ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৫

ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ৫ 



ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



অবেলায় এমন তৃপ্তির ভোজন সাঙ্গ করে মনে হল একটু জিরিয়ে নেওয়া ভালো। অন্যান্যরা গেলেন লেহ মার্কেট থেকে পছন্দের সওদা করতে। আমি লবিতে আরাম করে বসে জুম ভাই আর সেলিমের সঙ্গে গল্প জুড়লাম। আজ ওনার বড় ছেলে জাভেদের বাড়ী আসার কথা। সপ্তাহে একবার জাভেদ বাড়ী আসে, আবার রবিবারে  ফিরে যায়। কারগিলের পথে খালসার বলে একটা জায়গায় একটি কলেজে অধ্যাপনা করে জাভেদ। অত্যন্ত ভদ্র এবং শিক্ষিত ছেলে। জাভেদ কে আমি অনেক দিন থেকেই চিনি। যদিও মুখোমুখি এই প্রথমবার দেখা হবে আমাদের। সন্ধ্যের মুখে জাভেদ এলো। গাড়ী থেকে নেমে প্রথমেই আমার সাথে দেখা করতে এলো। মিষ্টি চেহারা,বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল চোখে রিমলেস চশমা, ঝকঝকে তরুণ। দুজনেই আলিঙ্গনাবদ্ধ হলাম। ফোনে মাঝে মাঝেই আমাদের আলাপ হতো, বিশেষ করে এই হোটেল নিয়েই আলোচনা হতো আমাদের মধ্যে। বেশ একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে আছে আমাদের। কুশল বিনিময়ের পর জাভেদ জামাকাপড় ছাড়তে গেল। রাত্রের ভোজন পর্ব চলাকালীন জাভেদ জিজ্ঞেস করলো দলের সকলে যথাসম্ভব উপযুক্ত গরম জামাকাপড় সঙ্গে এনেছি কিনা। কাল ভোরে আমাদের প্যাঙ্গং এবং সুমোরিরি যাত্রার শুরু। দু দিনের এই সফরে ঠান্ডার প্রকোপ নাকি সাংঘাতিক। আমার সাথে থাকা গরম কাপড় দেখে ওর মোটেই পছন্দ হলোনা। জোর করে নিজের একটা পালকের মোটা জ্যাকেট নিয়ে এসে আমায় সে পরাবেই আর আমিও নেবোনা, শেষে জাভেদের ইচ্ছারই  জয় হলো। আমার জন্য ওর চিন্তার শেষ নেই। পইপই করে সব খুঁটিয়ে দেখে তারপর পরদিন ভোর বেলায় আমাদের প্যাংগং যাত্রা ওর অনুমোদন লাভ করলো। কথা দিলাম একবার হলেও ওর দেওয়া জ্যাকেট গায়ে চাপাবো। 

নাজির ভাই সকাল সাতটা থেকে তাড়া মারতে মারতে অবশেষে জলখাবার খেয়ে বেলা সওয়া আটটায় রওয়ানা হওয়া গেলো। লেহ থেকে প্যাংগং যাবার পথে কিছুদুর এগিয়েই শুরু হলো চড়াই। ঠান্ডাও বাড়তে লাগলো হু হু করে। রাস্তা বেশ খারাপ। লাফাতে লাফাতে চলেছি চাং লা গিরিপথের দিকে।




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



চাং শব্দের অর্থ দক্ষিন, আর লা মানে পাস বা গিরিপথ। অর্থাৎ দক্ষিনের গিরিপথ। লেহ থেকে ক্রমশঃ দক্ষিন দিকে গেলে তারপর পরবে প্যাংগং লেক। পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম মোটর গাড়ী চলাচলের জন্য বিখ্যাত তাংলাং লা পাসের কথা আগেই উল্লেখ করেছি, তার উচ্চতা ১৭৪৮০ ফুট। অথচ এই চাং লা পাসের উচ্চতা ১৭৫৯০ ফুট। এই গিরিপথের প্রচার কম। তাই পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম মোটর চলাচলের রাস্তা হয়েও সেই ভাবে এই গিরিপথ প্রচারিত নয়। তার হয়ে গলা ফাটানোর কেউ নেই বলেই বোধহয় এই দশা।



ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



চাং লা পাসে সুন্দর একটা চায়ের দোকান আছে। বেশ ভীড়। দোকানী আর তার বউ হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে খদ্দের সামলাতে। লাদাখী কাওয়া চা খেয়ে মন জুড়োনো গেলো এখানে। তীব্র হাওয়ার প্রকোপ। এতো গুলো গরম জামা ভেদ করেও যেন ছুঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছে গায়ে।




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



রাস্তায় ইতস্তত বরফ পরে আছে। হাতের নাগালে একটা মস্ত গ্লেসিয়ার। অসাধারণ পরিবেশ। দেখে দেখে চোখ সরছে না আমাদের। গাড়ী আবার এগোল প্যাংগং-এর দিকে। রুক্ষ খাড়াই ন্যাড়া বিচিত্র বর্ণের পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ী। ভেতরে আমরা কয়েকজন এক অপার মৌন বিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে অবারিত এই রুপসুধা অনর্গল পান করতে করতে চলেছি।


ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



পথের এক জায়গায় দূর থেকে দেখা গেল চার পাঁচ জন বাইক আরোহী গাড়ী থামিয়ে কি করছে। কাছে গিয়ে দেখা গেলো প্রায় খরগোশের মতো বড়ো বড়ো বাদামী বর্ণের এক রকম প্রাণী কুতকুতে চোখে লাফালাফি করতে করতে ওই বাইক আরোহীদের দেওয়া বিস্কুট খাচ্ছে। এগুলো এই অঞ্চলের বিখ্যাত মেঠো ইঁদুর যাকে স্থানীয় ভাষায় মারমুঠ বলা হয়। নাজির ভাই গাড়ী দাঁড় করিয়ে রাগে গড়গড় করতে করতে ওই বাইক চালকদের ভীষন বকতে লাগলো। বল্লো কে তোমাদের ওদের খাওয়াতে বলেছে? তোমরা কি ঠেকা নিয়েছো প্রতিদিন ওদের খাবার জোগাবে বলে? ওরা প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতি ওদের জন্য নরম ঘাস আর মাটির তলার পোকামাকড়ের ব্যবস্থা করে  রেখেছে আগেই। পারবে ওদের সকলের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার লাখ লাখ  বিস্কুটের জোগান দিতে? দয়া করে উপযাচক হয়ে ক্ষনিকের আনন্দের জন্য ওদের খাদ্য শৃঙ্খলের ক্ষতি কোরনা। লেখাপড়া জানা শিক্ষিত বলে যদি সত্যি মনে করো নিজেদের তাহলে দয়া করে ওদের এমন সর্বনাশটি কোরনা তোমরা। ছেলেগুলোর বোধোদয় কতোটুকু হলো জানিনা তবে আমি অবাক বিস্ময়ে এই কাংরি গ্রামের অতি  সাধারণ পরিবারের অত্যন্ত সামান্য লেখাপড়া জানা নাজির ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। আমার শহুরে শিক্ষিত মানসিকতার দম্ভের ওপর কি অনায়াসে ভারী বুল্ডোজার চালিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বহুশ্রুত তত্বের সারবত্তাটিকে চোখে আঙুল দিয়ে এমন সরল করে বুঝিয়ে দিলো নাজির ভাই যে মনে হলো কেবল পুঁথি পরেই কেউ শিক্ষিত হয় না, সঠিক শিক্ষা আসে পরিবেশ থেকে আর প্রকৃতি থেকে, এই শিক্ষার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটা সরল নিস্পাপ ভালবাসাময় মন। 

রাস্তায় একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে চাউমিন দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিলাম আমরা। দেখতে দেখতে বেলা পড়ে আসতে লাগলো। হঠাৎ নাজির ভাই আঙ্গুল তুলে সামনের পাহাড়ের  কোণার দিকে দেখালো। ওই বাঁক ঘুরলেই দেখা যাবে প্যাংগং লেক। প্রথম দেখার এক অনাস্বাদিত আনন্দ থাকে, তবে চলন্ত গাড়ীর ভেতর থেকে এই ক্ষণিকের সামান্য দর্শনে মন ভরলো না আমাদের।মিনিট পনেরোর মধ্যেই এসে পৌঁছে গেলাম প্যাংগং লেকের পাড়ে।




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



এক জায়গায় গাড়ী দাঁড় করিয়ে হৈ হৈ করে নেমে এলাম আমরা। ঢেউ তোলা সারি সারি অসংখ্য পাহাড়ের মাঝখানে অনন্ত নীল জলরাশি। জলে পাহাড়ের ছায়া।পূঞ্জীভূত শ্বেত বর্ণা মেঘরাশি  কোথাও দল বেঁধে আবার কোথাও একা শান্ত বিরহ বিধুরা রমনীর মতো অলস গমনা। নীল জলে তাদেরও প্রতিচ্ছবি। মনে হচ্ছে এ  যেন সত্যি  নয়, স্বপ্নের মতো, অসম্ভব রঙ্গিন। এক্ষুনি হয়তো ঘুম ভেঙ্গে গেলে এই মধুরতা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। অসম্ভব ঠাণ্ডা এখানে। তীব্র হাওয়ার প্রকোপে দাঁড়িয়ে থাকাও বেশ কষ্টকর। কান মাথা গলা সমস্তকিছুই টুপি দিয়ে ঢেকে ফেলেছি, মায় হাত পর্যন্ত দস্তানাতে মোড়া হয়ে আছে। তবু ঠাণ্ডার দাপট এতোতুকু যদি কম লাগতো!  

ছবি তোলা শেষ করেই আবার গাড়ী নিয়ে এগোনো গেলো। প্যাংগং-এ আমাদের আজকের ঠিকানা লেকের কোল ঘেঁষে তাঁবুর ভেতরে। জিনিষটা যে ঠিক কেমন হবে এই নিয়ে দলের সকলের ভেতরেই বেশ কিছুটা উদ্বেগ থেকে গেছে। বিশেষ করে এখানে এই ভয়ানক শীতের মধ্যে তাঁবুর ভেতর কি যে ভয়ানক রাত আমাদের জন্য  অপেক্ষা করে আছে কে জানে। প্রায় ইষ্ট নাম স্মরণ করতে করতে অগ্রসর হলাম  আমাদের রাত্রির বাসস্থানের সন্ধানে।




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



লেকের প্রায় পাড়ে একটু উঁচু জায়গায় সারি সারি সাদা রঙের তাঁবু। আমাদের কাগজ পত্র দেখে মালিক ভদ্রলোক সঙ্গে করে নিয়ে এলেন আমাদের। চেন টেনে তাঁবুর দরজা খোলা হলো। কোন ছিটকিনি বা হুড়কোর বালাই নেই। একেই বোধহয় বলে একেবারে আগল খোলা ব্যবস্থা। এই উঁচু জায়গাটির ঠিক নিচে বিরাট একটি হল ঘরের মতো ব্যবস্থা। সেখানে সম্পূর্ন আধুনিক কায়দার ডাইনিং। আমাদের ঘর অত্যন্ত পরিপাটি করে ঠিক যেন কোন তারকা খচিত আধুনিক হোটেলের ঘরের মতো সাজানো। বেড রুম, লিভিং রুম, বাথরুম, সাথে একটি জামাকাপড়  বদলাবার ছোট্ট ঘর পর্যন্ত। বাথরুমে ইংলিশ কায়দার বন্দোবস্ত মায় শ্যাম্পু, সাবান, টুথপেষ্ট পর্যন্ত। ওয়াড্রোবে বাড়তি লেপ ও কম্বল রাখা আছে যদি দরকার হয় সেই জন্য। রাত্রে বিছানার ভেতর নিয়ে শোবার জন্য হট ওয়াটার ব্যাগও পাওয়া যাবে জানা গেলো। ব্যাবস্থার আতিশয্যে আপ্লুত হলাম আমরা। সামান্য বিশ্রামের পরই ডাইনিং হল থেকে ডাক এলো চা-স্ন্যাক্সের।




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



আমরা ক্যামেরা বাগিয়ে তখন লেকের পাড়ে অস্তগামী দিনমনির শেষ রঙের আলপনা আঁকা দেখছি।মূহুর্তে মূহুর্তে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের রঙ আর তার সাথে বদলাচ্ছে লেকের জলের রঙ।




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



লেকের উল্টোদিকের পাহাড়গুলোর শ্বেত উষ্ণীষ ঘন ঘন রঙ বদলে নিচ্ছে, কখনো লাল, কখনো কমলা কখনো গৈরিক। অবাক বিস্ময়ে এই অত্যাশ্চর্য পট পরিবর্তনের কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে থাকতে থাকতে অলক্ষ্যের পাকা নিপুণ খেলোয়াড় সেই বিধাতা পুরুষের উদ্দ্যেশ্যে জোড় হস্তে প্রণাম করে নিলাম। 




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



দেখতে দেখতে নীরব নিশীথিনী তাঁর পদ্মকোরক সদৃশ শ্রীচরণ ফেলে এগিয়ে এসে দীর্ঘ অন্ধকার কেশরাশি বিছিয়ে আলোর শেষ কণাটুকুকেও নিঃশেষে বিলীন করে বিরাজিতা হলেন। 




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



তাঁবুর চারপাশে এবং ভেতরে জেনরেটর সৃষ্ট তীব্র বৈদ্যুতিক আলোগুলো জ্বলে উঠে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করলো। তীব্র ঠান্ডায় আপাদ মস্তক গরম কাপড়ে মুড়ে লেকের পাশে দাঁড়িয়ে তারাভরা আকাশ আর লেকের জলে তার কাঁপা কাঁপা প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এই কি সেই অমরাবতীর পাড়?




ladakh-tour-05, leh-ladakh-tour
Leh-Ladakh Tour



রাত নটায় খাবারের ডাক  এলো। পরদিন অতি প্রত্যুষে সূর্যোদয় দেখতে হবে। তাঁবুর চেন বন্ধ করে গরম বিছানায় ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়লাম। বাইরে তখন প্যাংগং লেকের তীব্র বাতাস শনশন রাগিণীতে আলাপে মগ্ন।

চলবে...............................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ