।
ছিমছাম ছোট্ট এক খানি গ্রাম এই আরিতার। দোকান বাজার স্কুল সব কিছু নিয়ে জমজমাট পরিবেশ। আরিতার থেকে কালিম্পং যাবার পথের ওপর আমাদের আজকের আস্তানা। তিনতলা বেশ বড়ো বাড়ী। প্রথম দুই তলা যাত্রীদের ভাড়া দেওয়া হয়, তৃতীয় তলটিতে মালকিন তার পরিবার নিয়ে বাস করেন। অল্প বয়সী মেয়েটি তার পারিবারিক সূত্রে এই সম্পত্তিটি লাভ করেছে। ওর স্বামীর এলাচের ব্যাবসা, অবসর সময়ে স্ত্রীর ব্যবসাতেও হাত লাগান তিনি। ছোট ছোট দুই পুত্র, এক কন্যা একটি অবিবাহিতা ননদ কে নিয়ে ভরপুর সাজানো সংসার ওর। আধুনিকা, শিক্ষিতা এই মেয়েটির আতিথেয়তায় আমরা সকলেই মুগ্ধ হলাম। অত বেলাতেও আমাদের আবদারে সুদৃশ্য পোর্সেলিনের কাপে লাল চা আর নোনতা বিস্কুট খাওয়লো সকলকে।
মুখ হাত ধুয়ে তিনতলায় ডাইনিং হলে খেতে গেলাম সবাই। ধোঁয়া ওঠা গরম সরু চালের ভাত, তা’তে কোলকাতা থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া ঘী, সবজি দেওয়া ডাল, ঝুরি ঝুরি আলু ভাজা, বাগান থেকে সদ্য তুলে আনা রাই শাক হাল্কা করে ভাজা, ফুলকপির তরকারি, ডিমের ঝোল, চাটনি, পাঁপড়।আমাদের এক দাদা কোলকাতা থেকে পেঁড়া নিয়ে গেছিলেন, শেষ পাতে ডেজার্ট হিসেবে চমৎকার জমে গেলো সেই মিস্টি। ভরপেট খাওয়ার পর ভেবেছিলাম একটু গড়িয়ে নেবো, কিন্তু জানা গেলো সামনেই একটি প্রাচীন মনাস্ট্রী রয়েছে আর দুপুরের মিস্টি রোদ গায়ে মেখে গাছপালা ঘেরা পাহাড়ী পথে পদচারনে খাবারটাও চটপট হজম করা যাবে, তাই কয়েকজন কে সঙ্গী করে বেড়িয়ে পড়লাম।
নামার সময় মাঝের একটি চওড়া ধাপে একটি চা-কফির দোকানে বসা গেলো। আসন্ন বিকেল বেলায় এমন ঘন গাছ পালা জড়ানো পাহাড়ের চূড়ায় গরম এস্প্রেসো কফির স্বাদে মন জুড়িয়ে গেলো, চড়াই ভাঙার ক্লান্তিও দূর হলো কিছুটা। নীচে নেমে এবার চললাম মনাস্ট্রী দেখতে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এই এতো বড়ো আয়োজনটিকে। কি নিপুন দক্ষতায় তিল তিল করে বানানো এই প্রার্থনা গৃহটি যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বিরাট একটি ধর্ম চক্রও রয়েছে একধারে। আমরা ‘ওম মনি পদ্মে হুম’ বলে ঘুরিয়ে এলাম চক্রটি। প্রার্থনা কক্ষের তালা খুলে যে ছোট খাটো চেহারার খাটো কাপড় পরা বৃদ্ধ ব্যাক্তিটি আমাদের আহ্বান জানালেন, জানা গেলো ইনিই এই মনাস্ট্রীর বর্তমান পুরোহিত এবং রক্ষক। প্রায় একক প্রচেষ্টায় এতো বড়ো একটি বৃহৎ প্রচেষ্টাকে নিরলস ভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন এই বৃদ্ধ মানুষটি যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। নিতান্ত কিশোর বয়সে বাড়ী ঘর পিতা মাতা ত্যাগ করে কেবল মাত্র বুদ্ধদেবের বানীকে সত্য জেনে অকুন্ঠিত হয়ে শরণাগত হয়েছিলেন এই মানুষটি, আজও এই প্রায় আশি বছর বয়সেও অক্লান্ত ভাবে তিনি প্রভু বুদ্ধের সেবক, প্রভু বুদ্ধের একান্ত শরণাগত এই নিষ্কলুষ মানুষটির জন্য শ্রদ্ধায় নত হয়ে প্রণাম জানিয়ে এই প্রাক সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকার পাহাড়ী রাস্তায় বাম পার্শ্বের সুগভীর খাদের অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা সম্মিলিত ঝিঁঝিঁ পোকার বিষন্ন আলাপ শুনতে শুনতে ঘরে ফিরে এলাম।
প্রভাদিদির ঘরের দিক থেকে সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি ভেসে এলো। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চা আর পকৌড়ার খোঁজে রান্না ঘরের দিকে পা চালালাম। চা, গরম গরম আলু পেঁয়াজের পকৌড়া আর মুড়ি-চানাচুর দিয়ে অসাধারন এক গ্রামীন সন্ধ্যা কাটানো গেলো। তখনি আবিস্কার করলাম ব্যালকনির বাইরে দিয়ে যে ঢালু উপত্যকাটি গড়িয়ে নেমে নীচের ঘর গুলোর দিকে গিয়েছে সেই পুরো পাহাড়তলিটি সদ্য ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা চাঁদের আলোয় এক মায়াময় স্নিগ্ধ প্রান ভেজানো স্বর্গীয় জ্যোৎস্নায় মুখর হয়ে আছে। এমন অদ্ভুত নিবিড় মন কেমন করা ভিজে রোশনাই, ছায়া মাখানো বড়ো বড়ো গাছগুলোর সারা অঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে এক অদৃষ্টপূর্ব মায়াময় মরীচিকার সৃষ্টি হয়েছে যা আগে কখনো দেখিনি। তীব্র ভালো লাগায় জারিত হতে হতে ওপরের ধাপের ভিউ পয়েন্টের দিকে অর্থাৎ ছাতার দিকে পা বাড়ালাম।
এবড়ো খেবড়ো রাস্তা, কয়েক জায়গায় রাস্তা সারানোর কাজও চলছে দেখলাম। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে গেলাম মাঙ্খিম ভিউ পয়েন্ট দেখতে। বড়ো রাস্তার ওপর থেকে প্রায় ২০০ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে হয়। রেলিং দিয়ে ঘেরা রয়েছে সিঁড়ির এক ধার। মাঝে মাঝে বড়ো ধাপ গুলোয় একটু করে জিরিয়ে নিয়ে আবার ওঠা। রেলিঙের অন্য পাশ দিয়ে সবুজ ঢালু উপত্যকা সোজা নেমে গিয়েছে অতলান্ত খাদের দিকে। ঘন হয়ে জেগে আছে শাল, সেগুন, পাইন, ইউক্যালিপটাসের মতো বড়ো বড়ো বৃক্ষ সমূহ। একটা চেরী গাছ দেখলাম বেগুনী রঙা ফুলের ভারে সম্পূর্ণ বিভোর হয়ে আছে। ওঠবার রেলিঙের ধারে ধারে সুন্দর করে সাজিয়ে লাগানো হয়েছে রঙ বেরঙের গাঁদা ফুল। ডান পাশের সামান্য খালি ধাপে মাচার মতো করে সযত্নে লাগানো হয়েছে লতানো স্কোয়াশ গাছ, কচি কচি স্কোয়াশে ছেয়ে আছে গাছ গুলো, মাচা ছাড়িয়ে আশে পাশের বড়ো বড়ো গাছ গুলিতেও ডালপালা বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়েছে তারা। একটু একটু করে উঠে এলাম ভিউ পয়েন্টের চূড়ায়। সুন্দর সাজানো ভাবগম্ভীর একটি শিবের মন্দির রয়েছে এখানে। সাধারণত এমন ভর দুপুরে কেউ আসেনা, তাই মন্দির বন্ধ এখন। কাঞ্চনজঙ্ঘা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে আছেন মেঘের গভীরে এই মুহূর্তে। গোল করে রেলিং দিয়ে ঘেরা সমস্ত পরিসর। আরিতার লেকটিকে এতো ওপর থেকে খুব স্পষ্ট আর সুন্দর লাগছে। অনেক দূরে সরু সূতোর মতো দেখা যাচ্ছে সিকিমের একমাত্র বিমানবন্দরের রানওয়ে। এতো উচু থেকে সমস্ত জায়গাটি এই খর রৌদ্রালোকিত দ্বিপ্রহরেও মনে হচ্ছে যেন তুলি দিয়ে আঁকা রবি বর্মার একখানি সজীব তৈল চিত্র। চিত্রার্পিত শব্দটি এর আগে বহুবার শুনেছি যদিও, আজ নির্বাক নিঃস্পন্দ অবস্থায় শব্দটির যথার্থতা মর্মে মর্মে অনুভব করলাম।
চলবে..............................................................................















0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.