ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৬

ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৬




অতি ভোরে ঘুম ভাঙল। তখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। বাথরুম পর্ব তাড়াতাড়ি মিটিয়ে তাঁবুর বাইরে এলাম। অপার নির্মল প্রকৃতি। 





এই মুহূর্তে অন্তত মনেই হচ্ছেনা যে এই পৃথিবীতে কখনো কোন হিংসা লোভ খুন ধর্ষনের মতো নোংরা কাজ ঘটতে পারে। এই পবিত্র অপাপবিদ্ধ মূহু্র্তটা অন্তত সত্যি হোক এই প্রার্থনা করি।





লেকের জলে নীল আকাশের ছায়া।এক অপার্থিব আলোতে ছেয়ে আছে যেন চরাচর। চমক ভাঙল যে ছেলেটি কাল থেকে আমাদের দেখাশোনা করছে এখানে তার ডাকে। চা প্রস্তুত। ভোরের প্রথম চা বিস্কুট সহযোগে উষ্ণ পেয়ালার ওম দুই হাতে নিতে নিতে কাঁচের জানালার বাইরে লেকের উল্টোদিকের পাহাড়ের মাথায় সূর্য দেবের উদিত হবার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। 





দলের সকলেই একে একে এসে জড়ো হয়ে পড়েছেন খাবার ঘরে। বাইরে দস্তানা খুলে ছবি তুলতে হচ্ছে। সেটা বেশ কষ্টের। অনেকেই দেখলাম এই খাবার ঘর থেকেই ছবি নিচ্ছেন। 





আমি দস্তানা পকেটে পুরে বাইরেই বেড়িয়ে এলাম। দূর থেকে নাজির ভাই হাত নাড়লো। কাছে এসে  বললো আজ একদম লেট কোরনা। অনেক রাস্তা যেতে হবে। ততক্ষণে অরুণ রাগে রঞ্জিত হয়ে সূর্য দেব প্রকাশিত হয়েছেন। পাহাড়ের রঙ লেকের জলে প্রতিফলিত হয়ে এক অতুলনীয় সুষমা মন্ডিত পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। লেকের ধার থেকে সরে আসতে মন  চাইছিল না, তবু খাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।





অন্যান্যরাও তৈরি। বুফে ব্রেকফাস্ট। দুধ-কর্নফ্লেক্স, চিঁড়ের পোলাও, আলুর পরোটা, ব্রেড-অমলেট সবই প্রস্তুত।পেট ভরে জলখাবার খেয়ে সোয়া আটটা নাগাদ বেড়িয়ে পড়লাম আমরা।





সেই ছেলেটি গাড়ীতে মাল তুলে দিচ্ছিল। রোগা কালো ভারি করুণ মুখখানা। নাম বললো অরবিন্দ। অবাক হলাম যখন বললো ওর বাড়ী পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং -এর কাছে   মিরিকে। কি আশ্চর্য! কোথায় দার্জিলিং আর কোথায় লাদাখের প্যাংগং! এইটুকু ছেলে বাবা মা ভাই বোন সবাইকে ছেড়ে এতো দূরে কেবল পেটের দায়ে পড়ে আছে।  মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ওর হাতে কিছু টাকা দিয়ে আদর করে দিয়ে এলাম। এর বেশী  কিছু করার তো আমার সাধ্যও নেই।





আজ আমরা যাচ্ছি সুমোরিরি লেক দেখতে।  মাঠের মধ্যে পায়ে চলা পথের যেমন একটা হাল্কা রেখা থাকে বহু  ব্যবহারের ফলস্বরুপ, ঠিক ওই  রকম রাস্তা। সত্যি বলতে কি পথ বলে কিছু নেই। বাঁ পাশে প্যাংগং লেক কে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। কিছুদুর এগিয়ে পেলাম ছোট্ট গ্রাম মেহরাক। পাথর আর কাঁটা ঝোপে ঘেরা গ্রাম। অতি অল্প লোকের বাস।





মেহরাক ছাড়িয়ে একটু এগোতেই মান। বেশ বড়ো গ্রাম। মানে লেকের ধারে অনেক সুন্দর সুন্দর গোল গোল তাঁবু রয়েছে দেখলাম। জায়গাটাও খুব সুন্দর। 





এই প্রত্যন্ত গ্রামে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে প্রাথমিক রসদটুকুর প্রয়োজন সেটা জোগাড় যে কি ভাবে হয় তা ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়। 





মান ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে লেকের ধারে থামলাম আমরা। জায়গাটা খুব চেনা চেনা। নিশ্চয়ই কোন সিনেমার দৃশ্যে দেখেছি এই জায়গাটা।





অনেক ছবি তোলা হল। নাজির ভাই নিজে নিজেই অনেক নিজস্বী উঠিয়ে ভীষণ খুশি। আবার যাত্রা শুরু।





প্যাংগং থেকে বেড়িয়ে এই না থাকা রাস্তার পাশে পাশে প্রায় অনেক দূর পর্যন্ত আমাদের সাথে সাথেই রইলেন প্যাংগং লেক তার অসামান্য সুন্দর রূপরাশি নিয়ে।





১৩৪ কিমি দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট এই লবন জলের হ্রদের প্রায় ৮০ কিমি পড়েছে চীন দেশের ভেতরে। শীত কালে পুরো লেকটাই জমে বরফ হয়ে থাকে। 





কোন মাছ নেই এই এতো বড়ো লেকটায়, কিন্তু প্রচুর পাখী এবং হাঁস এখানে দেখতে পাওয়া যায়। নাজির ভাই আমায় পাখী চেনাতে চেনাতে গাড়ী চালাচ্ছিল। লেকের পাড়ে দেখালো পেঙ্গুইন বার্ড। একটা কালো গলা লম্বা সারসের মতো পাখী দেখলাম। নাজির ভাই বলল এর নাম চা টুং টুং। এমন অদ্ভুত বাজনার মতো নাম শুনে অবাক হয়ে গেলাম। 





গাড়ী এগিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে কেবল একটা দুটো ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাক ছাড়া আর কোন গাড়ী এই রাস্তায় দেখিনি। বেশ কিছুটা এগোনোর পর শুসুল গ্রামে একটা ছোটো খাবার জায়গা পাওয়া গেলো।





নাজির ভাই আমার কানে কানে শিখিয়ে দিলো গিয়ে বলো ঙা তোক্ সা রাক্। এমন অদ্ভুত কথার মানে কি? দোকানি আমার অদ্ভুত উচ্চারণে তার   মাতৃভাষা শুনে হেসেই অস্থির। এর অর্থ আমার খুব খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি আমাদের জন্য গরম গরম ম্যাগী আর চা বানিয়ে আনলো। এই দোকানের পাশেই একটি গরম জলের কুন্ড আছে। গ্রামের লোকেরা গরম জলে জামাকাপড় কাচার জন্য ভীড় করে আছে এই কুন্ডের চারপাশে।





আরো কিছুদুর এগিয়ে রাস্তার ওপর পড়লো  ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের স্মরণে সেনাবাহিনীর তৈরি করা স্মারকস্থল রেজাং লা মেমোরিয়ল। কুমায়ুন রেজিমেন্টের বীর সৈনিকেরা আপন মাতৃভূমি রক্ষা করার মহান তাগিদে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন এখানে। এদের উদ্যেশ্যে কুর্ণিশ জানিয়ে আবার এগোলাম আমরা।





অল্প কিছু দূর পরেই সেনা বাহিনীর চেক পোষ্ট। বাঁশ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রাখা আছে। পুরো দস্তুর সৈনিকের সাজে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক জওয়ান  গুমটি থেকে বেরিয়ে এসে নাজির ভাইয়ের কাছে কাগজ দেখতে চাইলেন। কাগজে আমাদের সকলের নাম লেখা আছে। ছেলেটি কাগজ হাতে নিয়ে মুখ বাড়িয়ে গাড়ীর ভেতর আমায় পরিস্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করলো কোলকাতার কোথায় থাকেন? আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি বাঙালি? আমার বাড়ী ব্যারাকপুর শুনে কি আনন্দ ছেলেটির। ওর নাম রাজু দাস। কৃষ্ণনগরে বাড়ী। ITBP তে চাকরি নিয়ে আজ অনেক দিন চীন সীমান্তের এই দুর্গম জায়গায় দেশ মাতৃকার সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। গাড়ী থেকে নেমে বুকে জড়িয়ে ধরলাম এই শ্যামলা বরণ রোগা সোগা আমার ঘরের  ছেলেটিকে। আমাদের জন্য দৌড়ে গুমটির ভেতরে গিয়ে একটা বড়ো ফলের রসের প্যাকেট নিয়ে এলো। বললো গাড়ীতে যেতে যেতে এটা খাবেন আর আমার কথা মনে করবেন। চোখের কোনটা যেন চিকচিক করে উঠলো আমার। না নিয়ে পারলাম না। গর্বে বুক ভরে উঠল আমার এই বঙ্গ সন্তানের জন্য।যেখানেই থাকি তোমার জন্য সবসময় প্রার্থনা করবো, তুমি, তোমরা ভাল থাকো।





আবার এগোলাম আমরা। ধু ধু  ন্যাড়া প্রান্তরের মধ্যে চরে বেড়াচ্ছে ইয়াকের পাল। গাড়ীর শব্দে ছুটোছুটি করছে তারা। কিছু পরেই এলো নোমা গ্রাম। ছোট গ্রাম। অল্প লোকের বসবাস। নোমা পেরিয়ে লোমা। লোমাতে আবার সেনাবাহিনীর চেকপোষ্ট। এই চেকপোষ্টে পাহারা দিচ্ছে ইন্ডো টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিসের মহিলা সৈনিকেরা। সাক্ষাত দুর্গা রূপিণী এই অসম সাহসী বীরাঙ্গনাদের দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এলো।এই লোমা থেকেই ব্রীজ পেরিয়ে বাঁ  দিকে এগোলে Indian Institute of Astrophysics এর কেন্দ্র আছে হাঁলে বা হানলে বলে একটি জায়গায়। আমাদের সময় নেই এই যাত্রায় হাঁলে যাবার, তাই আমরা এগোলাম সুমোরিরির দিকে। 

প্রায় সন্ধ্যের মুখে গিয়ে পৌঁছলাম সুমোরিরি। এই অঞ্চলে গাছপালা  একেবারে নেই বললেই চলে। বিশাল হ্রদ। তার পাড়ে অতি সামান্য জনপদ। তাঁবুও আছে। তবে আমরা একটি হোটেলেই আজ রাত্রিটা কাটাবো। 





গ্রামে বেশ কয়েকটা দোকান, বেশ জমজমাট গ্রাম।একটি দোকানের মুখে তে-মাথার মোড়ে দেখলাম একটা সাইন বোর্ড। গ্রামের কোন একটি যুব সংগঠনের নাম দিয়ে লেখা একটি বিজ্ঞপ্তি এটি। বলা হয়েছে গ্রামে কোন রকম মদ বা মাদক দ্রব্য প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারো কাছে বা কোন পরিবারে মদ পাওয়া গেলে উপযুক্ত পরিমানে শাস্তি ভোগ করতে হবে। দেখে ভালো লাগলো এই উদ্যোগ। ভাত, রুটি, সব্জী আর ডাল খেয়ে লেপের উষ্ণ আলিঙ্গনে আশ্রয় নিলাম।

চলবে..............................................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ