ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৮
লেহ থেকে কারগিল
খুব সকালে ঘুম ভাঙল। ঘরের চওড়া জানালার সব কটি পর্দা সরিয়ে দিতেই দু হাত বাড়িয়ে যেন আলিঙ্গন করলো সদা হাস্যময় নির্মল অপাপবিদ্ধ স্তোক কাংরি। সঙ্গে সঙ্গে মন ভালো হয়ে গেল। এই অপরুপ অকুন্ঠ সৌন্দর্যরাশি ছেড়ে এক মূহুর্ত কোথ্থাও যেতে ইচ্ছে করে না। স্বর্গীয় সুষমা শব্দটি যে ঠিক কি তা’ হয়তো এখানে এসে এই অনাদি অনন্তময় চির ভাস্বর স্তোক কাংরিকে না দেখলে বুঝতাম না। দোতলার এই ঘর থেকে নীচের গাড়ী বারান্দাটি দেখা যাচ্ছে পরিস্কার। আমাদের আজকের সারথী ততক্ষনে গাড়ী ধোয়া ধুয়ি সেরে চায়ের পেয়ালা হাতে আমায় হাত নেড়ে সুপ্রভাত জানালো। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে গেলাম। জলখাবার পর্ব মিটিয়ে বেড়োতে বেড়োতে আটটা বেজে গেল। শেষ বারের মত জুম ভাই, সেলিম ও সেলিমের মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলাম আমরা।
আজ আমরা যাব শ্রীনগর-লেহ জাতীয় সড়ক ধরে। এই রাস্তায় লেহ থেকে দ্বিতীয় দিনে বেড়াতে গেছিলাম। আলচি মনাস্ট্রি পর্যন্ত আমাদের চেনা পথ। গাড়ী ছুটল চওড়া মসৃণ পথ ধরে। খুব সুন্দর ঝকঝকে রাস্তা। আমাদের সারথীর নাম ফইজু। শ্রীনগরে বাড়ী। তীক্ষ্ণ চেহারা।এক নজর দেখলেই কাশ্মীরি বলে চিনতে ভুল হয়না। শ্রীনগরে ওর দাদার ফার্নিচারের ব্যবসা। গাড়ীটাও দাদারই কেনা বছর চারেক আগে। এখন ভাই গাড়ী চালিয়ে সংসারের উপার্জন কিছুটা বাড়াবার চেষ্টা করছে। বেশ ভদ্র ছেলেটি।
খালসার বাজার
আলচি মনাস্ট্রি যাবার রাস্তা পেরিয়ে এসে বেশ কিছু পরে একটি বেশ ব্যস্ত জনবহুল গঞ্জের মতো জায়গায় গাড়ী দাঁড়ালো। জায়গার নাম খালসার। এখানেই একটি কলেজে জাভেদ অধ্যাপনা করে। রাস্তার ধারে দোকানে শুকনো ফল, আপেল, আখরোট প্রভৃতি বিক্রি হচ্ছে। ইয়াকের দুধ দিয়ে এক রকমের খুব মিষ্টি চকোলেট তৈরি করে বিক্রি হতে দেখলাম। অসাধারণ তার স্বাদ আর গন্ধ।
মুন ল্যান্ড
খালসার ছাড়িয়ে এসে এ রাস্তার দুই পাশের পর্বত শ্রেনীর রুপ বদলে যেতে লাগলো। পর্বত গাত্রে পাথরেরও যে এমন মধুর নয়নাভিরাম রুপ হতে পারে তা’ আগে জানতাম না। ফইজু ভাই বললো এই শুরু হলো চাঁদের দেশ বা মুন ল্যান্ড।
দীর্ঘ পথের কখনো বাঁ দিকে কখনো ডান দিকে প্রকৃতির আপন খেয়ালে পাথরের গায়ে সৃষ্টি হয়েছে অপূর্ব শৈলী।কি এক দুর্দম্য ইচ্ছায় আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে মিশিয়ে নিপুন সুন্দর করে বিধাতা পুরুষ এই অসামান্য কারুকার্যের নির্মাণ করেছেন তা’ ভাষায় প্রকাশ করে বোঝান যাবেনা।
লামায়ুরু মনাস্ট্রি
দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম লাদাখের বিখ্যাত বৌদ্ধ গুম্ফা লামায়ুরু মনাস্ট্রিতে। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ওপরে প্রায় একটা পাহাড়ের মাথায় এই মনাস্ট্রি। অনেক বড়ো জায়গা নিয়ে পাহাড়ের ধাপে ধাপে তৈরি এই প্রাচীন গুম্ফা। মন্দিরের ভেতর অসংখ্য প্রদীপ জ্বালিয়ে একজন লামা সন্ন্যাসী পূজা করছেন। শান্ত সমাহিত, সুগন্ধিত অমলিন পরিবেশ।
এক প্রান্তে আর একজন লামা পুরোহিত একতাল ময়দা থেকে একটু একটু করে নিয়ে নিয়ে ময়দার পুতুল বানিয়ে একটি বিরাট কাঁসার থালায় সাজিয়ে রাখছেন। এগুলো পূজাতে লাগবে। আর একটি ঘরে দেখলাম ঘন্টা বাজিয়ে সামনে একটি লাল শালুতে জড়ানো পুঁথি থেকে উচ্চস্বরে একরকম গাম্ভীর্য পূর্ণ ধ্বনি সহকারে মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে লামা পুরোহিত পূজা করে চলেছেন। কোথাও কোন গোলযোগ নেই। এক অপূর্ব প্রশান্তিতে মন ভরে গেলো। সমগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই তীর্থস্থান জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রসার ও প্রচার এবং চর্চ্চার জন্য অতি সুবিদিত একটি নাম।
আরো একটি তথ্য পেলাম এই গুম্ফার গায়ে লিখিত সংক্ষিপ্ত
ইতিহাস থেকে। ৯০০ থেকে ১০০০ খ্রীস্টাব্দের কোন এক সময় আমাদের এই গঙ্গা তীরবর্ত্তী
বাংলা থেকে এক বাঙালি রাজপুত্র যার নাম সামন্তভদ্র, এক গভীর মানসিক টানের বশবর্ত্তী হয়ে কাশ্মীরে এসে উপস্থিত হন জ্ঞান ও শিক্ষা
লাভের উদ্দ্যেশ্যে। সেই খান থেকে আরো উচ্চ শিক্ষা প্রাপ্তির আশায় তিনি যান নালন্দা
বিশ্ববিদ্যালয়ে। অতঃপর প্রবল আধ্যাত্মিক আকর্ষণে ঘুরতে ঘুরতে তিনি উপস্থিত হন লাদাখের এই জায়গায়। এই স্থানে এক গুহার ভেতর
দীর্ঘদিন তপস্যা করেন তিনি। পরবর্তী কালে এই বৌদ্ধ সাধক নারোপা নামে বিখ্যাত হন
এবং তার শিষ্যদের সাহায্যে অনেক মুল্যবান বৌদ্ধ পুঁথির অনুবাদ এবং সংরক্ষন করেন।
বাঙালি হিসেবে গুরু নারোপার কথা জেনে আমার রীতিমতো রোমাঞ্চ হলো।
ফাতুলা টপ
লামায়ুরু দর্শন করে আবার আমাদের গাড়ী ছুটলো কারগিলের দিকে। ঝকঝকে রাস্তা, দুই ধারের নয়নাভিরাম পর্বতের মাঝখান দিয়ে হু হু করে ছুটে চলেছি কাশ্মীর উপত্যকার দিকে। একটু একটু করে দৃশ্যাবলী বদলে যাচ্ছে। গাড়ী এসে দাঁড়ালো লেহ-শ্রীনগর রাজপথের সর্বোচ্চ চুড়ায়।এর নাম ফাতুলা টপ।প্রায় সাড়ে তেরো হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই চুড়ায় বেশ হাওয়া বইছে। কিছুক্ষন এখানে কাটিয়ে আবার যাত্রা করলাম আমরা।
কারগিল শহর
এবারে পাহাড়ের গায়ে ধীরে ধীরে গাছপালা, বৃক্ষ প্রভৃতি দেখা যাচ্ছে।অনেকদিন পর পাহাড়ের মসৃণ পাথুরে গাত্রের পরিবর্তে আবার শ্যামলিমায় ছাওয়া চক্ষুর আনন্দ উদ্রেককারী সবুজ পাহাড়ের সারি চোখে পড়ছে। কিছুক্ষন পর অনেক উঁচু থেকে আমাদের ডান দিকে সিন্ধু নদের কোলে সবুজ গাছপালা ছাওয়া ছবির মতো কারগিল শহরের দেখা পাওয়া গেল। প্রথম দর্শনেই মন কেড়ে নেয় এই শহর। একটু একটু করে নীচের দিকে নেমে সিন্ধু নদ কে বাম পাশে রেখে আমরা শহরে প্রবেশ করলাম। অত্যন্ত জনবহুল প্রায় ঘিঞ্জি শহর। রাস্তায় গাড়ী চালানো বেশ কষ্টকর। রাস্তা খুব চওড়া নয়। রাস্তায় গিজগিজ করছে লোকজন। যেখানে সেখানে গাড়ী রাখা, তার ওপর মুহরমের উৎসব উপলক্ষে দোকান বাজারে কেনাকাটার ধুম পড়ে গেছে। মহিলারা কালো বোরখায় এবং বেশীর ভাগ পুরুষেরাই কালো আলখাল্লার মতো বড়ো ঝুলের জামায় আবরিত। বেশ প্রাণ আছে এই শহরটায়।
হোটেল জোজিলা, কারগিল।
জ্যাম কাটিয়ে এসে পরলাম আমাদের আজ রাত্রের বাসস্থানে। সিন্ধু নদের পাশেই হোটেল। অনেক বড়ো জায়গা নিয়ে সাজানো গোছানো হোটেলটি রাস্তার ধারেই। হোটেলের ম্যানেজার অঙ্কুশ আমার পূর্ব পরিচিত। জম্মুর ছেলে। দুপুরের খাবার আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো তারা।
আমরা ঘরে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিং হলে এসে দেখলাম সুন্দর পাঁঠার মাংসের ঝোল আর ভাত। আহা, প্রাণ মন ও রসনা একেবারে জুড়িয়ে গেলো। সাধে কি আর কবি বলেছেন, “জেনো বাসনার সেরা বাসা রসনায়।“
লাইন অফ কন্ট্রোল বা এল ও সি দর্শন
আমরা এখন যাব লাইন অফ কন্ট্রোল বা সংক্ষেপে L.O.C. দেখতে। আসলে যাব ভারত-পাক সীমান্ত দেখতে। আমাদের এই গাড়ী যেতে পারবে না।কারগিলে স্থানীয় দ্রষ্টব্য কেবল কারগিলের গাড়ী নিয়েই করতে হবে এমনটাই নিয়ম। হোটেল কে বলে গাড়ীর ব্যবস্থা করা হলো। কারগিল শহর ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে গাড়ী উঠছে পাহাড়ের মাথায়। এবড়ো খেবড়ো ভাঙ্গা রাস্তা। অনেক নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধু নদ। দুধারে পাইন গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই পথের সৌন্দর্য অতুলনীয়। ওঠার পথে চালক দেখাল পাহাড়ের মাথায় ভারতীয় সেনা বাহিনীর বাঙ্কার। শীতের সময় পুরু বরফের আচ্ছাদনে ঢেকে যায় এই পুরো অঞ্চল। তখনো নিশ্চল এবং অতন্দ্র থেকে পাহারায় অবিচল থাকেন এখানে আমাদের সেনা ভাইয়েরা।ধন্য এদের দেশভক্তি এবং নিষ্ঠাকে। জয় হোক ভারতীয় সেনার, জয় হোক মহান ভারতবর্ষের। লাইন অফ কন্ট্রোল থেকে একেবারে প্রায় দুই পক্ষেরই ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে দুই দেশের অবস্থান। আমাদের এই পাড় থেকে পাহাড়ের অন্য প্রান্তে দেখা যাচ্ছে বাড়ী ঘর এমনকি একটি মসজিদ পর্যন্ত। দু পক্ষই নিশ্চয়ই সমান সজাগ আর আমার মনে হয় দুই পক্ষেরই সেনা জওয়ানেদের পরিবার বর্গ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষায় দিন কাটান তাদের প্রিয়জনেদের কুশল সংবাদের জন্য।রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দে অমঙ্গল, তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা’ বল। সীমান্ত রেখায় দাঁড়িয়ে হঠাৎই মনে এলো গানটা। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। L.O.C দেখে আবার ফিরে এলাম সিন্ধু নদ কে সাক্ষী রেখে। এই অপরিসীম সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে যদি বসে আছো হে রাজাধিরাজ, তবে কেন এখানে এতো হানাহানি এতো হিংসা জড়ো করে রেখেছো? যতোই নাম দিয়ে তোমায় ভাগ করা হোক না কেন তুমি তো একই, সকলেই তো তোমারই সন্তান, তবুও এ তোমার কি অসম্ভব মরণ খেলা প্রভু। রক্ষা করো প্রভু, তোমার সৃষ্টিকে ধ্বংসের হাত থেকে তুমিই রক্ষা করো।
প্ল্যাটুনাথ বাবা মন্দির, কারগিল।
সিন্ধুর পাশ দিয়ে এগিয়ে ভারতীয় সেনা বাহিনীর ছাউনির কাছে অনেক চওড়া একটি মালভূমি অঞ্চল। কারগিল প্ল্যাটু নামে বিখ্যাত। এইখানে সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে একটি শিব মন্দির গড়ে উঠেছে। প্ল্যাটুনাথ বাবা মন্দির। সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা নিজেরা পূজো করেন, আরতি করেন, ভোগ নিবেদন করেন। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং মনোরম পরিবেশ।
আমরা মন্দিরে বসে পুজা ও আরতি দেখলাম। প্রসাদ পেলাম, ঘী দ্বারা প্রস্তুত গরম হালুয়া। রাজপুত রেজিমেন্টের ছেলেরা শিবস্তুতি ও বন্দনা পরিবেশন করলো অন্তরের শুদ্ধতা দিয়ে। ভারি ভালো লাগলো জায়গাটি। এই স্থানেরও একটি গল্প আছে।
বর্তমান মন্দিরের ঠিক পেছনে ১৯৭১ সালের আগে থেকেই একটি ছোটো ঝোপড়া বানিয়ে একটি লোক বাস করতেন। জীব জন্তুদের বিশেষ করে কুকুর, গরু প্রভৃতি প্রানীদের খুব যত্ন করতেন তিনি। শিব ভক্ত এই মানুষটি কারো সাথে বিশেষ কথা বলতেন না। স্থানীয় লোকেরা তাই একে পাগল বলেই ধরে নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সারা কারগিলে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বড়ো বড়ো সেল, মর্টার প্রভৃতি ফেলে ভয়ানক ত্রাসের সৃষ্টি করছিলো এবং সেই গুলোর ভয়ঙ্কর বিস্ফোরনের শব্দে সারা কারগিল কেঁপে কেঁপে উঠছিল সেই সময় এই মালভূমি অংশেও প্রচুর পরিমানে সেল এসে পড়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যের কথা যে সেই সেল গুলির একটিও ফাটেনি। আশেপাশের গ্রামের লোকজন কে ডেকে একদিন এই লোকটি অনুরোধ করলেন পাশের নালায় এগুলো তুলে ফেলে দিয়ে আসতে। পাছে বিস্ফোরন হয় এই ভয়ে কেউ সাহস করে এগুলোতে হাত ছোঁয়াল না। তখন লোকটি নিজেই কষ্ট করে একটা একটা করে সেল পাশের নালায় তুলে ফেলতে লাগলেন আর প্রতিটা সেল সশব্দে ফেটে নষ্ট হতে লাগলো। এই কান্ড দেখে গ্রামের লোকেদের ধারনা হল এই ব্যাক্তি কোন সাধারন লোক নয়। এই ব্যাক্তি গ্রামের লোকেদের সাহস দিয়ে বললেন এই মালভূমি তে কোন অমঙ্গল কখনো ঘটবেনা যদি সবাই ভক্তি ভরে শিবপুজা করেন। হঠাৎ একদিন এই লোকটিকে আর এই অঞ্চলের কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। এমনকি এই ব্যাক্তির নামটাও কেউ জানতো না, তাই এই অঞ্চলে স্থানীয় লোকজনের চেষ্টায় এই মন্দির তৈরি হয়ে প্ল্যাটুনাথ বাবা মন্দির নামেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
মন্দির দেখে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। তখনো অপসৃয়মান
রাঙা সূর্যরশ্মি সিন্ধুর জলে শেষ সিঁদুর গোলা খেলা শেষ করেনি।
চলবে.........................................................................................















0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.