রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব -১

চলবে.................................................................

লোকে
বলে আমার পায়ের তলায় নাকি চাকা লাগানো আছে, আজ
এ দেশ, কাল ও দেশ করে বেড়াই কেবলই। নেহাত
মিথ্যে বলে না যদিও। সেই কোন অল্প বয়সে ‘ওগো
পথের সাথী,
নমি বারম্বার’ বলে বেড়িয়ে পড়েছি আর তারপর থেকে
নিয়ত কেবল পথের দেবতার আশীর্বাদ মাথায় ধরে ছুটে চলেছি দেশ থেকে দেশান্তরে। এ কেবল
পেট চালাবার তাগিদে নয়, প্রানের
স্নিগ্ধ নরম প্রদীপ খানিকে উস্কে উস্কে উজ্বল থেকে উজ্বলতর করবার এক বিষম
দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা প্রতি পদে পদে প্রত্যয়ী দৃষ্টি মেলে বসে থাকে বুকের ভেতর, এগিয়ে নিয়ে যায় অনন্ত থেকে
আনন্দের দিকে। এই ব্যাপারটা ঠিক ঠিক ভাষায় প্রকাশ করবার মতো অতো বড়ো স্বরস্বতীর
বরপুত্র আমি নই। তবে মোদ্দা কথাটা হলো এই যে সুনিবিড় সুশীতল এই আনন্দময় ধরনীর
স্নেহের হাতটি ধরে নির্ভাবনায় বেড়িয়ে পড়ার মজাটাই আলাদা। যে বোঝার সে ঠিকই বোঝে, আর যে ঘরের কোনটি আগলে মুড়িঝুড়ি
দিয়ে বসে থাকে কল্পনার জুজুবুড়িটির আবির্ভাবের ভয়ে তাকে তার কুঁয়োর ঘরটিতে রেখে
আমার চলা সেই বিশ্ব পথিকের প্রাণোচ্ছল মুখটিকে প্রত্যক্ষ করবার দুরতিক্রম্য বাসনার
মধুর তাড়নায়। হে বিশ্বপথিক, ‘পথে
চলার লহো লহো লহো নমস্কার’।
পূর্ব
থেকে পশ্চিমে সহস্র সহস্র যোজন বিস্তৃত পৃথিবীর মানদণ্ড স্বরুপ বিরাজিত যে অতুল
মহিমান্বিত হিমালয়, যার
তুলনা সারা পৃথিবীতে নেই, চির
তুষারাবৃত সেই অনন্ত সৌন্দর্যের আকর সদৃশ যে গিরিরাজ, দেবতাদের আত্মাকে যিনি ধারণ করে
আছেন, সেই চির বাঞ্ছিত আরাধ্য দেবনিকেতন, আমায় সর্বদা এক অমোঘ আকর্ষণে টেনে
নিয়ে যায় তার সন্নিধানে। সবচেয়ে আনন্দ আর প্রশান্তি মেলে একমাত্র তারই বুকের ভেতর।
অথচ এই খবরটাই ঠিকঠাক জানতাম না যে আমার ঘরের পাশেই উত্তর পূর্ব সীমান্ত
রাজ্যগুলির কোল ঘেঁষে গিরিরাজের যে রঙিন আঁচলের প্রান্ত উড্ডীয়মান সেই খানে কেমন
অনাড়ম্বর উদাসীনতায় শুয়ে আছে এক প্রাচীন রহস্যময় সুষমা মণ্ডিত রাস্তা। আমার রাজ্য
পেরিয়ে প্রতিবেশী সিকিম রাজ্যের মধ্য দিয়ে বাম পার্শ্বে ভুটান দেশকে রেখে সোজা চলে
গিয়েছে নাথুলা গিরিবর্ত্মের হিমবাহ টপকে একেবারে সেই তিব্বত দেশের মাঝ দিয়ে
প্রাচীন চীন দেশের দিকে। কত ঝরনা, কত
নদী, কত কত গিরি গর্জ, কত ছোট বড়ো পাহাড়ী জনপদ যে অবাক
বিস্ময়ে চেয়ে আছে সেই অবিস্মরনীয় পথের সৌন্দর্যের দিকে তা বলে শেষ করা যাবেনা।
চটপট
জানাশোনা কিছু মানুষজনকে সঙ্গী করে বেড়িয়ে পড়লাম নতুন পথে। এই রাস্তার নাম প্রাচীন
রেশম পথ,
বা ওল্ড সিল্ক রুট।
পুরাকালে এই রাস্তা ধরেই চীন দেশের সঙ্গে ভারতবর্ষের বানিজ্য চলতো। বানিজ্য পথ আরো
অনেক ক’টি ছিলো সে যুগে। তবে অন্যান্য
রাস্তাগুলি আরো বেশী দুর্গম হওয়ার কারনে বনিক কুলের কাছে এই রাস্তাটি ছিলো অধিক
জনপ্রিয়। যদিও বরফাবৃত তিব্বতীয় গিরিপথ পেরিয়ে খচ্চরের পিঠে পশরা বোঝাই করে গিরি
দস্যুদের লোলুপ রক্তচক্ষু কে উপেক্ষা করে, কখনো
একা, কখনো দলবেঁধে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিজেদের প্রিয়
পরিজনদের ছেড়ে যে অকুতোভয় মানুষগুলি নিজেদের দেশের পশরার বিনিময়ে আমাদের দেশ থেকে
নিয়ে যেতেন মশলা আর রেশম, তাদের
যাত্রাপথ সে যুগে মোটেও রেশমের মতো মসৃণ ছিলোনা। আমাদের দেশের বনিকেরাও যেতেন
আসতেন, মুলতঃ দুই দেশের বানিজ্যিক ও
সাংস্কৃতিক মেল বন্ধনের এঁরাই ছিলেন মুখ্য কান্ডারী। এদের মুখে মুখেই কত মন কেমন
করা কাহিনী শাখা প্রশাখা বিস্তার করে রাজকন্যা রাজপুত্তুরের দেশে নিয়ে যেত
পারস্পরিক দেশের আত্মাকে। তখনকার কালে তাই এই বানিজ্য যাত্রীদের অসম্ভব সম্মান
করতেন দেশের রাজা থেকে শুরু করে সাধারন মানুষেরাও।
বাক্স
গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা সদলবলে। যাবো প্রতিবেশী রাজ্য সিকিম, তাই রাত্রে কোলকাতা থেকে বেড়িয়ে
পরদিন সক্কাল বেলাই পৌঁছে গেলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। গাড়ী বলাই ছিলো। সিকিমের
নম্বর প্লেট লাগানো গাড়ী, যাতে
রাস্তায় নেমে আবার গাড়ী না বদলাতে হয় সেই কারনেই এই ব্যবস্থা। নিউ জলপাইগুড়ি
ষ্টেশনে নেমে জানা গেলো এই সিকিমের গাড়ীকে ষ্টেশনে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে স্থানীয়
মাতব্বর ড্রাইভারেরা। অবশেষে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে, পকেট থেকে কিছু জলপানি খসিয়ে
তারপর রওনা হওয়া গেলো। আমাদের প্রথম গন্তব্য সিকিমের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের
ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ সিলেরীগাঁও। তিস্তার ধার ঘেঁষে কখনো পাহাড়ের নরম বুকের ভেতর
আচমকা হারিয়ে যাওয়া শান্ত নদীটিকে পুনরায় আবিস্কার করতে করতে অবশেষে কালিম্পং
শহরের ভেতরে এসে চা পানের বিরতি নেওয়া গেলো। ইয়াকের দুধ দিয়ে তৈরি কঠিন এক ধরনের
বিস্বাদ খন্ড এখানে বিক্রি হয়, আগেও
দেখেছি। একে স্থানীয়রা ‘ছুপ্রী’ বলে। এক টুকরো মুখে ফেললে
সারাদিনেও শেষ হবেনা, বস্তুতঃ
এই বস্তু কখনো মুখের ভেতর গলে শেষ হয় বলেও মনে হলনা, এতো কঠিন। তবে দোকানীর কাছে জানা
গেলো এই ছুপ্রী যেহেতু ইয়াকের দুধ জমিয়ে তৈরি তাই যাত্রা পথে অসীম শক্তি বা
এনার্জি দিতে সক্ষম। এক টুকরো মুখে ফেলে আবার যাত্রা শুরু করা গেলো। সামনের রৌদ্র
করোজ্জলো পাহাড়ের সবুজ ছায়া তখন তিস্তার জলে ঝলমলিয়ে হাসছে।
নিউ
জলপাইগুড়ি থেকে সিলেরিগাঁও সাকুল্যে মাত্র ৯৫ কিলোমিটার পথ, অথচ এইটুকু পথ পাড়ি দিতেই সময়
লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা। পাহাড়ী পথের চড়াই-উৎরাই কে সঙ্গী করে ধীরে ধীরে এগোনো, তবে ব্যস্ত রাস্তার চঞ্চলতায়
মুগ্ধ হতে হতে কখন যে ফুস করে রাস্তাটা ফুরিয়ে এলো বোঝাই গেলো না। চমক ভাঙল মধ্য
দুপুরের রোদ ঝলমল প্রকৃতির মাঝখানে যখন আচমকাই চার দিকে উত্তুঙ্গ পর্বত রাশির
মধ্যিখানে একফালি ছোট্ট জনপদের ভেতর গাড়ী এসে থামল। সুন্দর সাজানো গোছানো ঘর
গেরস্থালি সমেত এক খানি নিপাট নির্মল পাহাড়ী পাড়া গাঁ যেন। বেশ কয়েকটি বাড়ীর উঠোন
গুলো পর্যন্ত সুপটু হাতে নিকিয়ে আলপনা দেওয়া হয়েছে। এক মুহূর্তে মন ভালো হয়ে গেলো।
গাড়ী থেকে নামতেই এক ঝলক হিমেল হাওয়া কনকন করে জানিয়ে দিলো আমি বেশ উঁচুতেই এসে
গেছি। এক্ষুনি গরম জামা গায়ে না চড়ালেই নয় আর কি। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সামনের
ফাঁকা জমির গাছপালা সরিয়ে যে দৃশ্য চোখে পড়লো, অবিস্মরনীয় অতুলনীয় সেই
অনির্বচনীয় নিশ্চুপ পবিত্রতাকে ভাষায় বর্ণনা করার শক্তি আমার নেই। মধ্য দিনের
দীপ্যমান রক্তবলয় সদৃশ রবিকরের আলিঙ্গনে জাজ্বল্যমান কাঞ্চনজঙ্ঘা পরম আনন্দে
উদ্ভাসিত। দলের বাকিদেরও প্রায় নির্বাক দশা। ক্যামেরা বাগিয়ে দৌড়লাম এই অপূর্ব
মুহূর্তটিকে ধরে রাখবার জন্য।






0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.