রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
গাড়ী
থেকে নেমে কিছুক্ষন বিহ্বল হয়ে এই অবিস্মরনীয় রুপসুধা আকন্ঠ পান করে নিলাম।দুটি
ছেলে আমাদের মালপত্র নামিয়ে ঘরে রেখে আসবার জন্য এলো। অল্পবয়সী বাচ্চা ছেলে। খুব
মিষ্টি দেখতে। দেখলেই বোঝা যায় এ ছেলে মোটেই মালবাহক হয়ে জন্মায় নি। জানলাম ওদের
বাড়ী পেডং-এ। পেডং কলেজে ফাষ্ট ইয়ারে পড়ে। এখন কলেজ বন্ধ, কালীপূজোর পরে খুলবে, তাই এই সময়টা কিছু রোজগারের আশায়
চলে আসে এই হোমস্টে গুলোতে, গত
তিন বছর ধরে এমনই চালিয়ে যাচ্ছে।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
নদীর একেবারে কোল ঘেঁষে অনেক খানি খোলা জায়গার
ওপর দু-তলা কাঠের বাড়ী। নীচে ছ’টা
আর ওপরে ছ’টা ঘর।নীচের আর ওপরের কোনার ঘর
দুটো বেশ বড়ো। নদীর পাড়ে বেশ বড়ো আধুনিক রান্না ঘর ও খাবার ঘর। অনেকগুলি পোষা
রাজহাঁস রয়েছে এদের। সর্বক্ষন পায়ে পায়ে প্যাঁক প্যাঁক করে বেড়াচ্ছে। এক কথায়
প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলাম এই জায়গার। রান্না ঘরে সকলের জন্য চা বানাতে বলে
নেমে পড়লাম নদীর পাড়ে। আমাদের এক অধ্যাপক দাদা তো কাঁধে গামছা নিয়ে তৎক্ষণাৎ নেমে
পড়লেন নদীর জলে। বেশ ভালো স্রোত এদিকটায়। তবে জলে গা ডুবিয়ে বসে থাকতে মন্দ লাগবে
না। কয়েকটি ছেলেও দেখলাম স্নান করছে তখন। বেশ একটা অন্যরকম ভালোলাগার পরিবেশ।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
ডানদিকে দুই পাহাড়ের
মাঝের ফাঁক দিয়ে প্রায় ৬০ ডিগ্রি বেঁকে এগিয়ে গিয়েছে নদী, আবার বাঁ দিকে পাহাড় আর জঙ্গলের
বুক চিরে বেরিয়ে আসছে তার রজতশুভ্র ফেনিল জলরাশি। কোথাও বেশ গভীর আবার কোথাও
একবারে হাঁটুজল। স্বচ্ছতোয়া নির্মল ধারা। জলের তলার নুড়ি পাথর গুলোকেও পরিস্কার
দেখা যাচ্ছে ওপর থেকে। নুড়ি গুলো একে অন্যের গায়ে ধাক্কা মেরে গড়িয়ে যাচ্ছে এক
জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের একটা গানে আছে ‘জলতলে বাজে শিলা ঠুনুঠুনু
ঠুনুঠুনু’। পংক্তি গুলো যেন সম্পূর্ণ রুপ
নিয়ে বাঙ্ময় হয়ে উঠলো চোখের সামনে।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
আমরা নদীর যে পাড়ে রয়েছি সেটা সিকিম রাজ্য, নদীর ঠিক অন্য পাড়টিও একই রকম, পাহাড়তলীর ক্ষুদ্র গ্রাম একটি। ওই
পাড়ে একদিকে সবুজ লকলকে ধান আর একধারে ভুট্টার বিস্তীর্ণ ক্ষেত। ওই পাড়টা
পশ্চিমবঙ্গ। মাঝে রেশী নদী এই দুই রাজ্যের ভেতর সীমানা রচনা করেছে। তবে সত্যি
সত্যি কি কোন বেড়া দেওয়া যায় এভাবে। ওই যে ওই পাড়ে একপাল ছাগল নিয়ে যে বাচ্চা
ছেলেটি চরাতে চরাতে এই পাড়ের বন্ধুকে চিৎকার করে ডাকছে, এ পাড়ের বন্ধুটি হাসতে হাসতে
দিব্যি বুক সমান খরস্রোতা জল ঠেলে ওপাড়ের বন্ধুটির পিছু ধাওয়া করতে ছুটলো, আর দুটিতে ভুট্টার ক্ষেতের ভেতর
কপট মারামারির খেলায় মগ্ন হয়ে রইলো, ওরা
তাহলে কোন রাজ্যের লোক?
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
অনেকক্ষণ
নদীর পাড়ে কাটিয়ে খাবার ঘরে এলাম। ভাত, ডাল, ফুল কপির তরকারি, পালং শাক, ডিমের ঝোল, চাটনি, পাঁপড়। খেতে বসে বুঝলাম বেশ ভালো
খিদে পেয়েছে। একটি বাঙালি অল্প বয়সী ছেলে এখানকার কেয়ার টেকার। খাবার পর নিজের উদ্যোগে
আমাদের পান খাওয়ালো। এই হোমস্টেটির এমনই অবস্থান যে সর্বক্ষণ রেশী নদীর কল নির্ঘোষ
আমাদের সঙ্গী। অনেকটা নীচে আসার কারনেই হয়তো বেশ গরম এখানে। দুপুরের কড়া রোদ, ঘরে ফ্যান ছাড়া থাকা যাচ্ছে না।
শুনলাম সন্ধ্যার পর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ঘরে যথারীতি কম্বলও মজুত রয়েছে সেই কারনেই।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
খাবার পর আমরা কয়েকজন
নদীর পাড় ধরে হাঁটতে বেরোলাম। নদীর ধারে ধারে কাশের বন, কেবলই বড়ো বড়ো পাথর, ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে একটার থেকে আরেকটায়
লাফিয়ে লাফিয়ে চলা। অসাধারন পরিবেশ।হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর চলে গেছিলাম আমরা, হাঁটার জন্য তথাকথিত রাস্তা বলে
কিছুই নেই,
কখনো পাথরে পা রেখে
লাফিয়ে লাফিয়ে, কখনো
কাশ বনের ফাঁক দিয়ে পথ করে নিতে নিতে আবার কখনো বা নদীর ওপরের মাত্র দুটো বাঁশের
সাঁকো পেরিয়ে এদিক ওদিক টালমাটাল হতে হতে কতো দূর যে ঘুরে এলাম আমরা জানিনা, তবে সারাক্ষন বিমোহিত হয়ে রইলাম
রেশী খোলার সৌন্দর্যে। আমাদের আজকের আস্তানার পিছন দিকে পায়ে সামান্য জল ছুঁইয়ে
নদীর বাঁকের কোলে কোলে এগিয়ে আরো মুগ্ধ হলাম। সাদা বালীর চর, বেশ প্রশস্ত। ওই চর ধরে এগিয়ে
হঠাৎই দুটো পাহাড়ের সঙ্কীর্ণ পরিসরের মাঝে ঢুকে পড়েছে নদীটি।সামনে এগোনোর আর কোনোই
উপায় নেই। পায়ে পায়ে আবার ফিরে এলাম আস্তানায়।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
রেশীখোলায় একটি অনির্বচনীয় সন্ধ্যা
কাটালাম সেদিন। ধীরে ধীরে নদীর ওপরে দিনের আলো নিভে এলো। ওপারের ঘন বনানী, উঁচু উঁচু পাহাড়ের শ্যামল কোমল গা, হঠাৎ যেন ঘন আলকাতরা মাখিয়ে দিয়ে
গেলো কেউ। কেবল তখনো আমাদের ঘরগুলির মাথার ওপরের আকাশে চিলতে শেষ সন্ধ্যার আবছা আলো
মিটিমিটি করে জেগে রইলো কিছুক্ষন।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
বাইরের খোলা জায়গায় চেয়ার টেবিল পেতে সেই আসন্ন
সন্ধ্যায় রেশী নদীর বুকের শ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ শুনতে শুনতে আমরা আড্ডা দিতে
বসলাম। সরষের তেল, কাঁচা
লঙ্কা, পেঁয়াজ, ধনেপাতা আর চানাচুর দিয়ে মাখা এক
এক ঠোঙা করে মুড়ি, সঙ্গে
ফুলকপি আর পেঁয়াজের বড়া, তার
সাথে গরম গরম চায়ের পেয়ালা, বাঙালির
মন ভেজানো আড্ডার সমস্ত উপকরণই প্রস্তুত ছিলো সেদিন। উপরি পাওনা ছিলো গান, আবৃত্তি আর গল্প। আমার এক দাদা
তার ঝুলি থেকে বেশ মজার মজার ভুতের গল্প বের করেও উপহার দিলেন আমাদের সকলকে। দেখতে
দেখতে কখোন যেন ঘড়ির কাঁটা রাত ন’টা
পেরিয়ে গেছিল। হোমস্টের কেয়ার টেকার ছেলেটি আগেও দুবার তাড়া লাগিয়ে গেছে, তাই তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে খাবার
ঘরের দিকে রওনা হলাম সকলে।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
খাবার
পরেও নীচের বারান্দায় সোফায় বসে অনেকক্ষণ জমাট আড্ডা চললো আমাদের। আসলে দিন যত শেষ
হয়ে আসছে,
যখনি মনে হচ্ছে এবার
আবার ফিরতে হবে আপন কুক্ষিগত জীবন পিঞ্জরের ঘেরাটোপের ভেতর, সেখানে এই মাত্র কয়েকদিনের
পরিচয়ের নিগড়ে আষ্টেপিষ্টে এমন অত্যন্ত আপন হয়ে ওঠা মানুষগুলিকে ছেড়ে থাকতে হবে
হয়তো দীর্ঘদিন, তখনি
বিষাদক্লিন্ন এক নিদারুন নিস্তব্ধতা গ্রাস করে নিচ্ছে যেন বুকের ভেতরটা। তাই
যতক্ষণ পারি এই একসঙ্গে থাকার, কথা
বলার, হাসি, মজা, ঝগড়া
খুনসুটির সময়কালটা নিংড়ে নিংড়ে তার সমস্ত রসটুকু শরীরের আনাচে কানাচে রোমকুপের
শেষতম বিন্দুতেও যদি সঞ্চয় করে রাখতে পারি তাহলে ওই রসদটুকু দিয়েই সামনের বেশ
কিছুদিন চালিয়ে নিতে পারবো হয়তো।
যত রাত বাড়ছে ঠান্ডা ততই বাড়ছে।
প্রায় রাত ১১টা নাগাদ যে যার ঘরে শুতে গেলাম। কেবল জেগে রইলো চির প্রবাহিত রেশী
নদীর কলকল ধ্বনি। অনুক্ষন বুকের সমস্ত তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে সেই সঙ্গীত ঢেউয়ের পরে
ঢেউ তুলতে তুলতে কখন যে ঘুম পাড়িয়ে দিলো জানিনা। অতি ভোরবেলা পাশের ঘর থেকে এক বন্ধু
দরজা ধাক্কিয়ে ঘুম ভাঙাল,
প্রভাতী সূর্যের প্রথম কিরণ তখন সদ্য স্পর্শ করছে রেশী নদীর জল।
মুখ হাত ধুয়ে গরম জামা গায়ে চড়িয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা কয়েকজন।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
নদীর পাড় ধরে কিছুদূর
হাঁটার পর ডান দিকের পাহাড়টায় চড়বার ইচ্ছে হলো আমাদের। ভোরের শিশিরে ভিজে থাকা নরম
পাহাড়ী মাটি আমাদের এই অপটু ইচ্ছেকে বারবার পর্যুদস্ত করতে চাইলেও কেউ ছেড়ে দিতে
রাজী নয়।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
বেশ অনেকটা উঁচু পর্যন্ত হাত ধরাধরি করে উঠে শেষমেশ নেমে এলাম আমরা।
সকলের মুখে চোখে তখন যেন যুদ্ধ জয়ের প্রশান্তি। ঘড়িতে তখনি প্রায় আটটা বেজে গেছে।
চা খেয়ে স্নান সেরে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে গেলাম সবাই।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
জলখাবার পর্ব শেষ করে বেরোতে আজ
একটু বেলাই হলো আমাদের। আজ আমরা ফিরে চলেছি নিউ জলপাইগুড়ি, সেখান থেকে রাতের ট্রেনে কোলকাতা
ফিরবো আমরা। সকলেই একটু মনমরা সেই কারণে।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
রেশীখোলা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি প্রায় ১৪০
কিলোমিটার রাস্তা,
সময় ও লাগে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা, তার ওপর দুপুরের খাবারের জন্য আজ
রাস্তায় দাঁড়াতেও হবে কিছু সময়।
![]() |
| রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ১০ |
বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ পেডং পৌছলাম আমরা।
সেখানে টুকটাক কিছু কেনাকাটা করে,
চা খেয়ে আবার রওনা হলাম। এ পথের সৌন্দর্যও কিছু কম নয়, কিছুটা আধা শহুরে পাহাড়ী দৃশ্য। আর
একটু পর থেকেই তিস্তা আমাদের সঙ্গী হলো। রাস্তায় বেশ বড়ো একটি ধাবায় দুপুরের আহার
শেষ করতে করতেই বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো। করোনেশন ব্রীজের পাশ দিয়ে বাঁ হাতে
তিস্তাকে রেখে একটু একটু করে যতই শিলিগুড়ি শহরের কাছে পৌঁছোতে লাগলাম সকলেই মনমরা
বিষাদগ্রস্ত হয়ে চুপচাপ বসে রইলাম গাড়ীর ভেতর। অবশেষে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের পাশ
দিয়ে সোজা পেরিয়ে এসে নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশনের হাতার ভেতর গাড়ী এসে দাঁড়ালো।
ঘনায়মান সন্ধ্যায় ষ্টেশনের উজ্জ্বল বিজলী আলোয় ঝলমল করছে চারদিক। চত্বরের বড়ো বড়ো
গাছ গুলোয় দলবেঁধে ফিরে আসছে ঝাঁক ঝাঁক পাখীর দল। তাদের কলকাকলীতে মুখর সান্ধ্য
প্রকৃতি। ফিরতেই হয়,
ইচ্ছে না করলেও ফেরাটাই নিয়ম। মালপত্র নিয়ে ষ্টেশনের এস্কালেটর
পেরিয়ে আমরা ধীর পায়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে পা চালালাম।
সমাপ্ত।














0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.