ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৭
রাত্রিটা বেশ অস্বস্তিতে কাটলো। বারবার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কেমন একটা দমবন্ধ করা অস্বস্তি। অন্ধকারে বিছানায় উঠে বসে নাক ঝেড়ে, নাক দিয়ে শ্বাস টেনে আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে বের করেও চাপা কষ্টটা যেন যাচ্ছে না। ভোরের দিকে আবার কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানিনা।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
সকাল ৬টায় ঘুম ভাঙল। ঘরের জানালা দিয়ে তখন ঝলমলে সূর্যরশ্মি লেকের জলে গা ভিজিয়ে নিয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করেছে। সূর্যের আলো মেখে গোটা লেকটাই ঝকঝক করছে। একটি নিপাট মন ভালো করা সকালবেলা যেন এই মূহুর্তে সদ্য কলেজে পা দেওয়া মেয়ের মতো হাই-হেলো করতে করতে ঢুকে পড়েছে একেবারে আমাদের ঘরের ভেতর। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে গেলাম। মন খারাপ হলো এই ভেবে যে সুমোরিরি লেকের ওপর প্রত্যুষের সূর্যোদয় আর দেখা হলো না।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
রাতের অস্বস্তিটা এখন আর নেই। সুমোরিরিতে নাকি এরকম হয়। অক্সিজেন এখানে বেশ কম। গাছপালা একেবারেই নেই। এখানে যারা থাকেন তারা এতেই অভ্যস্ত, শুনলাম আমার মতো অস্বস্তি দলের প্রায় সকলেরই হয়েছে অল্পবিস্তর। খাবার ঘর একতলায়। ব্রেড-বাটার, অমলেট, পুরি-সব্জি আর চা খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। বেড়িয়েই সোজা লেকের পাড়ে।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
আমাদের নামিয়ে দিয়ে নাজির ভাই ওর এক দেশোয়ালী ভাইয়ের গাড়ী সারাতে গেলো। আমরাও মনের আনন্দে ছবি শিকারে মেতে উঠলাম। প্রায় ১৪৮৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদ একটি বৃহৎ বদ্ধ জলাশয়। মূলতঃ আশেপাশের পাহাড় গুলির বরফ গলা জলে পূর্ণ হয়ে পরিপুষ্ট হয় এই হ্রদ। দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৬ কিমি ও প্রস্থে মোটামুটি ৩-৪ কিমি এই হ্রদ আমাদের দেশের উচ্চতম অংশে অবস্থিত হ্রদ গুলির অন্যতম। হ্রদের জল মিষ্টি নয়। ক্ষারীয়। সকালের মিঠে রোদ পড়ে চকচক করছে হ্রদের জল। ঘিরে থাকা পাহাড় গুলোর মাথায় বরফের রুপোলী মুকুট। জলের ঢেউয়ে তার ভাঙা ভাঙা প্রতিচ্ছবি। এখানেও অনেক পাখী, পানকৌড়ি জলে খেলা করছে। মনোরম পরিবেশ।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
নাজির ভাই গাড়ীর হর্ন বাজিয়ে হাজির। আজ আমরা এখান থেকে সোকার লেক দেখে তাং লাং লা পাস হয়ে লেহ ফিরবো। আজই আমাদের লেহ শহরের শেষ রজনী। কাল লাদাখ ছাড়িয়ে কারগিল রওয়ানা হব আমরা। গাড়ী এগিয়ে চললো সোকার লেকের দিকে। অসম্ভব এবড়ো খেবড়ো রাস্তা। বস্তুতঃ একে কোন রাস্তা বলাটাই উচিৎ হবেনা। ধু ধু রুক্ষ প্রান্তর, কখনো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কখনো খানা খন্দ ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে চলেছি। কিছুদুর গিয়ে নাজির ভাই দেখালো যাযাবরদের গ্রাম। এই যাযাবরেরা সোকার লেকের জন্য এখানে থাকে। এখান থেকে নুন নিয়ে তিব্বতে যায়। এই অঞ্চলের বিরাট নোমাডিক সেটেলমেন্টের কথা মনে হল আমি আগেও পড়েছি। মাঠে মাঝে মাঝেই ঘোড়া চরছে দেখা গেলো। ইয়াকও রয়েছে অনেক। ঘোড়া গুলো যাযাবরেদের পালিত। তবে ঘোড়ার মতো আরো একটি জন্তু এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে চরে বেড়াতে দেখেছি। এগুলো পাটকিলে রঙের বুনো গাধা। সাধারণ গাধার চেয়ে উচ্চতায় বেশ কিছুটা বেশী। দলবেঁধে এক সাথে ঘুরে বেড়ায় এরা। বড়ো সুন্দর লেগেছে আমার এই প্রাণীটিকে।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
ধীরে ধীরে সোকার লেকের কাছে পৌঁছে গেলাম আমরা। বেশ কিছু আগে থেকেই দেখছিলাম পাথর দিয়ে ঘিরে সল্ট বেড তৈরি করেছে স্থানীয় লোকেরা।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
এরকম সল্ট বেড বা নোনা জল ধরে রেখে সূর্যের রোদের উত্তাপে তা’ বাষ্পী ভূত করে নুন তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি ওড়িশার চিল্কা হ্রদের তীরবর্ত্তি গ্রাম গুলিতে আমি আগেও দেখেছি। কাছে গিয়ে দেখলাম এই প্রায় ৮ কিমি দীর্ঘ লবন হ্রদের দুই ধার এবং মধ্যের বেশ কিছু অংশ অন্তত ৪-৫ ফুট পুরু লবনের আস্তরনের সৃষ্টি করেছে।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
দূর থেকে দেখলে মনে হবে শ্বেত বর্ণ কোন দ্বীপ যেন। লাদাখের বৃহত্তর অংশের নুনের যোগান সম্ভবত এই হ্রদ থেকেই যায়। সোকার হ্রদ দেখে আবার যাত্রা শুরু হলো আমাদের।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
বেশ কিছুদূর এগিয়ে এই ভাঙাচোরা রাস্তা এসে মিশেছে মানালী-লেহ জাতীয় সড়কের সঙ্গে। ঠিক এই দুই রাস্তার সংযোগ স্থলে একটি বড়ো তাঁবুর নীচে খাবারের দোকান পাওয়া গেলো। আজ এখানেই আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতি। পাশের গ্রামেই হোটেল মালিকের বাড়ী। ভেতরটা বেশ পরিপাটি করে সাজিয়েছেন। খাবার বলতে হয় ভাত-ডাল-সব্জী নয় ম্যাগী। আমরা ম্যাগীর পক্ষেই রায় দিলাম। পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর ডিম দিয়ে আমাদের জন্য যত্ন সহকারে ম্যাগী বানালেন তিনি। ওনার ছেলে আর ছেলের বৌ কে দেখে আমি আবদার করলাম লাদাখী মাখন চা খাবার। লাল চা বেশ কড়া করে বানিয়ে হাঁড়িতে চাপা দিয়ে রেখে দেওয়া থাকে কয়েকদিন ধরে। এবার সামান্য গরম জলে দলা করে মাখন এবং কিছু ঘরে বানানো মশলা দিয়ে খুব করে মেশানো হয়। হাতায় করে ওই রেখে দেওয়া লাল চা এই মিশ্রনের সাথে মিশিয়ে এক অদ্ভুত মায়াময় গোলাপী রঙের পানীয় প্রস্তুত করে গরম গরম পরিবেশন করা হলো আমাদের। মাখনের গন্ধর সাথে এক সুমিষ্ট সুবাস জড়ানো এই চায়ে।
তৃপ্তির ভোজন পর্ব সমাপ্ত করে বেড়িয়ে এলাম তাঁবু দোকানের বাইরে। এক শ্বেতাঙ্গ বিদেশী বাইরে রাস্তার ধারে একটা চেয়ারে কেমন উদাসীন মুখে গালে হাত দিয়ে বসেছিল।মানালী থেকে রোটাং পাস পেরিয়ে দীর্ঘ রাস্তা এই ছেলেটি সাইকেলে পাড়ি দিয়ে আসছে। রাশিয়ার মস্কো শহর থেকে সুদূর ভারতবর্ষের লাদাখ দেখতে এসেছে ছেলেটি। বাড়ীতে তার বৌ আর শিশুপুত্র তার পথ চেয়ে আছে। এদেশে এসে পর্যন্ত তাদের কোন খবর দিতে পারেনি সে। আমার ভাগ্নেকে তাই তার একান্ত অনুরোধ জানাল যদি লেহ তে পৌঁছে তার বৌ এর ই-মেলে একটা মেল করে দিতে পারে। বড়ো করুণ ছিল তার এই অনুরোধ। যথাসময়ে এই খবর তার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেওয়াও হয়েছিল। আশাকরি ছেলেটি ভালো আছে।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
গাড়ী এগিয়ে চললো। দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম তাং লাং লা পাস। এই রাস্তা দিয়ে মানালী থেকে আমরা লেহ আসার সময় প্রথম বার দেখেছিলাম এই গিরিপথ।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
তথাকথিত দ্বিতীয় উচ্চতম মোটর গাড়ী চলাচলের রাস্তা বলে এর খ্যাতি আছে। ইতস্তত বরফ ছড়িয়ে আছে এদিকে সেদিকে।তুষার পাত চলছে। ছবি তোলবার জন্য দাঁড়ালাম আমরা।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
এখানে রাস্তা খুব ভালো। হু হু করে গাড়ী ছুটছে। দেখতে দেখতে আমরা ঢুকে পড়লাম লেহ শহরের সীমানায়। বাঁ পাশে ত্রিশুল উত্থিত পাহাড়কে রেখে এসে পড়লাম লেহ মার্কেটের সামনে।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
মন টা আজ ভারি হয়ে আছে। কাল সকালে লাদাখ উপত্যকা ছেড়ে কারগিল যাব আমরা। ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। এই অনাবিল প্রকৃতি যেন দু হাত বাড়িয়ে তার পরম উষ্ণ কোল পেতে আঁকড়ে রাখতে চাইছেন আমায়। হে মহামহিম হিমালয়, আমায় পূর্ণ করো, শুদ্ধ করো, তোমার অন্তরে স্থান দাও দেব।
![]() |
| ঘুরে এলাম লামাদের দেশে |
দেখতে দেখতে ঢুকে পড়লাম হোটেলের গাড়ী বারান্দায়। মুহরমের উৎসব শুরু হয়ে গেছে গতকাল থেকে। নাজির ভাই তাই আজই বিদায় নেবে। ওর বাড়ীতে এবং গ্রামে উৎসব পালন করতে হবে ওকে। ছোট ছেলে মেয়ে গুলো ওর ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে। আগামী কাল থেকে অন্য সারথী থাকবে আমার সাথে। নাজির ভাইয়েরও চোখ ছলছল করে উঠলো। আমাদের ছেড়ে ওরও ভালো লাগবেনা তা আমিও জানি। অনেকক্ষন দুজনে দুজনকে জড়িয়ে রইলাম। এমন পরম মিত্র খুব কম ভাগ্যবানের লাভ হয়। আবার দেখা হবার সঙ্কল্প করে দুজনে দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। স্তোক কাংরির ধবল মুকুটে তখন শেষ বিকেলের রক্তিম আলপনা। মন খারাপ হয়ে গেলো। চা দিয়ে গেলো হোটেলের ছেলেটি। জুম ভাই এলেন আর একটি ছেলেকে সাথে নিয়ে। এই ছেলেটি কাল আমাদের নিয়ে যাবে কারগিল। কাল সকাল সকাল বেরোবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওকে বিদায় দিলাম।
চলবে............................................................................................................














0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.