রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৮

রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ৮ 


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour


যাচ্ছি ঝরনা দেখতে। রোলেপের বিখ্যাত ঝরনা বুদ্ধ ফল্স। বাঁ দিক ঘেঁষে একটা বিরাট বট গাছের নীচে গাড়ী দাঁড়ালো। ওপর থেকে গর্জন শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু খাদের দিকে বেশ ঘন গাছপালা থাকার জন্য দেখতে পাচ্ছি না। ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা জায়গা দেখিয়ে আমাদের ড্রাইভার দাওয়া ভাই বললো নীচে নেমে যেতে। বললেই তো আর নামা যায় না। শ্যাওলা ধরা কতো গুলো বড়ো বড়ো পাথর যেন শুন্য থেকে সড়সড়িয়ে নীচে নেমে গেছে হঠাৎ। বাঁ দিকে তবুও স্যাঁতস্যাঁতে খাদের দেওয়ালের সামান্য অবলম্বন পাওয়া যেতে পারে কিন্তু ডান দিকে ধরার মতো কোন কিছুই নেই।



silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour



দাওয়া ভাই ওপর থেকে বারবার সাহস দিয়ে চলেছে নামার জন্য। দলের বাকি সবাই ওপর থেকে আমার অবতরণের প্রয়াসের দিকে সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে রয়েছে, ভাবখানা এমন যে এই সামান্য কাজটা একবার যদি আমি সাহস করে করে দেখাতে পারি তাহলে তৎক্ষণাৎ বাকিরা সবাই অবলীলায় গড়গড়িয়ে নেমে পড়তে পারেন। পাথরের দ্বিতীয় ধাপে দাঁড়িয়ে দুবার জুতো ঠকঠকিয়ে দেখে নিলাম যে এই জুতো এমন শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিলতা কতো দূর সহ্য করতে পারবে। সাহস হলোনা। ডান হাতে একটা বাঁশ গাছের সরু লম্বা ঘুন ধরা কঞ্চির মতো ডাল পেলাম। যা হয় হবে ভেবে যখন নামার জন্য পা বাড়িয়েছি তখনই দেখি দাওয়া ভাই কখন যেন আমায় টপকে সরসরিয়ে আমার পরের ধাপে এসে হাজির হয়েছে। নির্ভীক এই পাহাড়ী ছেলে গুলো আমাদের অনভ্যস্ত শহুরে অপারগতাকে এতো নির্ভুল ভাবে পড়ে ফেলতে পারে যে ঠিক সময়ে পরিত্রাতার ভূমিকায় স্বয়ং ঝাপিয়ে পড়ে হাত বাড়িয়ে নামিয়ে নিলো আমায়। একে একে কয়েকজন বাদে দলের প্রায় অনেকেই নীচে নেমে এলো। 



silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour



প্রায় ৭২ ফুট উঁচু থেকে সঘোষে আছড়ে পড়ছে এই জলধারা। যেখানে এসে পড়ছে সেই জায়গাটায় একটি কুন্ডের মতো সৃষ্টি হয়েছে। জলের তীব্র পতনের ফলে উদ্ভুত বিন্দু বিন্দু জলকণার বাষ্পে ভরে রয়েছে চারদিক। মুখে চোখে গায়ে মাথায় সেই গুঁড়ি গুঁড়ি জল স্পর্শে এক অজানিত অনাবিল মধুর প্রসন্নতায় যেন মন ভরে গেলো। 



silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour



আশেপাশে প্রচুর বড়ো বড়ো পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এক পাথর থেকে আরেক পাথরে ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে অনেক ছবি ওঠানো হলো। বেশ খানিকক্ষন এই অপূর্ব অনিন্দ্য প্রকৃতির কোলের ভেতর কাটিয়ে আবার ওপরে ফিরে এলাম। এবারেও আমাদের সকলের উঠে আসার জন্য ত্রাতার ভূমিকায় সেই দাওয়া ভাইকে পাওয়া গেলো।

ঝরনা দেখা শেষ করে এবার চললাম নদী দেখতে। নদীর পাড় থেকে একটু উচুতে গাড়ী রেখে এগোলাম আমরা। বাঁ দিকে একটা অনেক কালের পুরোনো ব্রীজ। আমরা ব্রীজের ধার দিয়ে অসংখ্য ছোট বড়ো নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে এলাম।



silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour



তীব্র খরস্রোতা এই নদীর নাম রোলেপ। বস্তুতঃ নদীর নামেই এই জায়গার নাম। রাস্তা থেকে বেশ নীচুতে নদীটি। চারিদিকে ঘিরে রয়েছে সুউচ্চ সবুজ পাহাড়ের সারি। ঘন সবুজ গাছে ছাওয়া এক নির্মল স্নিগ্ধ পরিবেশ। নদীর তীরের যে কোন বড়ো বড়ো পাথরের ওপর বসে একলা নির্জনে কেবল নদীর কুলু কুলু ধ্বনি আর বিরহী কোন ঘর হারানো পাখীর ডাক শুনে বেহুঁশ হয়ে থাকা যায়। 



silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour



নদীর ধারের পাথর গুলিতে সাবধানে পা রাখতে হয়, কয়েকটি বেশ পেছল। কয়েকজন উৎসাহী বন্ধু ক্যামেরা নিয়ে পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে নদীর মাঝখানে গিয়েও ছবি ওঠালেন যদিও, তবে তাদের ভেতর একজন ওই ক্যামেরা সমেত পাথরের ওপর খুব জোরে পিছলে পড়ে গেলেন। অতি উৎসাহের মাশুল। কি ভাগ্যি যে হাড়গোড় ভাঙেনি, সবাই মিলে ধরে তাকে কোন রকমে গাড়ীতে বসালাম। ব্রীজের ওপর থেকে নদীর এবং দুই পাড়ের দৃশ্য অসাধারণ। মন ভরে গেলো আমাদের।


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour


ঘরে ফিরতে ফিরতে প্রায় সোয়া দুটো বেজে গেলো। আমাদের এই ঘর গুলো থেকে সামনের উপত্যকাটি আর তার বুক চিরে বয়ে চলা রোলেপ নদীর দৃশ্য অপূর্ব, এক কথায় নয়নাভিরাম। পাহাড়ের মাথায় মাথায় ঘন মেঘ কোথাও অমলিন শ্বেত বর্ণ, কোথাও আবার কুঞ্চিত ঘন কৃষ্ণ বর্ণে সজ্জিত। দূরে একটা পাহাড়ের শ্যামল গাত্রে চড়া রোদ পড়েছে। কেবল ওই দিকটা চকচক করছে। ওই পাশ দিয়ে ঊড়ে যাওয়া দল বাঁধা মেঘেদের ছায়া পড়েছে ওই রোদ্দুর মেখে শুয়ে থাকা পাহাড়ের গায়ে। হঠাৎ দেখলাম অনেক দূর থেকে অন্য আরেক পাহাড়ের মাথার অপর দিয়ে ঘন কুয়াশার মতো চাদর মুড়ি দিয়ে নেচে নেচে বৃষ্টি আসছে। একটু কান পাতলেই হয়তো তার নুপুরের ছমছম শব্দ শোনা যেত, ঠিক সেই সময় খাবার ঘর থেকে ডাকতে এলো একটা রোগাসোগা বাঙালি ছেলে। বছর পনেরো ষোলো বয়স হবে। ওরা দুই ভাই প্রতি বছর পূজোর ছুটিতে আর গরমের ছুটির সময় যখন স্কুল বন্ধ থাকে সেই সময় সেই সুদূর মেদিনীপুরের গ্রাম থেকে সিকিমের এই সব গ্রাম গুলোতে, যেখানে পর্যটকদের ভিড় সামলাতে গ্রামের হোম স্টে গুলো বাইরের কর্মচারী রাখতে বাধ্য হয়, সেই সব জায়গাগুলোয় কাজের আশায় চলে আসে। বাবা দিনমজুর। যা রোজগার তাতে সারা বছর চার জনের অন্নের সংস্থান করা খুবই কষ্টের, তাই স্কুল পড়ুয়া দুই ছেলে বেশ কয়েক বছর ধরে এই সময় এই কাজ করে বাবার কষ্ট অন্তত কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করছে। 

ওর সঙ্গে ধীরে ধীরে নীচে নেমে এলাম। সুন্দর করে সাজানো ডাইনিং হল। দুই ধারে লম্বা করে ডাইনিং টেবিল পাতা। প্রথমে রেক্সিন দিয়ে মোড়া হয়েছে, তার ওপরে সুন্দর ফুল কাটা টেবিল ক্লথ পাতা। বাটিতে বাটিতে লঙ্কা, লেবু, আচার রাখা রয়েছে স্থানে স্থানে। সবাই আসার পরে বড়ো বড়ো থালায় স্যালাড এনে সাজিয়ে দিয়ে গেলো। টম্যাটো, পেঁয়াজ, গাজর, মূলো ধনে পাতা আর চৌকো করে বড়ো বড়ো টুকরো করে কাটা আরেক প্রকার সব্জী। মুখে দিয়ে এই সব্জীকে মনে হলো স্বাদে একেবারে শসা, অথচ শসার মতো দেখতে নয়। জিগ্যেস করে জানলাম একে বলে ক্ষীরা। হিন্দীতেও তো শুনেছি শসাকে ক্ষীরাই বলে, তাহলে? ভাত, ডাল, দু রকমের তরকারি, ডিমের ঝোল, চাটনি, পাঁপড় সহযোগে দুপুরের খাওয়া পর্ব শেষ করে হোম স্টের মালকিন হাসতে হাসতে আমার মতো অর্বাচীনকে নিয়ে চললেন এই বাড়ীর লাগোয়া তার বিরাট বাগানে ক্ষীরা চেনাতে। মধ্য বয়সীনি এই দিদির ভাবখানা এই যে কোথাকার এক গেঁইয়া মূর্খ যে এখনো ক্ষীরা চেনেনা। পাহাড়ের ধাপে ধাপে নীচের দিকে নেমে গেছে এই পারিবারিক বাগান। অনেকটা জায়গা জুড়ে, কি নেই এই বাগানে। ফুলকপি, বেগুনী রঙা বাঁধা কপি, ধনে পাতা মুলো, পালং শাক, রাই সর্ষে শাক, কুমড়ো, ছোটো ছোটো সাদা বেগুন, বাতাবী লেবুর গাছ, এমনকি পাহাড়ী লতানো ঝিঙ্গে পর্যন্ত। স্কোয়াশের গাছ তো বলে শেষ করা যাবে না, প্রচুর স্কোয়াশ ধরে আছে গাছে।


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour




একটা ঝাঁকড়া বেদানা গাছের পাশে মাচায় তুলে দেওয়া লতানে গাছ, একেবারে লাউ পাতার মতো বড়ো বড়ো সবুজ পাতা, সেখান থেকে একটা বড়ো অথচ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে খুব কচি সবুজ একটি লাউ ঝুলছে। দিদিমনি এই লাউ দেখিয়ে আমায় চেনালেন একেই ক্ষীরা বলে। আমি সরোষে প্রতিবাদ করে উঠলুম, হতেই পারেনা, এ তো লাউ! দিদিমনিও ছাড়বার পাত্রী নন, বললেন আজ আপনি যে সব্জীর স্যালাড খেলেন ওটা এই ফল। বিশ্বাস না হয় চলুন, আমাদের বাজারের ঝুড়িতে দেখাচ্ছি। অবাক হয়ে গেলাম। আশ্চর্য তো! দেখতে হুবুহু লাউয়ের মতো অথচ শসার সম্পূর্ণ স্বাদ।

আজ বেশ একটু মেঘলা আবহাওয়া, ঘরে শুতে মন চাইলো না। পায়ে পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে বেড়িয়ে পড়লাম। নির্জন শান্ত পাহাড়ী প্রকৃতি। মোটামুটি বেশ ঠান্ডা এখন। এই সময়টা ঠিক দুপুরও নয় আবার বিকেল হতেও কিছুটা দেরী আছে। কিছুটা গড়ানো দুপুরবেলা বলা যেতে পারে। 


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour




হাঁটতে হাঁটতে কেমন একটা নেশা ধরে গেছে যেন। পাহাড়ের গা বেয়ে এক জায়গায় ঝিরিঝিরি স্রোতে নেমে আসছে ঝোরা, খুব ইচ্ছে হলো ছুঁয়ে দেখতে। কনকনে ঠান্ডা জল। রাস্তার পাশের সরু নালা দিয়ে গড়িয়ে আরো নীচে কোন্ নিরুদ্দেশের দিকে যে চলে গেছে এই নির্ঝরিণী তাজানা গেলো না।



silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour


ওপর থেকে নীচের উপত্যকা, পাহাড়ের ঢালু কোল বেয়ে নেমে আসা ঝুম চাষের সবুজ ধানের ক্ষেত, আর একটু নীচে সাদা সূতোর মতো শুয়ে থাকা রোলেপ নদী সব কিছু কেমন একটা ঘন মায়াময় স্বপ্নীল দৃশ্যপটের মতো মনে হচ্ছে।


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour




ঐ যে এক্ষুনি পাহাড়ের কোন্ কোনা থেকে কালো মত বড়ো ল্যাজ ঝোলানো একটা নাম না জানা পাখী তীব্র স্বরে সারা পাহাড়ে অনুরণন তুলে ডেকে ডেকে উঠছিলো ও যেন সত্যি নয়। কেমন ঘোর লাগা স্বপ্নময় একটা আবরণ যেন ছেয়ে আছে আমার চারিদিক। এক্ষুনি এই জাল ছিঁড়ে কোন এক আলুথালু বাস্তব আচমকা ঝুপ করে বেড়িয়ে এসে হয়তোবা ছন্দপতন ঘটাতে পারে। 


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour


পেছন থেকে কচি গলায় কেউ ডাকলো, আঙ্কেল, আঙ্কেল। ফিরে দেখি দুটো ছোট ছোট মেয়ে, স্কুলের পোষাক পরা।স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছে। বললো আমরা দুই বন্ধু, আমাদের ছবি তুলে দেবে? বললাম দিতেই পারি, কিন্তু তোমায় দেবো কি করে? বললো, দিতে হবে না, কেবল ছবি তুলে দেখাও আমাদের কেমন লাগছে।


silk-route-tour-08, sikkim silk route tour, old silk route tour
Sikkim Tour




ছবি দেখে দুই বান্ধবীর আনন্দ আর ধরেনা। কত কথা যে কলকল করে বলে গেলো দুটিতে। ক্লাস ফোরে পড়ে। ওদের স্কুল থেকে বাড়ী প্রায় আট কিলোমিটার দূরে। এই রাস্তায় খুব কম গাড়ী চলে। এক এক দিন যখন পথ চলতি কোন গাড়ী সামনে পড়ে যায় তখন তারাই এই কচি বাচ্চা গুলোকে গাড়ীতে তুলে স্কুলে বা বাড়ীতে নামিয়ে দেয়। আজ এখনো তেমন কোন গাড়ী পায়নি বেচারীরা, তাই পায়ে হেঁটেই বাড়ী ফিরছে। এই আমার দেশ। পড়বার কি অদম্য ইচ্ছা থাকলে এই কচি কচি দুটো বাচ্চা সেই ছোট বেলা থেকে এই ভাবে আট কিলোমিটার হেঁটে প্রতিদিন আসতে আর যেতে পারে ভাবতেই আমার রোমাঞ্চ হলো। আমরা যারা শহরে বাস করি ভাবুন তো কোন এক দিন যদি গাড়ী বাস অটো বন্ধ থাকে তাহলে সমতলের স্বচ্ছন্দ রাস্তায় আট কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে স্কুল কলেজ অফিস করতে পারবেন তো ? আর এটা তো চড়াই উৎরাইয়ের ধারা পথ। পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করেছে।ঠান্ডাটাও বাড়ছে যেন। এবার ফিরতে হবে আস্তানায়।

চলবে.....................................................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ