রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৯ (Silk Route Tour-09)

রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৯ (Silk Route Tour-09)


silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 


বাড়ীর কাছাকাছি আসতেই টের পেলাম ঘন কুয়াশার মতো চাপচাপ নরম মেঘেদের দল আমার সর্বাঙ্গে কোমল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। জল ভরা ঘন মেঘ। মাথার হনুমান টুপি বেশ ভিজে গেলো, মুখে ভুরুতে শিশিরের মতো তার স্পর্শ লেগে আছে। 

রাস্তা থেকে দুই ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছোট্ট একটু উঠোনের মতন, তার পাশে লম্বাটে অনেক গুলো ঘর। দিদিমনির দোকানদারি চলে এই ঘর গুলোতে। একটায় ছোট মুদির দোকান, চাল, ডাল, তেল নুন, আলু পেঁয়াজ, মায় বোতল বন্দী পানীয় জল সমেত দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ পশরা, আরেকটায় একটা ছোট চা, বিস্কুট, অমলেটের দোকান, তার পাশের ঘরটা এ তল্লাটের একমাত্র মদের দোকান। চায়ের দোকান চালায় দিদিমনির বোনের মেয়ে আর জামাই, মুদির দোকান আর মদের দোকান দুটোই একা হাতে সামলাতে হয় দিদিকেই। 

এই প্রায় শেষ বেলায় আসন্ন সন্ধ্যার আবছায়ায় দেখলাম মুদীর দোকানের ভেতরে একটা চেয়ারে মাথা এলিয়ে বসে আছেন দিদিমনি আর তার মাথায় একটা ছেঁড়া প্যাকিং বাক্সের পিচবোর্ড দিয়ে হাওয়া করছে ওনার দিদির মেয়ে। আমার উইঞ্চিটারের জল ঝাড়তে ঝাড়তে দোকানে ঢুকে পড়ে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে দিদির, জানলাম কি এক এদেশীয় পূজো করবেন বলে সকাল থেকে নিরম্বু উপবাস করে ছিলেন, দুপুরে পূজো করে কেবল প্রসাদ হিসেবে জল আর নকুল দানা জাতীয় কিছু খেয়েছেন, নিয়ম মতো আজ রাত্রে একেবারে আহার করবেন। ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগলো না আমার। তাড়াতাড়ি ঘরে এসে আমার ওষুধের ঝোলা থেকে ও আর এসের প্যাকেট বের করে একটা কাচের গ্লাসে গুলে নিয়ে এসে বললাম এটা শরবত, আপনি খান, ভালো লাগবে। করুণ চোখে, মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে আমার কথায় এক গ্লাস লেবুর স্বাদের ও আর এস খেলেন মহিলা। মেয়েটিকে বলে এলাম রাত পর্যন্ত আরো অন্তত তিন গ্লাস এই শরবত খাওয়াও। 

রাতের খাবার টেবিলে দেখি হাসি মুখে দাপটের সঙ্গে যাত্রীদের খাওয়াদাওয়া তদারক করছেন দিদি। বললাম আপনি উঠে এসেছেন কেনো? মাথা ঘোরা কমেছে? আমার হাত ধরে বললেন, কোন্ মন্ত্রপূত দেবতার জল খাওয়ালে জানিনা, তবে আমি তিন গ্লাস জল খেয়েই বেশ চাঙ্গা হয়ে গেছি। বললাম, আপনি আপনার ঠাকুরের পুজো করার পরেও অতক্ষন না খেয়ে ছিলেন বলে আপনার দেবতা রাগ করেছিলেন, তাই আমার হাত দিয়ে ওই শরবত পাঠালেন, এবার থেকে ওই সব উপোস টুপোস গুলো মেয়েদের হাতে ছেড়ে দিন, নইলে আপনার ঠাকুর আবার রেগে যাবেন।



silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 


খাওয়ার পর অনেকক্ষণ সকলে মিলে আড্ডা দেওয়া হলো। আমাদের ছুটি ফুরিয়ে আসছে, কাল পেরিয়ে তার পরদিনই আমাদের ফিরতে হবে। সকলেরই মন তাই ভারী হয়ে আছে। এই আদিগন্ত ঢেউ খেলানো পাহাড়ের কোল, এই সুবিমল নিষ্কলুষ প্রকৃতি, এই সরল নিষ্পাপ মানুষগুলো, এদের ছেড়ে যেতে কিছুতেই মন চাইছে না। তবু যেতে হয়, মাত্র কয়েক দিনের এই ভালো লাগাটুকু কে পাথেয় করে আগামী কিছু দিনের জন্য প্রাণবায়ু কে সঞ্জীবনী সুধায় ভরিয়ে নিয়ে ফিরে যেতেই হবে। এই সব ভাবতে ভাবতে কখোন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। 

ঘুম ভাঙল ভোরবেলা। কুয়াশা মাখা সদ্য ভোর, খাটের পাশের জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি দিদিমনির বাতাবী লেবুর গাছে একটা ছোট্ট ময়ুর কন্ঠী রঙা লাল ঠোঁটের পাখী শিস দিয়ে দিয়ে দোল খাচ্ছে। ক্যামেরা বের করবার আগেই পিড়িং পিড়িং করে নেচে নেচে এক গাছ থেকে আরেক গাছে, দূর থেকে আরো দূরে চলে গেলো সে, অথচ অকারনে কি মধুর একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে দিয়ে ভোরবেলা টুকুকে আরো মিষ্টি করে দিয়ে কোথায় যে চলে গেলো দেখতেই পেলাম না। জীবনের ঠিক ঠিক ভালোলাগা গুলো হয়তো এই রকমই ক্ষণিকের হয়। তাড়াতাড়ি ব্রাশ, পেষ্ট আর সাবান নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম।


জলখাবার পর্ব মিটিয়ে বেরোতে বেরোতে আজ নটা বেজে গেলো। বেরোবার মুখে দিদিমনি আর তার বোনঝি আমাদের সকলের গলায় ক্রীম রঙা সিল্কের ভুটিয়া বস্ত্রখন্ড পরিয়ে কপালে টিকা চিহ্ন এঁকে দিয়ে সকলের মঙ্গল কামনা করে বিদায় জানালেন। এই পরিবারটির আন্তরিকতা আমাদের ভীষন ভাবে স্পর্শ করেছে। আমরাও দিদিমনির আর ওনার পরিবারের মঙ্গল কামনা করে বিদায় নিলাম।



silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 


আজ আমরা চলেছি রেশীখোলা, যদিও বঙ্গীয় অতি সরলীকরনের ফলে মুখে মুখে এই জায়গার নাম, বিশেষ করে বাঙালী পর্যটকদের উচ্চারণে হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋষিখোলা। খোলা শব্দের অর্থ নদী, অর্থাৎ রেশী নদীর ধারে অবস্থিত একটি গ্রাম। রোলেপ থেকে রেশীখোলা প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে। 



silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 


রংলি থেকে বাঁ দিকে সোজা ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে চড়াই পথ। কিছু পরেই লোকালয় প্রায় কমে এলো। রাস্তার অবস্থাও ভালো নয়। আরো বেশ কিছু দূর পরে কেবল পাহাড়ী মেঠো পথ আর জঙ্গল। আচমকাই মনে হলো চড়াই শেষ, আমরা নীচে নেমে চলেছি। সে কি আর যেমন তেমন নামা! বাঁকের পর বাঁক কেবল নেমেই চলেছি। একেবারে গড়গড় করে নামছি।


silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 



এই অধঃপতন ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা। দুই পাশে কেবল ঘন জঙ্গল, ঝিঁঝিঁ পোকা আর কোথাও কোথাও ঘন্টা পোকার তুমুল কল কীর্তনের মাঝখান দিয়ে সেই না থাকা রাস্তার ওপর দিয়ে কিভাবে যে প্রায় ৪৫ ডিগ্রী ঝুঁকে পরে সরসরিয়ে আমাদের এই এতো গুলি প্রানী কে আমাদের সারথী অসীম দক্ষতায় নামিয়ে নিয়ে এলেন তাভাবতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে। 



silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 



নামতে নামতেই কানে পৌঁছচ্ছিল একটানা নদীর কলতান। ঘন গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে এক লহমার জন্য তিনি অতি সামান্য দর্শন দিয়েই আবার লুকিয়ে পড়ছিলেন।


silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 



এবার সেই ভীষন উৎরাই সোজা এসে শেষ হলো একেবারে নদীর পাড়ে। সে এক অতি অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য।


silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 



চতুর্দিকে যে ভাবেই মাথা ঘোরাই না কেনো কেবল ঘন সবুজ পাহাড় আমায় ঘিরে রয়েছে। 



silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 



ঠিক সামনে দিয়ে কলস্বরে বয়ে চলেছেন স্রোতস্বিনী রেশী নদী, কি তার গর্জন, ছোট বড়ো অসংখ্য নুড়ি পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে মহা নিনাদে বাজনা বাজিয়ে পাহাড়ের গায়ে ঢেউ তুলে এগিয়ে চলেছেন সেই শীতল ধারা।



silk-route-tour-09, রেশম পথের কোলে কোলে
রেশম পথের কোলে কোলে 



চলবে..............................................................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ