আশা এবং আবেগে জড়ানো ভারতের স্টেডিয়ামগুলি।

আশা এবং আবেগে জড়ানো ভারতের স্টেডিয়ামগুলি।


stadiums-in-India, list-of-Indian-stadiums, stadiums-of-India
Indian Stadiums


ক্রিকেট খেলতে বা ক্রিকেট খেলা দেখতে আমরা সকলেই অল্প বিস্তর ভালোবাসি। টেলিভিশনে বা  রেডিওতে  ক্রিকেট খেলা দেখেননি অথবা শোনেন নি এমন মানুষ বিরল। কলকাতায় এমনকি গলি ক্রিকেটও খুবই  জনপ্রিয়। গলি ক্রিকেট নিয়ে ছোট বড়ো কত টুর্নামেন্ট হয়েছে এই কোলকাতা শহরে,  এমনকি  রীতিমতো স্পনশরারদের দিয়ে ভালো প্রাইজ মানির ব্যবস্থা করিয়েও গলি ক্রিকেট খেলানো হয়েছে কখনো কখনো। ক্রিকেট  খেলার নামেই সারা দেশে এক বিরাট উন্মাদনার সৃষ্টি হয়।কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা অথবা কলকাতা থেকে আমেদাবাদ সব বয়সের সমস্ত ভারতীয় এই খেলাটিতে মন থেকে জড়িয়ে আছেন বহু যুগ ধরে। তাই ক্রিকেট নিয়ে জানা অজানা অসংখ্য তথ্য সর্বদা সকলের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু খেলাটি যেখানে অর্থাৎ যে মাঠটিতে অনুষ্ঠিত হয় সেই মাঠ বা খেলা দেখার জায়গাটির সম্পর্কে সব তথ্য সকলের জানা নেই হয়তো। আজ আমরা ভারতের সমস্ত স্টেডিয়েম গুলি নিয়ে এখানে আলোচনা করবো। 

এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে আমাদের দেশে কেবল ক্রিকেট খেলাটিই যে জনপ্রিয় তা’ নয়। ফুটবল, কুস্তি, কাবাডি, তীরন্দাজি, বিভিন্ন অ্যাথলেটিক ইভেন্ট যেমন দৌড়, সটপাট, হাই জাম্প, লং জাম্প প্রভৃতি  অলিম্পিক স্বীকৃত অসংখ্য খেলাধুলার চর্চা হয়ে থাকে আমাদের দেশে।মনে রাখা দরকার  যে ফরমুলা ওয়ানের মতো বিখ্যাত মোটর রেসিং গেমের জন্যও যথেষ্ট জনপ্রিয় আমাদের দেশ। এতো সব নামকরা বিখ্যাত খেলা গুলোর আয়োজনের জন্য এবং দর্শকদের বসবার জন্য বিরাট বিরাট স্টেডিয়মের প্রয়োজন।চলুন, আজ আমরা আমাদের এই বিরাট দেশের ক্রীড়া চর্চা এবং তা’ উপভোগ করবার সেই সমস্ত অঙ্গন গুলি সম্বন্ধে বিশদে খবরাখবর নেবার চেষ্টা করি।

ভারতের জনগনের সবচেয়ে আবেগের খেলা হচ্ছে ক্রিকেট কিন্তু আমাদের দেশের জাতীয় খেলা হচ্ছে হকি। অনেকবার আমাদের দেশ ক্রিকেটে বিশ্বসেরার উপাধি লাভ করেছে। অসংখ্য বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজনও হয়েছে অনেকবার আমাদের দেশে। ঠিক তেমনই হকিতেও আমাদের দেশ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে খেতাব অর্জন করেছে বহুবার। এর সাথে সাথে স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার বছর পরেই ১৯৫১ সালে আমাদের দেশ বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রীড়া ইভেন্ট এশিয়ান গেমস আয়োজন করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, প্রমান করে দিয়েছিল কেবল ইচ্ছে এবং আন্তরিকতা এবং কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা যে কোনো আপাত শক্ত কাজ ভারত বাসীরা অতি সহজেই করে ফেলতে পারে। 

ইদানীং কালে ক্রিকেট এবং হকির সাথে সাথে অন্যান্য অনেক খেলাতেই ভারত পারদর্শিতা অর্জন করেছে। আরেকটি খেলা ভারতের মাটির সাথে আবেগ হয়ে জড়িয়ে রয়েছে, সেটা হচ্ছে ফুটবল।অনেকের হয়তো মনে থাকতে পারে যে ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমসে সদ্য প্রয়াত ভারতীয় ফুটবলার চুনী গোস্বামীর নেতৃত্বে ভারতীয় ফুটবল দল শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়ে গোল্ড মেডেল জয় করেছিল এবং ১৯৬৪ সালের এ এফ সি এশিয়ান কাপে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রুপোর পদক লাভ করেছিল। ক্রিকেট, হকি এবং ফুটবলের জন্য আমাদের দেশে অবশ্যই বেশ  কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম রয়েছে। সেই রকম ভাবে অন্যান্য খেলাধুলার জন্যও অনেকগুলো বড়ো বড়ো স্টেডিয়ামও আছে আমাদের দেশে। 

আমার হিসেব মতো ছোট বড়ো মিলিয়ে সমস্ত প্রকার খেলাধুলার জন্য সর্বমোট ১২৫ টি স্টেডিয়াম  রয়েছে আমাদের দেশে। কেবল ক্রিকেট খেলার জন্য অর্থাৎ যেখানে কখনো না কখনো অন্তত একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা যেমন টেস্ট ক্রিকেট, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অথবা টোয়েন্টি টোয়েন্টি ম্যাচ যাই হোক না কেন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই রকমের ক্রিকেট স্টেডিয়াম রয়েছে ৫২ টি। এত সংখ্যক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সারা পৃথিবীতে আর কোন দেশের নেই। এই সংখ্যার বিচারে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে  ইংল্যান্ড, মাত্র তেইশটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম নিয়ে। 

আচ্ছা বলুন তো, সারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি কোথায় অবস্থিত? অবাক হবেন না। সেটিও আমাদের এই ভারতের  হিমাচলপ্রদেশ রাজ্যের রাজধানী শহর সিমলা থেকে মাত্র বত্রিশ  কিলোমিটার দূরে চেইলে (Chail) অবস্থিত। পরাধীন ভারতের পাতিয়ালা রাজ্যের মহারাজার ক্রিকেট খেলার প্রতি অত্যন্ত ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে মহারাজার আর্থিক আনুকুল্যে এই বিখ্যাত স্টেডিয়ামটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দেওদার এবং পাইন গাছে ছাওয়া, হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বত শৃঙ্গগুলি দিয়ে ঘিরে থাকা এই অপূর্ব স্টেডিয়ামটি দেখার জন্য আজও অসংখ্য দর্শনার্থী চেইলে ভিড় করেন। যদিও এই স্টেডিয়ামটি বর্তমানে সেনা বাহিনীর রক্ষনাবেক্ষনে থাকার ফলে এখানে আপাতত কোনো আন্তর্জাতিক খেলা অনুষ্ঠিত হয়না। তবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি যেখানে নিয়মিত ভাবে আন্তর্জাতিক খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে, সেটিও এই ভারতবর্ষের এবং এই হিমাচল রাজ্যের ধর্মশালা শহরে অবস্থিত। হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের  নামাঙ্কিত এই  স্টেডিয়ামটি চার হাজার সাতশো আশি ফুট উচ্চতায় অবস্থিত অত্যন্ত সুন্দর একটি স্টেডিয়াম। এই রঙিন স্টেডিয়ামটির একদিক ঘিরে রয়েছে ধৌলাধার পর্বত শ্রেনীর বরফে ঢাকা শ্বেতশুভ্র গিরিশৃঙ্গগুলি।

জানেন কি, সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী দর্শক আসন বিশিষ্ট স্টেডিয়ামটি রয়েছে উত্তর কোরিয়া দেশের  পিয়ং ইয়ংএ। এর নাম রানগ্রাদো ফাষ্ট অফ মে স্টেডিয়াম।এটি ফুটবল স্টেডিয়াম।উইকিপিডিয়ার হিসেব অনুযায়ী এই স্টেডিয়ামটির দর্শক আসন নাকি মোট এক  লক্ষ চোদ্দ হাজার।যদিও কেউ কেউ বলেন এই সংখ্যাটি নাকি আরো বেশী, প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। আর আশ্চর্য হবেন শুনলে যে   পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়ামটি আমাদের ভারতবর্ষেই অবস্থিত। গুজরাট রাজ্যের রাজধানী আমেদাবাদ  শহরের এই নতুন স্টেডিয়ামটিতে মোট দর্শক আসন সংখ্যা এক লক্ষ দশ হাজার।এই  স্টেডিয়ামটি মোতেরা নামেই অধিক পরিচিত, যদিও সরকারি ভাবে এই স্টেডিয়ামের নাম সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল স্টেডিয়াম। এটি একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং এটি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী দর্শক আসন বিশিষ্ট ক্রিকেট স্টেডিয়াম। অবশ্য আরো একটি বিরাট ক্যাপাসিটির এরেনা রয়েছে আমাদের দেশে, তবে সেটি কেবলমাত্র মোটর স্পোর্টসের জন্য নির্দিষ্ট,। বুদ্ধ ইন্টারন্যাশনাল সার্কিট নামের এই সুবিশাল  ক্ষেত্রটিতে একবারে প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার দর্শক জায়গা নিতে পারেন। উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের গ্রেটার নয়ডাতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মোটর স্পোর্টসের এই স্টেডিয়ামটিতে ফরমুলা ওয়ানের মত খ্যাতি সম্পন্ন ইভেন্ট আয়োজিত হয়। আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক  ক্রিকেট স্টেডিয়াম গুলির ভেতর এক নম্বরে যেমন রয়েছে আমেদাবাদের  মোতেরা স্টেডিয়াম, তেমনি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম কোলকাতায়, এটির নাম  ইডেন গার্ডেনস। তৃতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম অবস্থিত ছত্তিসগড় রাজ্যের রায়পুরে এবং চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামটির নাম রাজীব গান্ধী ক্রিকেট স্টেডিয়াম, এটি তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদ শহরে অবস্থিত। 

খেলাধুলা এবং শরীর চর্চায় উৎসাহ দেবার জন্য সমগ্র ভারতবর্ষের প্রায় সব কটি রাজ্যেই খেলাধুলার আধুনিক অঙ্গন বা স্টেডিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে। আগেই বলেছি সমস্ত খেলার জন্য সর্বমোট একশো পঁচিশটি  ছোট বড়ো স্টেডিয়াম রয়েছে আমাদের দেশে। যদি একেকটি রাজ্য হিসেবে বিচার করা হয়  তাহলে স্টেডিয়াম সংখ্যার শীর্ষে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। এই রাজ্যে মোট এগারোটি স্টেডিয়াম রয়েছে। তারপরেই রয়েছে কেরালা রাজ্য। এই রাজ্যে মোট স্টেডিয়ামের সংখ্যা দশটি। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পঞ্জাব রাজ্য, এখানে স্টেডিয়ামের সংখ্যা মোট নয়টি। চতুর্থ স্থানে রয়েছে দেশের চারটি রাজ্য, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং উত্তরপ্রদেশ। এই রাজ্য গুলিতে আটটি করে স্টেডিয়াম রয়েছে। পঞ্চম স্থানে আছে মধ্যপ্রদেশ এবং ওড়িশা রাজ্য। এই রাজ্য গুলিতে সাতটি করে স্টেডিয়াম রয়েছে। পাঁচটি করে স্টেডিয়াম নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে দেশের তিনটি রাজ্য, দিল্লী, ঝাড়খন্ড ও কর্ণাটক।মোট চারটি  স্টেডিয়াম নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছে আসাম রাজ্য। দেশের মোট সাতটি রাজ্য তিনটি করে স্টেডিয়াম নিয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে, এগুলি হলো, অন্ধ্র প্রদেশ, বিহার,  গোয়া, হরিয়ানা, রাজস্থান, সিকিম এবং তেলেঙ্গানা রাজ্য। দুইটি করে স্টেডিয়াম নিয়ে নবম স্থানে রয়েছে দেশের দুটি রাজ্য। সেগুলি হলো ছত্তিশগড় এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য। একটি করে স্টেডিয়াম নিয়ে দেশের মধ্যে দশম স্থানে রয়েছে ভারতের আরো পাঁচটি রাজ্য, সেগুলি হলো, হিমাচল প্রদেশ, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং উত্তরাখন্ড রাজ্য। যদিও এদের মধ্যে হিমাচল প্রদেশে দুটি স্টেডিয়াম রয়েছে, কিন্তু যেহেতু পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্টেডিয়াম হিসেবে মান্যতা পাওয়া চেইল স্টেডিয়ামটি বর্তমানে সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারনে এখানে কোনো খেলাই এখন আর অনুষ্ঠিত হয়না, তাই হিমাচল প্রদেশের চেইল স্টেডিয়ামকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে।

কেবলমাত্র ক্রিকেট খেলা হয় এইরকম স্টেডিয়াম আমাদের দেশে রয়েছে সবচেয়ে বেশী। আন্তর্জাতিক, রাজ্যস্তরীয় বা কেবল স্থানীয় দলগুলির খেলা হয় এই রকম সমস্ত ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে ধরলে সংখ্যাটা অন্যান্য যে কোনো দেশের কাছে রীতিমতো ঈর্ষণীয়। মোট তিপান্নটি। এর পরেই রয়েছে কেবলমাত্র  ফুটবল খেলার জন্য নির্দিষ্ট স্টেডিয়ামের সংখ্যা, মোট একত্রিশ টি।হকি ভারতের জাতীয় খেলা, অথচ  আমাদের দেশে কেবলমাত্র হকি খেলার জন্য নির্দিষ্ট স্টেডিয়ামের সংখ্যা মাত্র সাতটি, তার মধ্যে কেবলমাত্র পঞ্জাব রাজ্যেই রয়েছে চারটি, যদিও ক্রিকেট-ফুটবলের সাথে একই মাঠে হকিও খেলা হয় এমন স্টেডিয়ামও রয়েছে আমাদের  দেশে। ইন্ডোর গেমস অর্থাৎ টেবিল টেনিস প্রভৃতির জন্য আমাদের দেশে একটিই ইন্ডোর স্টেডিয়াম রয়েছে, সেটা কোলকাতায়। কোলকাতার যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গন যাকে সল্টলেক স্টেডিয়াম নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে সেটি আমাদের দেশের তৃতীয় সর্ববৃহৎ ক্রীড়াঙ্গন, এখানে প্রায় পঁচাশি হাজার দর্শক একসাথে বসে খেলা দেখতে পারেন। এই স্টেডিয়ামটিতে ফুটবল এবং অ্যাথলেটিক প্রদর্শিত হয়। আমাদের দেশে কেবলমাত্র অ্যাথলেটিকসের জন্য নির্দিষ্ট মাত্র একটিই স্টেডিয়াম  রয়েছে তবে ক্রিকেট এবং অ্যাথলেটিকসের জন্য রয়েছে আরো একটি এবং একসাথে অ্যাথলেটিকস এবং ফুটবল খেলা হয় এইরকম স্টেডিয়ামের সংখ্যা মোট দশটি। জিমন্যাস্টিকসের জন্য একটি, আবার  ইকোয়েস্ট্রিয়ান বা অশ্বচালনা এবং কাবাডি খেলার জন্যও একটি স্টেডিয়াম রয়েছে আমাদের দেশে।এছাড়াও অনেকগুলি স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম রয়েছে আমাদের দেশে।


stadiums-in-India, list-of-Indian-stadiums, stadiums-of-India
Indian Stadiums


জানেন কি, ভারতের সবচেয়ে ছোট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ময়দানটি কোথায় অবস্থিত? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। দিল্লীর ফিরোজ শাহ্‌ কোটলা ক্রিকেট ময়দানটি যার বর্তমান নাম অরুণ জেটলি ক্রিকেট স্টেডিয়াম, সেটিই হচ্ছে আমাদের দেশের সবচেয়ে ছোট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। যদিও দর্শক আসন প্রায় পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি কিন্তু মাঠের সাইজ খুব ছোট। এই মাঠের স্কোয়ার বাউন্ডারি হচ্ছে মাত্র ৫৬ মিটার এবং স্ট্রেট বাউন্ডারি ৬০ মিটার। 

আচ্ছা, জানেন কি, আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ক্রিকেট ময়দান কোনটি যা এখনো পর্যন্ত স্বমহিমায় উজ্জ্বল? এই মাঠটির নাম ইডেন গার্ডেনস। ভারতের কোলকাতা শহরে অবস্থিত এই অত্যন্ত সুন্দর  স্টেডিয়ামটি তৈরি হয়েছিল ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে।ইতিহাস থেকে যা জানা যায়, তখনকার কলকাতার এক স্বনামধন্য জমিদার ছিলেন বাবু রাজচন্দ্র দাস।আশাকরি আপনারা  রানী রাসমনির নাম শুনেছেন।  বাংলার সেই যুগের ইতিহাসে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে সেই মহা পূন্যবতী মহিলা ছিলেন জমিদার বাবু রাজচন্দ্র দাসের স্ত্রী। কোলকাতার জানবাজারে তার বিশাল প্রাসাদ। প্রচুর বিষয় সম্পত্তির মালিক এই প্রজাবৎসল জমিদারের দানধ্যানের জন্যেও সুখ্যাতি ছিল। একবার বাবু রাজচন্দ্র দাসের ছোট মেয়ের ভয়ানক অসুখ। অনেক ওষুধ, পথ্য, দাওয়াই দেওয়া হল অথচ মেয়ের অসুখ আর ভালো হয় না। তখন কোলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। বড়লাট ছিলেন লর্ড অকল্যান্ড। বড়লাট এবং তার বোন এমিলি ইডেন বাবু রাজচন্দ্র দাসের কন্যার এমন ভয়ানক অসুখের খবর পেয়ে নিজেদের উদ্যোগে  মেয়েটির চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত করেন এবং তার ফলে জমিদার কন্যা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এবং আনন্দিত হয়ে বাবু রাজচন্দ্র দাস, হুগলী নদীর তীরে তার সম্পত্তির অংশের এক সুন্দর সাজানো বাগান বড়লাটকে উপহার হিসেবে দেন। লর্ড অকল্যান্ডের নাম অনুসারে তখন এই বাগানের নাম ছিলো অকল্যান্ড সার্কাস গার্ডেন, পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ এই বাগানটিকে নতুন করে   সাজাবার সময় বড়লাটের বোন এমিলি ইডেনের স্মৃতির উদ্দ্যেশে এই বাগানটির নাম ইডেন গার্ডেন  রাখা হয়। বাইবেলে স্বর্গের উদ্যানের নাম ইডেন গার্ডেন। আরো অনেক পরে যখন সাহেবদের ক্রিকেট খেলার জন্য একটি বড় মাঠের প্রয়োজন হয় তখন এই ইডেন গার্ডেনের লাগোয়া বিরাট এক জমিতে গড়ে তোলা হয় ভারতের প্রথম ক্রিকেট উদ্যান এবং পাশের বাগানটির নামেই এই ক্রিকেট খেলার মাঠটির নাম ইডেন উদ্যান রাখা হয়। ১৮৬৪ সালে তৈরি হওয়া এই ক্রিকেট খেলার মাঠটি তাই কেবল একটি খেলার মাঠ নয়, পরাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল এই মাঠটি।  ইতিহাসের পাতা থেকে আরো জানা যায় যে ইংরেজ রাজপুরুষেরা নিজেদের শখ এবং আমোদ প্রমোদের জন্য দীর্ঘ দীর্ঘদিন ব্যবহার করবার পর মাত্র ১৯৩৪ সালে এই মাঠে প্রথম টেষ্ট ক্রিকেটের আয়োজন করা হয় সরকারি ভাবে। পরাধীন ভারত এবং শাসক ইংল্যান্ড এই যুযুধান দুই দেশের টেষ্ট ক্রিকেট হয়েছিল সর্বপ্রথম এই মাটিতেই।

ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ক্রিকেট স্টেডিয়ামটির নাম, একটু আগেই যার কথা আমরা আলোচনা করেছি,  দিল্লীর সেই বিখ্যাত ফিরোজ শাহ্‌ কোটলা স্টেডিয়াম, যেটি মাঠের আয়তনে দেশের সবচেয়ে ছোট স্টেডিয়াম  হিসেবে চিহ্নিত। ১৮৮৩ সালে তৈরি হওয়া এই স্টেডিয়ামটির আগের নাম ছিল অয়েলিংডন প্যাভেলিয়ন। বর্তমানে এই ফিরোজ শাহ্‌ কোটলা স্টেডিয়ামের নাম পুনরায় পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে অরুন জেটলি স্টেডিয়াম।

একটি দেশের ইতিহাসের সঙ্গে, তার সভ্যতার সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের মানুষের আবেগ আর ভালোবাসা। প্রাচীন রোমের ইতিহাসের সাথে যেমন পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে তার কলোসিয়ামের গল্প, তার গ্লাডিয়েটরদের গল্প, হাজার হাজার মানুষে্র উচ্ছ্বাস, আবেগ আর হাহাকারের শব্দ, ঠিক তেমনই ভারতের স্টেডিয়ামগুলির প্রত্যেকটাতেই প্রায় জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য জটিল উত্থান পতন,  রাজনীতির নানা অঙ্কের নানা রঙের অদ্ভুত সব খেলা। ক্ষমতার, দম্ভের আবার কখনো বা আশাহত বেদনার করুন পরিনতির ছবি। তবুও এই বৃহৎ আঙিনা গুলিকে ঘিরে দেশের সাধারন মানুষের নিরন্তর আবেগ খেলা করে বেড়ায়। কত নতুন নতুন স্বপ্নের, নতুন নতুন আশার সৃষ্টি যেমন হয়, কত প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন নবীন কুঁড়ি অকালেই তেমনই বিনষ্ট হয়ে ঝরে পড়ে যায় নিরাশার ভয়ঙ্কর ঝড়ের ভেতর। তবুও আবেগ বেঁচে থাকে, যেমন বীজের ভেতর লুকিয়ে বাস করে নতুন প্রানের ইঙ্গিত। এরই নাম হয়তো সভ্যতা। এগিয়ে চলার আরেক নামই তাই জীবন। 

সমাপ্ত  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ