রেশম পথের কোলে কোলে, পর্ব - ২

সিলেরিগাঁও অধুনা ভ্রমণ পিপাসুদের অভিধানে একটি অতি জনপ্রিয় নাম। পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিমের সীমান্তবর্তী ছোট্ট একটু পাহাড়ী গ্রাম। মানুষজন বড়ো ভালো এই গ্রামের। খুব সরল আর আন্তরিক। আমাদের এই ভ্রমন পথের প্রায় সম্পূর্ণ অংশে কোন তথাকথিত হোটেল নেই। সব ‘হোম স্টে’। হোম স্টে হচ্ছে হোটেলের পরিবর্তে স্থানীয় মানুষজনের বাড়ীতে তাদের অতিথি হয়ে একাসনে বাস করার আরেক নাম। পরিপাটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এবং খাওয়া। বাড়ীর বউটি সন্ধ্যেবেলা উনুন জ্বালিয়ে মেয়েকে পড়াতে পড়াতে দিব্যি রুটি সেঁকছে, আবার বেড়াতে আসা সদ্য বিবাহিতা তরুনী বধুটির সাথে হাসি মস্করাও করছে। সকাল্ বেলা ফিটফাট স্কুলের ড্রেসে মেয়েকে তৈরি করে বাড়ীর বড়ো ছেলেটি স্কুলে পৌঁছতে চলেছে, যেতে যেতে একটু ওপরে বয়স্কা মাসীর শারীরিক কুশলাদি এবং খবরাখবর নিয়ে নিচ্ছে। বেশ একটা নিজের বাড়ী, নিজের পাড়া, নিজের দেশ, নিজের লোকজন বলে মনে হয়। মন ভালো হয়ে যায়। সিলেরীর আশেপাশে এই রকম আরো কয়েকটি ছোট ছোট গ্রামেও ঠিক একই রকমের আতিথেয়তার ব্যবস্থা আছে। যেমন ইচ্ছে গাঁও, রামধুরা প্রভৃতি। তবে সিলেরীগাঁও থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ সবচেয়ে মধুর।
ভাত, ডাল, ভাজা, সব্জী, ডিমের ঝোল, এবং টম্যাটোর চাটনি সহযোগে দুপুরের আহার পর্ব শেষ করতে না করতেই কখন যেন ঝুপ করে কুয়াশা জড়ানো মন কেমন করা এক বিকেল নেমে এলো।বাইরে বেড়িয়ে দেখি শেষ বিকেলের আবছা আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখের ওপর এক মায়াময় মেঘের প্রলেপ, কিছুটা দৃশ্যমান, বেশীরভাগটাই স্বপ্নময় আবরনের ভেতর। আসন্ন সন্ধ্যার এই মোহময় মধুর বিষন্নতায় আপাদমস্তক স্নান করে ঘরে ফিরে এলাম। গরম গরম পকৌড়া আর কফি সহযোগে সন্ধ্যেটা ভালোই কাটলো। বেশ ঠাণ্ডা এখানে। রাতের আহার পর্ব মোটামুটি রাত ন’টার ভেতর শেষ করেই পরিপাটি বিছানায় কম্বলের আলিঙ্গনে ঢুকে পড়া গেলো। সারা দিনের পথশ্রমের কারনে আপনা হতেই ঘুমিয়ে পড়েছি কখন জানিনা। ঘুম ভাঙল অতি প্রত্যুষে পাশের ঘর থেকে দাদার ঘন ঘন হাঁক ডাকে। তাড়াতাড়ি মাথায় হনুমান টুপি চাপিয়ে বিছানার কম্বলটাকেই গায়ে জড়িয়ে বাইরে এলাম। দলের বেশ কয়েকজন তখন উঠে পড়েছে। বাইরে তখনো বেশ ঘন অন্ধকার। পূর্ব দিগন্তে তখনো অরুণালোকের বিন্দুমাত্র আভাস নেই। সামনের মাঠে তখনি বেশ কয়েকজন অতি উৎসাহী ফটো শিকারী পৌঁছে গিয়েছেন। রাত্রের শেষ বিন্দুতে ঘুম জড়ানো সেই মোহময়ী আবছা ভোরবেলা, কনকনে ঠাণ্ডায় হিমে ভেজা নরম মাটি কি এক অপূর্ব মাদকতাময় গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। আপনা থেকেই দু হাত প্রসারিত করে মুহুর্মুহু সেই নির্মল বাতাসের ঘ্রান বুক ভরে নিতে নিতে মনে হল সমস্ত ক্লেশ, সমস্ত কলুষ যেন ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে অপার্থিব অনন্তের ধারাপাত ঘটে চলেছে বুকের মধ্যে। কেবল আমি এক চির অর্বাচীন, না পারলাম তার তালটি ধরতে, না পারলাম সেই মোহন বীনার সুরে সুর মেলাতে।
সম্বিত ফিরলো দলের এক দাদার ডাকে। আপাদমস্তক গরম পোষাকে ঢাকা, দুই হাতে দস্তানা জড়ানো, মাঙ্কি টুপির ভেতর থেকে কেবল গোঁফ আর চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে, ঢাউস এক ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে তিনি তখনি অসংখ্য ছবি তুলে ফেলেছেন। পশ্চিম দিগন্ত একটু একটু করে ততক্ষনে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ। গাঢ় সবুজ ঘন গাছপালার পাতা বেয়ে টুপ টুপ করে গড়িয়ে পড়ছে সারা রাতের জমানো হিমেল শিশির বিন্দু, তার ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে আবছা আবরন সরিয়ে তিনি প্রকাশিত হচ্ছেন। শ্বেত শুভ্র মুকুট, দুই ধারে গড়িয়ে নেমে এসেছে তার শ্বেত শুভ্র আভরণ। তিনি মহামহিম হিমালয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান কাঞ্চনজঙ্ঘা। মুগ্ধ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার ক্রম পরিস্ফুট রুপ রাশি একটু একটু করে দুচোখ ভরে দর্শন করতে লাগলাম।

ইতিমধ্যে পূর্ব দিগন্তে লালিমাভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ রাশিতে ছিটিয়ে পড়েছে হাল্কা লাল রঙ, ঠিক লাল নয়, একটু যেন গৈরিক বর্ণ। শুরুর সময় হয়তো বা এই রকমই ত্যাগ আর তিতিক্ষার স্বপ্নে জাগরুক থাকে সব কিছু। যত সময় এগোয় ততই তীব্র থেকে আরো তীব্র, খর থেকে খরতর হয়ে ওঠে সে। জীবন মধ্যাহ্নের দুর্বিষহ দাহনে দগ্ধ হতে হতে সায়াহ্নে টুপ করে খসে পড়ে যায়। আপাততঃ প্রভাতের এই নিস্পাপ সারল্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। পুব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ছে এই অনন্ত আনন্দের রশ্মি রেখা। তুষার মৌলী কাঞ্চনজঙ্ঘার উষ্ণীষে লেগেছে তার রক্তাল্পনা। মুগ্ধ বিস্ময়ে আমরা কয়েকজন নির্বাক নিস্পন্দ হয়ে তাকিয়ে আছি। ঘন ঘন ক্যামেরার শাটারের শব্দ কেবল কানে আসছে।
দেখতে দেখতে সকাল ছটা বেজে গেলো। চায়ের কেটলি হাতে একটি মেয়ে, তার সঙ্গে এই বাড়ীর সর্ব কনিষ্ঠ সদস্যটিও, একটা ট্রে তে বিস্কুট সাজিয়ে হাজির। ভারী মিস্টি আর মজার এই মেয়েটি। কাল থেকে দেখছি অক্লান্ত ভাবে কাজ করে চলেছে, তবে নিশ্চুপে নয়। সর্বদা গান গেয়ে চলেছে, আর কি মিস্টি সুরেলা গলা, যেমন সুর জ্ঞান তেমনই তাল এবং লয়ের জ্ঞান। জনপ্রিয় পুরনো হিন্দি গানই গাইছে বেশি, মাঝে মাঝে নিজের দেশীয় গানও গাইতে শুনলাম। গান ছাড়া মনে হয় মেয়েটা থাকতেই পারেনা। হয়তো জীবনের অনেক অপূর্ণতা, শোক – দুঃখ সব কিছু এই ভাবেই ঢাকা হয়ে আছে ওর সুরের জগতের আকাশ জুড়ে।
চলবে ........................................................................................................................

সিলেরিগাঁও অধুনা ভ্রমণ পিপাসুদের অভিধানে একটি অতি জনপ্রিয় নাম। পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিমের সীমান্তবর্তী ছোট্ট একটু পাহাড়ী গ্রাম। মানুষজন বড়ো ভালো এই গ্রামের। খুব সরল আর আন্তরিক। আমাদের এই ভ্রমন পথের প্রায় সম্পূর্ণ অংশে কোন তথাকথিত হোটেল নেই। সব ‘হোম স্টে’। হোম স্টে হচ্ছে হোটেলের পরিবর্তে স্থানীয় মানুষজনের বাড়ীতে তাদের অতিথি হয়ে একাসনে বাস করার আরেক নাম। পরিপাটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এবং খাওয়া। বাড়ীর বউটি সন্ধ্যেবেলা উনুন জ্বালিয়ে মেয়েকে পড়াতে পড়াতে দিব্যি রুটি সেঁকছে, আবার বেড়াতে আসা সদ্য বিবাহিতা তরুনী বধুটির সাথে হাসি মস্করাও করছে। সকাল্ বেলা ফিটফাট স্কুলের ড্রেসে মেয়েকে তৈরি করে বাড়ীর বড়ো ছেলেটি স্কুলে পৌঁছতে চলেছে, যেতে যেতে একটু ওপরে বয়স্কা মাসীর শারীরিক কুশলাদি এবং খবরাখবর নিয়ে নিচ্ছে। বেশ একটা নিজের বাড়ী, নিজের পাড়া, নিজের দেশ, নিজের লোকজন বলে মনে হয়। মন ভালো হয়ে যায়। সিলেরীর আশেপাশে এই রকম আরো কয়েকটি ছোট ছোট গ্রামেও ঠিক একই রকমের আতিথেয়তার ব্যবস্থা আছে। যেমন ইচ্ছে গাঁও, রামধুরা প্রভৃতি। তবে সিলেরীগাঁও থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ সবচেয়ে মধুর।
ভাত, ডাল, ভাজা, সব্জী, ডিমের ঝোল, এবং টম্যাটোর চাটনি সহযোগে দুপুরের আহার পর্ব শেষ করতে না করতেই কখন যেন ঝুপ করে কুয়াশা জড়ানো মন কেমন করা এক বিকেল নেমে এলো।বাইরে বেড়িয়ে দেখি শেষ বিকেলের আবছা আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখের ওপর এক মায়াময় মেঘের প্রলেপ, কিছুটা দৃশ্যমান, বেশীরভাগটাই স্বপ্নময় আবরনের ভেতর। আসন্ন সন্ধ্যার এই মোহময় মধুর বিষন্নতায় আপাদমস্তক স্নান করে ঘরে ফিরে এলাম। গরম গরম পকৌড়া আর কফি সহযোগে সন্ধ্যেটা ভালোই কাটলো। বেশ ঠাণ্ডা এখানে। রাতের আহার পর্ব মোটামুটি রাত ন’টার ভেতর শেষ করেই পরিপাটি বিছানায় কম্বলের আলিঙ্গনে ঢুকে পড়া গেলো। সারা দিনের পথশ্রমের কারনে আপনা হতেই ঘুমিয়ে পড়েছি কখন জানিনা। ঘুম ভাঙল অতি প্রত্যুষে পাশের ঘর থেকে দাদার ঘন ঘন হাঁক ডাকে। তাড়াতাড়ি মাথায় হনুমান টুপি চাপিয়ে বিছানার কম্বলটাকেই গায়ে জড়িয়ে বাইরে এলাম। দলের বেশ কয়েকজন তখন উঠে পড়েছে। বাইরে তখনো বেশ ঘন অন্ধকার। পূর্ব দিগন্তে তখনো অরুণালোকের বিন্দুমাত্র আভাস নেই। সামনের মাঠে তখনি বেশ কয়েকজন অতি উৎসাহী ফটো শিকারী পৌঁছে গিয়েছেন। রাত্রের শেষ বিন্দুতে ঘুম জড়ানো সেই মোহময়ী আবছা ভোরবেলা, কনকনে ঠাণ্ডায় হিমে ভেজা নরম মাটি কি এক অপূর্ব মাদকতাময় গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। আপনা থেকেই দু হাত প্রসারিত করে মুহুর্মুহু সেই নির্মল বাতাসের ঘ্রান বুক ভরে নিতে নিতে মনে হল সমস্ত ক্লেশ, সমস্ত কলুষ যেন ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে অপার্থিব অনন্তের ধারাপাত ঘটে চলেছে বুকের মধ্যে। কেবল আমি এক চির অর্বাচীন, না পারলাম তার তালটি ধরতে, না পারলাম সেই মোহন বীনার সুরে সুর মেলাতে।
সম্বিত ফিরলো দলের এক দাদার ডাকে। আপাদমস্তক গরম পোষাকে ঢাকা, দুই হাতে দস্তানা জড়ানো, মাঙ্কি টুপির ভেতর থেকে কেবল গোঁফ আর চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে, ঢাউস এক ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে তিনি তখনি অসংখ্য ছবি তুলে ফেলেছেন। পশ্চিম দিগন্ত একটু একটু করে ততক্ষনে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ। গাঢ় সবুজ ঘন গাছপালার পাতা বেয়ে টুপ টুপ করে গড়িয়ে পড়ছে সারা রাতের জমানো হিমেল শিশির বিন্দু, তার ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে আবছা আবরন সরিয়ে তিনি প্রকাশিত হচ্ছেন। শ্বেত শুভ্র মুকুট, দুই ধারে গড়িয়ে নেমে এসেছে তার শ্বেত শুভ্র আভরণ। তিনি মহামহিম হিমালয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান কাঞ্চনজঙ্ঘা। মুগ্ধ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার ক্রম পরিস্ফুট রুপ রাশি একটু একটু করে দুচোখ ভরে দর্শন করতে লাগলাম।

ইতিমধ্যে পূর্ব দিগন্তে লালিমাভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ রাশিতে ছিটিয়ে পড়েছে হাল্কা লাল রঙ, ঠিক লাল নয়, একটু যেন গৈরিক বর্ণ। শুরুর সময় হয়তো বা এই রকমই ত্যাগ আর তিতিক্ষার স্বপ্নে জাগরুক থাকে সব কিছু। যত সময় এগোয় ততই তীব্র থেকে আরো তীব্র, খর থেকে খরতর হয়ে ওঠে সে। জীবন মধ্যাহ্নের দুর্বিষহ দাহনে দগ্ধ হতে হতে সায়াহ্নে টুপ করে খসে পড়ে যায়। আপাততঃ প্রভাতের এই নিস্পাপ সারল্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। পুব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ছে এই অনন্ত আনন্দের রশ্মি রেখা। তুষার মৌলী কাঞ্চনজঙ্ঘার উষ্ণীষে লেগেছে তার রক্তাল্পনা। মুগ্ধ বিস্ময়ে আমরা কয়েকজন নির্বাক নিস্পন্দ হয়ে তাকিয়ে আছি। ঘন ঘন ক্যামেরার শাটারের শব্দ কেবল কানে আসছে।
দেখতে দেখতে সকাল ছটা বেজে গেলো। চায়ের কেটলি হাতে একটি মেয়ে, তার সঙ্গে এই বাড়ীর সর্ব কনিষ্ঠ সদস্যটিও, একটা ট্রে তে বিস্কুট সাজিয়ে হাজির। ভারী মিস্টি আর মজার এই মেয়েটি। কাল থেকে দেখছি অক্লান্ত ভাবে কাজ করে চলেছে, তবে নিশ্চুপে নয়। সর্বদা গান গেয়ে চলেছে, আর কি মিস্টি সুরেলা গলা, যেমন সুর জ্ঞান তেমনই তাল এবং লয়ের জ্ঞান। জনপ্রিয় পুরনো হিন্দি গানই গাইছে বেশি, মাঝে মাঝে নিজের দেশীয় গানও গাইতে শুনলাম। গান ছাড়া মনে হয় মেয়েটা থাকতেই পারেনা। হয়তো জীবনের অনেক অপূর্ণতা, শোক – দুঃখ সব কিছু এই ভাবেই ঢাকা হয়ে আছে ওর সুরের জগতের আকাশ জুড়ে।




0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.