রাজস্থান পর্ব - ২


রাজস্থান  পর্ব - ২

প্রথম পর্বের পর-



চতুর্থ দিন জয়শলমীঢ় থেকে মাউন্ট আবু 

  





জয়শলমীঢ় থেকে রাজস্থানের পাহাড়ী শহর মাউন্ট আবু প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরে যদিও এই রাজ্যের রাস্তাগুলি অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বেশ ভালো তবুও ধরে রাখুন প্রায় নয় থেকে দশ ঘন্টা লাগবে জয়শলমীঢ় থেকে মাউন্ট আবু পৌঁছতে এর সাথে রাস্তায় যতবার দাঁড়াবেন সেই সময়টুকুও যোগ করলে দেখবেন প্রায় অনেকখানি সময় সাপেক্ষ আজকের এই যাত্রাটিদুপুরের খাওয়ার জন্য অবশ্যই কোথাও না কোথাও আপনাকে থামতে হবে, তাই যত ভোরবেলা সম্ভব তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়ুন আজ, আর জল খাবারটাও না হয় গাড়িতে বসেই পাউরুটি, ডিম, কলা বা অন্য কিছু শুকনো খাবার ইত্যাদি দিয়ে সেরে  নেবেন আজকেযদি ভোর সাড়ে পাঁচটা বা ছটার ভেতর বেরোতে পারেন তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়যদি সন্ধ্যার আগে পৌঁছতে পারেন তাহলে নিজেরা পায়ে পায়ে এই অসামান্য সুন্দর মিষ্টি শীতল শহরটায় বেড়িয়ে নিতে পারেন ভালো লাগবে এই শহর প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর এই শহর আমার অন্যতম প্রিয় এই শহরের মুখ্য আকর্ষণ যদিও জগত বিখ্যাত দিলওয়ারা মন্দির আর আছে অসাধারন নাক্কি লেক ঘনায়মান সন্ধ্যার আধো আলোছায়ায় পাহাড়ের কোলে অলস ভাবে শুয়ে থাকা এই নাক্কি লেক আপনার খুব ভালো লাগবে এটাতে আমি নিশ্চিত আজ রাতটা আমরা মাউন্ট আবুতে কাটাবো 


পঞ্চম দিন মাউন্ট আবু দর্শন






তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে জলখাবার খেয়ে বেড়িয়ে পড়ুন প্রথমেই দেখে নিন জগদ্বিখ্যাত দিলওয়ারা মন্দির একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত সময় ধরে তৈরি হয়েছিল এই বিখ্যাত জৈন মন্দির এই মন্দিরের কারুকার্য আপনাকে মুগ্ধ করবে মন্দির দেখে এবার চলুন ব্রহ্ম কুমারী আধ্যাত্যিক বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে, একই সঙ্গে এদের পিস হলটিও দেখে নিন এবার চলুন অর্বুদা মন্দির দর্শন করতেপাহাড়ের ওপর  অসাধারন প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝখানে এই মন্দির পাহাড়ের গা দিয়ে অসংখ্য সিঁড়ি ভেঙে যেতে হবে এই মন্দির দর্শন করতেএখান থেকে চলে আসুন নাক্কী লেক দেখতে ঘোড়ায় চড়া, বোটিং করা তো চলছেই, তার সাথে রাজস্থানী পোষাক পরে চলবে ছবি তোলা মধ্যাহ্ন ভোজনের পর চলুন গুরু শিখর, হনিমুন পয়েন্ট আর সান সেট পয়েন্ট দেখতে মনে রাখবেন, মাউন্ট আবুতে এই দর্শনীয় স্থানগুলি দেখার জন্য ওই  খানের স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করতে হয় হোটেল কে বললে তারাই ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন অথবা নিজেরাই গাড়িওলার সাথে ঠিকমতো দরাদরি করে কি কি জায়গা দেখাবে তার কথা আলোচনা করে নেবেন মাউন্ট আবু যেহেতু পাহাড়ের ওপরে তাই এখানে ঠান্ডাও অনেক বেশী সেই মতো গরম জামাকাপড় সঙ্গে নেবেনলাঞ্চের পরে অর্থাৎ দ্বিতীয় দফাতেও এতো গুলো জায়গা দর্শন করার পরে হোটেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে হাতে সময় পেলে নিজেরাই পায়ে হেঁটে অসামান্য এই পাহাড়ী শহরের রাস্তায় বেড়াতে পারেন এবং কেনাকাটাও সেরে নিতে পারেন


ষষ্ঠ দিন মাউন্ট আবু থেকে উদয়পুর






সকাল বেলা তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে জলখাবার খেয়ে বেলা আটটার ভেতরে বেড়িয়ে পড়ুন আজ আমরা চলেছি উদয়পুর উদয়পুরের কথা মনে হলেই সবার আগে মনে পড়ে যায় দাসী পান্নার কথা ছোট্ট উদয়কে  তার কাকা সিংহাসন লোভী বনবীরের তরবারির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যিনি তাঁর নিজের পুত্র চন্দনকে, যে বয়সে প্রায় উদয়ের সমান ছিল, তাকে বনবীরের উন্মুক্ত তরবারির সামনে বলি দিতেও পিছপা হননিমাউন্ট আবু থেকে উদয়পুর প্রায় ২০০ কিলোমিটার রাস্তা, নয় নয় করেও ঘন্টা চার থেকে সাড়ে চার তো লেগেই যাবে, সাথে রাস্তায় লাঞ্চ প্রভৃতির সময় ধরলে কম বেশী পাঁচ থেকে সাড়ে পাচ ঘন্টা লাগতেই  পারেবিকেলের আগে হোটেলে পৌঁছে বেড়িয়ে পড়ুন পিছোলা লেক দেখতেউদয়পুরের মুখ্য আকর্ষণ সিটি প্যালেসের পাশেই এই লেক মনে রাখবেন সিটি প্যালেস বিকেল পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যায় তাই লেকের শহর উদয়পুরে একটি মনোরম সন্ধ্যা কাটানোর জন্য আজ কেবল পিছোলা লেককেই বেছে নিনসুবৃহৎ এই কৃত্রিম  লেকে বোটিং করবার সুবন্দোবস্ত আছে দরাদরি করে নৌকা ভাড়া করে নেবেনএই লেকের ওপর  নৌকায় চড়ে সূর্যাস্ত দেখার কথা আপনার অনেক দিন মনে থাকবে নৌকা করে লেকের ওপর অবস্থিত জগমন্দির বেড়িয়ে নিতে পারেন মহারানা জগত সিংহের নাম অনুসারে এই প্রাসাদ কে জগত মন্দির বা জগমন্দির বলা হয়ে থাকে অসাধারণ এই লেক আপনার মন জয় করে নেবে



সপ্তম দিন উদয়পুর দর্শন


সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে জলখাবার খেয়েই বেড়িয়ে পড়ুন লেকের শহর উদয়পুরে আজ প্রথমেই দেখে নেবো ফতে সাগর লেক অতি মনোরম এই লেকটির অবস্থান এই লেকেও বোটিং করার সুবন্দোবস্ত আছে লেকের পাড়ে অজস্র আকর্ষণ, প্রায় সব সময়েই ভিড় হয়ে থাকে এই সুন্দর জায়গাটি আমোদ ও বিনোদনের অনেক উপকরণ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে 






লেক দেখা শেষ করে লেকের পাড় ধরে সামান্য একটু এগোলেই প্রতাপ স্মারক পাহাড়ের ছোট একটি টিলার ওপর অবস্থিত এই প্রতাপ স্মারক কে মোতি মগ্রি বা পার্ল হিল ও বলা  হয়ে থাকেপাহাড়ের ওপর থেকে নীচের ফতে সাগর লেকের দৃশ্য অসাধারণ এখানে তার প্রিয় ঘোড়া চেতকের পিঠের অপর বসা রণসাজে সজ্জিত মহারাণা প্রতাপের একটি  অপূর্ব ব্রোঞ্জের মূর্তি রয়েছে এখানকার যাদুঘরে রাণা প্রতাপ ও তাঁর পার্ষদদের সম্পর্কে এবং হলদিঘাটি যুদ্ধ সম্পর্কিত অনেক মূল্যবান তথ্যাদি সযত্নে রক্ষিত রয়েছে প্রতাপ স্মারক দেখে এবার চলুন সহেলীয়োঁ কি বাড়ি দেখতে মহারাণা উদয় সিংহের বাবা মহারাণা সংগ্রাম সিংহ তাঁর মহিষীর এবং মহিষীর আটচল্লিশ জন দাসীর একান্তে নিভৃত আলাপচারিতার জন্য শুষ্ক রাজস্থানের এই জায়গায় গাছপালা এবং সবুজে ঘেরা এই অতি মনোরম উদ্যানটি তৈরি করিয়েছিলেন এই উদ্যানের নকশা প্রস্তুত করেছিলেন স্বয়ং মহারাণা অপূর্ব এই প্রমোদ উদ্যান্টি উদয়পুর শহরের অন্যতম একটি দ্রষ্টব্য 






এখান থেকে সোজা আমরা যাব উদয়পুরের মূখ্য আকর্ষণ সিটি প্যালেস দেখতে মনে রাখবেন সিটি প্যালেস দেখতে অনেকটা সময় লাগবেতাই তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে সমস্ত প্যালেসটা ঘুরে দেখুন অসাধারণ এই প্যালেস থেকে সন্নিহিত পিছোলা লেকের দৃশ্য অতুলনীয় আজকাল এই প্যালেসের টিকিট ইন্টারনেট মারফতেও কাটা যাচ্ছে, এছাড়া এখানের লাইট এন্ড সাউন্ডের টিকিটও আগে থেকে তারিখ এবং শোয়ের সময় দেখে নিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আগে থেকেই কেটে নেওয়া যাছেস্কুল এবং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছাড় সমেত টিকিটের মূল্য দিয়ে ইন্টারনেটে টিকিট কাটতে পারবেন, সেক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল বা কলেজের পরিচয় পত্র সঙ্গে থাকা টা বাধ্যতা মুলকযদিও এ বিষয়ের বিস্তারিত খবর সংগ্রহ করে তারপরে টিকিট কাটবেন প্যালেস দেখা শেষ করে এবার ফিরে আসুন হোটেলে 






এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, উদয়পুর থেকে রাজপুতানার আরো বেশ কিছু বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে নেওয়া যেতে পারে, অবশ্যই যদি আপনাদের হাতে সময় থাকে তা হলেই যেমন উদয়পুর থেকে একদিন সারাদিনের জন্য বেড়িয়ে আসুন, নাথোয়ারা, একলিঙ্গি মহাদেব এবং হলদিঘাটি আর এক দিন যেতে পারেন রনকপুর এবং কুম্ভলগড় 
 


অষ্টম দিন উদয়পুর থেকে চিতোর 

 





উদয়পুর থেকে চিতোর প্রায় দেড়শো কিলোমিটার রাস্তা ঘন্টা তিনেকের ভেতরেই পৌছে যাওয়া যায় তবুও তাড়াতাড়ি জলখাবার খেয়েই বেড়িয়ে পড়া ভালো সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার ভেতরে বেড়িয়ে সোজা চলুন চিতোর দর্শন করতেচিতোর দর্শনেও ওখানকার স্থানীয় গাড়ি নিতে হবে আপনাকে এটাই নিয়ম আপনার গাড়ি থাকবে অটো স্ট্যান্ডে এখানকার অটোওয়ালারাই আপনার গাইডের কাজ করবেন এরা প্রত্যেকেই নিখুঁত ভাবে প্রতিটি স্থান, তার ইতিহাস সহ আপনাকে বুঝিয়ে দেবেন দরাদরি করে নিয়ে গাড়িতে বসবেন চিতোর দুর্গের মূল প্রবেশে পথের সামনে টিকিট নিয়ে সমস্ত দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যাবে,  গাড়িওয়ালাই টিকিট নিয়ে আসবেন, আপনি কেবল টিকিটের মূল্য ধরে দিলেই চলবে মোটামুটি ঘন্টা দুই আড়াইয়ের ভেতর চিতোরের মূল দ্রষ্টব্য গুলি দেখা হয়ে যায়






অবশ্যই দেখবেন ভারতের তথা রাজপুতানার ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা চিতোর দুর্গের ভগ্নাবশেষ, দেখবেন কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে থাকা মীরাবাঈয়ের মন্দির, দেখবেন রানী পদ্মিনীর প্রাসাদ, দেখবেন পদ্মাবতীর প্রাসাদ, দেখবেন বিজয় স্তম্ভ এবং কীর্তি স্তম্ভ, কালী মাতার মন্দির, ফতে প্রকাশ প্যালেস, গোমুখ রিজার্ভার, সতীশ দেওড়ার মন্দির, এবং রাণা কুম্ভের প্রাসাদটি সমস্তটাই প্রায় ভগ্নস্তুপ, তবুও আমাদের নিজেদের কাহিনী, আমাদের গরবের কাহিনী, যা গল্প নয়, সত্যি সত্যি দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে হার না মানা সব বীরেদের কাহিনী, তাই এই প্রায় ভগ্ন প্রাচীন ইতিহাসকে হাত দিয়ে ছুঁলেও শিহরন জাগে রোমকুপের ভেতর 






এই মাটি প্রতিটি ভারতবাসীর কাছে আগুনের স্বপ্নের মতো সেই সব দিন গুলোকে কাছে নিয়ে আসে যেন তাই চিতোর বেড়াতে এলেই আনন্দ হয়, এ যেন নিজের ইতিহাসকে খুজে পাওয়া আমাদেরচিতোর দর্শন শেষে এবার চলুন হোটেলে






আজ রাতটা আমরা চিতোরেই কাটাবো যদিও অনেকে চিতোরে না থেকে চিতোর বেড়িয়ে নিয়ে সোজা পুষ্কর চলে যানসেক্ষেত্রে পুস্কর পৌছতে রাত হয়ে যাবেআপনি চাইলে তাও করতে পারেন, তবে আমার মতে একটা রাত চিতোরে থাকলে ভালোই লাগবে শরীরের ধকলও কিছুটা কম হবে
          

নবম দিন চিতোর থেকে পুষ্কর 

 





যথারীতি সকাল সকাল তৈরি হয়ে জলখাবার খেয়েই বেড়িয়ে পড়ুন আজ আমরা যাব ভারতের অত্যন্ত পূন্য দুটি তীর্থ ভূমি, পুস্কর ও আজমীঢ় দর্শন করতে এটি প্রায় একটি যমজ শহরের মতো পুস্কর আসতে হলে বিখ্যাত মুস্লিম তীর্থ আজমীঢ় হয়েই আসতে হয়আজমীঢ়ে রয়েছে বিখ্যাত আজমীঢ় শরীফ দরগা আমাদের দেশের একমাত্র ব্রহ্মা মন্দিরটিও রয়েছে এই  পুস্করেই হিন্দু ভারতীয়দের বিশ্বাস যে পিতৃ পিতামহের পারলৌকিক ক্রিয়া তথা তর্পণ ইত্যাদি এই পুস্করের সরোবরের তীরে সম্পন্ন হলে মহা পূন্য ফল লাভ হয়ে থাকে, তাই সারা বছর পূন্যার্থী ভক্তকুলের সমাবেশে মুখর হয়ে থাকে এই পূন্য ভূমি






এছাড়াও প্রতি বছর হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্ত্তিক মাসে বা ইংরাজি ক্যালেন্ডারের নভেম্বর মাসে, সপ্তাহকাল ব্যাপী এক সুব্রিহত মেলা এই পুস্করে অনুষ্ঠিত হয় দূরদূরান্ত থেকে আগত প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে এই বিখ্যাত মেলা সেই সময় গমগম করেভারতের নানা প্রান্তের এবং রাজস্থানের অন্যান্য  জায়গাগুলির জন্য উট কেনাবেচা করা হয় এই মেলায়, সাথে চলে সাতদিন ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রচুর বিদেশী  পর্যটক এই মেলা দেখবার জন্য সেইসময় এই পুস্করে আসেন এক কথায় পুস্কর একটি অসাধারণ জায়গা২০২০ সালে এই মেলা শুরু হবে ২২শে নভেম্বর এবং শেষ হবে ৩০শে নভেম্বর চিতোর থেকে পুস্কর প্রায় ২৫০ কিলোমিটার রাস্তা, গাড়ীতে যেতে কমবেশি ঘন্টা পাঁচেক সময় লাগবে দুপুর দুপুর আজমীঢ়ে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়বে এক অসামান্য হ্রদ, যা আনা সাগর লেক নামে খ্যাত পৃথ্বীরাজ চৌহানের পিতামহ অরুনোরাজ চৌহান, যার ডাকনাম ছিল আনা, দ্বাদশ শতাব্দীতে তিনিই তৈরি করিয়ে ছিলেন এই অসাধারন কৃত্রিম হ্রদটিরআম্রা যেহেতু দুপুরে পৌঁছব তাই প্রথমেই এখানে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে নিতে পারেন আজমীঢ় বেড়ানোর জন্য আপনাকে এইখান থেকেই গাড়ি বা অটো ভাড়া করতে হবে পয়েন্ট অনুযায়ী মাথাপিছু ভাড়া ঠিক হয় যে চালক গাড়িতে নিয়ে যাবেন, অতি অবশ্যই তার মোবাইল নম্বর নিয়ে নেবেন, কারন গলি রাস্তায় এতো ঠেলাঠেলি ভিড় আর গাড়ির উৎপাত সেখানে আপনার ভাড়া করা গাড়িটি খুজে পেতে বেশ অসুবিধে হতে পারে আজমীঢ়ের মুখ্য আকর্ষণ দরগা, অনেক ভক্তরা এখানে চাদর চড়ান আরেকটি কথা, আজমীঢ়ে অন্য গাড়ি নিয়ে বেড়াতে যাবার সময় অবশ্যই আপনার নিজস্ব দরকারী জিনিষপত্র যেমন মোবাইল ফোন, টাকার ব্যাগ প্রভৃতি সাবধানে সামলে রাখবেনআজমীঢ়ে দেখুন দরগা, আনা সাগর লেক, আড়াই দিন কা ঝোপড়া, আকবর প্যালেস, দুর্গা বাগ, পৃথ্বীরাজ স্মারক স্থল  এবং ক্লক টাওয়ার মোটামুটি ঘন্টা দুই থেকে আড়াই  সময় লাগবে এগুলো দেখতে, যদিও সেটা  নির্ভর করছে আপনার নিজের ওপর এরপর চলুন পুস্করপাহাড়ী ঘাটী পথের সামান্য চড়াইতে রাস্তার ওপরে দেখে নিন মহারাণা প্রতাপ স্ট্যাচু এবং পুস্কর ঘাটী ভিউ পয়েন্ট এখান থেকে নিচের দৃশ্য খুব সুন্দর সন্ধ্যেবেলা পুস্করে হোটেলে পৌছে আজকের মতো বিশ্রামআগামীকাল আমরা পুস্কর দেখে জয়পুর যাব

দশম দিন পুস্কর দর্শন 

 





ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র এই পুস্কর প্রায় সারা বছর তাই পুস্করে তীর্থযাত্রী ও পূন্যার্থী ভক্তদের ভিড় লেগেই রয়েছে ভগবানের কাছে পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তি কামনায় পুস্কর সরোবরের পূন্য জলে তর্পণ ও পারলৌকিক ক্রিয়াদি করবার উদ্দ্যেশ্য নিয়ে ভক্তরা পুস্করে সমবেত হয়ে থাকেন অসঙ্খ্য মন্দির বেষ্টিত এই স্থানে তাই দেখবার বলতে মুখ্যতঃ মন্দিরপ্রাচীন পদ্মপুরাণ অনুসারে ভগবান ব্রহ্মা একসময় খবর পেলেন যে দৈত্য বজ্রনাভ তাঁর মর্ত্যের সন্তানদের ওপর ভয়ানক অত্যাচার চালাচ্ছে ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রহ্মা তাঁর হাতের কমল পুষ্পটিকে ছুঁড়ে মারলেন দৈত্য বজ্রনাভের উদ্দ্যেশেওই পুষ্পের আঘাতেই দৈত্য বজ্রনাভের দর্পমুক্তি ঘটলোফুলটি ছোঁড়ার সময় তাথেকে পাপড়ি খসে যে জায়গায় পড়েছিল সেইখানে একটি সরোবরের সৃষ্টি হয় ভগবান ব্রহ্মার কর পুষ্প পতিত হয়ে উৎপন্ন হওয়া এই সরোবরটিকে সেই জন্য পুষ্প কর বা পুষ্কর  নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে এই ব্রহ্মা মন্দির অনেক প্রাচীন কথিত আছে ভগবান ব্রহ্মা দৈত্য বজ্রনাভকে বধ করার পরে এই সরোবরের তীরে এক বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করেন এই যজ্ঞের পরে ভগবান ব্রহ্মার আদেশে ঋষি বিশ্বামিত্র এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেনইতিহাস আরো বলছে যে এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন অষ্টম শতকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈদান্তিক সাধক আদি শঙ্করাচার্য্যচতুর্দশ শতকেও স্থানীয় রাজারা এই মন্দিরের সংস্কার সাধন করেছিলেন কেবল মাত্র পুষ্করকে ঘিরেই ছোট বড়ো প্রায় ৫০০ মন্দির রয়েছে, যেগুলির বেশীরভাগই বর্তমানে ভগ্নস্তুপে পরিণত হয়েছে





আজ খুব সকালে তৈরি হয়ে নিয়ে প্রথমেই চলুন পুস্কর সরোবর বা পুস্কর লেক দেখতে হ্রদের তীরে পুজারচনা এবং তর্পণাদি যদি করতে চান তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করে চলুন ব্রহ্মার মন্দির দেখতে এই মন্দিরে পুজার ডালা নিয়ে বাইরে থেকে সন্ন্যাসী পূজারী অথবা সেবকের হাতে দিয়ে দিন কথিত আছে যে পত্নী সাবিত্রীর অভিশাপে কোনো গৃহী ব্রহ্মার পূজা করতে পারবেনা সেই জন্য কেবল মাত্র সন্ন্যাসীরাই সরাসরি কেবল মাত্র এই পুস্করেই ভগবান ব্রহ্মার পুজা করে থাকেনমন্দিরের বাইরে গলি রাস্তায় অসংখ্য ছোট বড়ো দোকান কেনাকাটার অনেক রকমারি আয়োজন এখানে সাথে আছে প্রচুর খাবারের দোকান এখানেই জলখাবার পর্ব মিটিয়ে এবার  চলুন পাহাড়ের ওপর সাবিত্রী মায়ের মন্দির দরশন করতে এই মন্দির  পরিসর থেকে আশেপাশের দৃশ্যাবলী অতীব মনোরম সাবিত্রী মন্দিরের পর বরাহ মন্দির এবং রঙ্গাজীর  মন্দির দর্শন  করে এবার হোটেলে ফিরে এসে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে মালপত্র সমেত বেড়িয়ে পড়ুন জয়পুরের উদ্দ্যেশেপুস্কর থেকে জয় পুর কমবেশি প্রায় ১৭০ কিলোমিটার রাস্তা পুরোটাই প্রায় জাতীয় সড়ক চমৎকার রাস্তা তবুও আজকাল মাঝে মধ্যেই বেশ জ্যাম হয় তবুও আশা করা যায় নেহাৎ কোনো অঘটন না ঘটলে আমরা চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টার ভেতরেই জয়পুর পৌঁছে যাবরাজধানী শহর জয়পুরে সারাদিন রাত্তিরে বিভিন্ন প্রকার নো এন্ট্রীর সমস্যা থাকেই সব সমস্যা শেষ করে আমাদের জয়পুর পৌছতে আজ রাত্তির হয়ে গেলেও অসুবিধে নেই  আজ আমরা জয়পুর শহরে রাত্রিবাস করবো মোটামুটি আজ কিছু আর দেখার  নেই তাই জয়পুরে হোটেলে পৌঁছে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ুন কাল সকালে আমাদের জয়পুর ভ্রমন শুরু হবে শুভরাত্রি


একাদশ দিন জয়পুর দর্শন






তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে জলখাবার খেয়েই বেড়িয়ে পড়ুনজয়পুরে খুব যানজটের সমস্যা আছে মনে  রাখবেনসবার প্রথমে দেখে নিন বিড়লা মন্দির শান্ত মনোরম পরিবেশে শ্বেত পাথরর এই অসাধারণ মন্দিরটি আপনাদের ভালো লাগবে এখান থেকে চলুন জয়পুরের অন্যতম ল্যান্ডমার্ক হাওয়া মহল দেখতে এটা এখন সরকারি অফিস হয়েছে যদিও কিছুটা অংশ পর্যটকদের উদ্দ্যেশে খোলা আছে এখনো তবে সমস্যা এই যে এখানে গাড়ী দাঁড় করানোর কোনো জায়গা নেই, পুলিশ কোনো গাড়ীকেই এখানে দাঁড়াতেও দেয় না, তাই বড় গাড়ীতে বা কন্ডাক্টেড ট্যুরে এলে গাড়ীর গতি কমিয়ে চট জলদি ছবি তোলা যেতে পারে আপনি যদি অটো নিয়ে আসেন এবং এখানে অটো ছেড়ে দেন, তাহলেই মনের মতো করে হাওয়া মহল ঘুরে দেখতে পারবেন 





হাওয়া মহল দেখে এবার চলুন জয়পুরের অন্যতম আকর্ষণ জলমহল দেখতেজল মহল রাস্তার ওপরেই পার্কিংয়ে গাড়ী রেখে দেখে নিতে হয় বিরাট একটি সরোবরের মাঝে এক অতীব মনোরম প্রাসাদ এই জল মহল রাস্তার একধারে ভিড় করে দোকান বসেছে এখানেওখুব সুন্দর এখানকার পরিবেশজল মহল দেখে এবার চলুন জয়পুরের মুখ্য আকর্ষণ অম্বর দুর্গ বা আমের ফোর্ট দেখতে অম্বর দুর্গের পার্কিং লটে গাড়ী রেখে এখান থেকে আপনাকে জীপ ভাড়া করে তারপর দুর্গে যেতে হবে পার্কিং থেকে অনেক খানি ওপরে এই দুর্গের অবস্থান, তাই গাড়ী ভাড়া করা একরকম বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে আর একটা কথা, সুবিশাল এই দুর্গ ঠিকমতো ঘুরে দেখবার জন্য সঙ্গে একজন অভিজ্ঞ গাইড থাকাটাও খুবই জরুরী এই গাড়ী ওয়ালারাই গাইডের ব্যবস্থা করে দেন গাড়ী এবং গাইডের ভাড়া নিয়ে আগে থেকেই ভালোভাবে কথা বলে সব ঠিক করে নেবেন এতো বড়ো প্রাসাদ ঘুরে দেখতে সময়ও লাগে প্রায় ঘন্টা দেড়েক অপূর্ব এই প্রাসাদ আপনার মন কেড়ে নেবে অচিরেই 






আরো দুটি দুর্গ রয়েছে জয়পুরে, যেমন নাহারগড় দুর্গ এবং জয়গড় দুর্গ জয়গড় দুর্গের বেশ কিছু অংশ ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘিরে রেখেছে তাদের কাজের জন্যপ্রধানত অস্ত্রাগার হিসেবেই এই দুর্গ একসময় ব্যবহার করা হতো নাহারগড় দুর্গটিও খুব সুন্দর এবং খুব সুন্দর এর অবস্থানটিও স্থানীয় লোকজন মুলত েই জায়গাটিকে পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহার করতেই ভালোবাসে আমার মতে অম্বর দুর্গ বেড়িয়ে সোজা চলুন পারকিংয়ে ফিরে মনে রাখবেন গাড়ী অয়ালারা আপনাকে বারবার অনুরোধ করবে বিভিন্ন দোকানে নিয়ে গিয়ে শাড়ী প্রভ্রিতি কেনার জন্য, এতে আপনার সময়ের টানাটানি হতে পারে, কারন এখনো অনেক কিছু দেখার বাকি রয়ে গেছে, তাই সোজা পারকিংয়ে রাখা  গাড়ীর কাছে ফিরে গিয়ে পরের দ্রষ্টব্য সিটি প্যালেস দেখতে চলুন জয়পুরের অন্যতম আকর্ষণ এই সিটি প্যালেস রাজপুতানার ইতিহাসের অনেক পাতা খুলে যাবে সিটি প্যালেসে প্রবেশের সাথে সাথে ভালো করে ঘুরে দেখতে প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় লাগবে সিটি প্যালেসের ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে রাজা জয় সিংহের  তৈরি বিখ্যাত যন্তর মন্তর রাজা জয় সিংহ ছিলেন অতীব বিদ্বানআকাশের গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে সে যুগে সূক্ষাতিসুক্ষ ভাবে  অসাধারণ গবেষণা করে গেছেন এই জ্যোতির্বিদ মহারাজা দিল্লীর যন্তর মন্তর ও তারই অবদান এই অঞ্চলে কেনাকাটার অনেক জায়গা আচে যন্তর মন্তর দেখে এখানেই কোথাও দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে জয়পুরের মার্কেটিং সেরে নিতে পারেন এবার ফিরে আসুন হোটেলে আজ আমাদের রাজস্থান ভ্রমনের শেষ দিন শেষতম দিনটি সন্ধ্যাবেলায় সকলের সঙ্গে খুব আনন্দে উপভোগ করুন


দ্বাদশ দিন আপনার সূচী অনুসারে রেল স্টেশন অথবা বিমান বন্দর থেকে ফিরতি যাত্রা


আজ ঘরে ফেরার দিন আপনার ট্রেন অথবা প্লেনের সময় অনুযায়ী গাড়ীকে বলে রাখুন আপনাকে রেল স্টেশন অথবা বিমাম বন্দরে নামিয়ে আসার জন্যসেই অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে বেরোবেন মনে রাখবেন, এই শহরে যানজটের সমস্যা রয়েছে, তাই হাতে সময় নিয়ে বেরোনোই ভালো


আশাকরি আমার সাথে বেড়াতে আপনাদের খারাপ লাগেনি যদি আপনাদের কোনো প্রশ্ন থাকে এই বিষয়ে তাহলে অতি অবশ্যই আমাকে ব্লগে লিখে জানাবেন চেষ্টা করবো দ্রুত আপনাদের প্রশের উত্তর দিতে সকলে ভালো থাকবেন ধন্যবাদ      


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ