করোনা ভাইরাস এবং কিছু বিভ্রান্তি।


যত
দিন যাচ্ছে এক ঘোরতর অনিশ্চিত অবিশ্বাসের আবহাওয়া যেন চেপে বসছে আমাদের বুকের ওপর। আর হবে নাই বা কেন? ভালোবেসে, যাদের বিশ্বাস করে, যাদের সমস্ত কথাকে মান্যতা দিয়ে, এতোদিন বেদবাক্য
হিসেবে গ্রহন করে চলেছিলেন তারাই যদি আচমকা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে জানিয়ে দেয় যে আগে যা বলেছি সেটাতে ভুল ছিল এবং এখন যেটা বলছি সেটাই ঠিক, তখন কেমন লাগবে আপনার? ততোদিনে যে গঙ্গা, যমুনা আর গোদাবরী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে তার হিসেবটা কে দেবে এখন?
যেমন
এতোকাল ধরে জানানো হলো যে লক্ষনযুক্ত করোনা রোগীরা বিপজ্জনক তো বটেই কিন্তু তার চেয়েও বিপজ্জনক লক্ষন ছাড়া যেসমস্ত করোনা রোগীরা রাস্তা ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। লক্ষন ছাড়া রোগীরা ইংরাজিতে যাদের Asymptomatic patient বলা হয়ে থাকা তারা রোগহীন সাধারন মানুষের মতো
লোকসমাজে অবলীলায় ঘুরে বেড়ানোর ফলে তাদের থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়বার সম্ভাবনা অনেক বেশী।
টেলিভিশনের চ্যানেল গুলিতে ডাক্তারবাবুদের এই বিষয়ে কত সুচিন্তিত মতামত শুনে শুনে আমাদের যখন প্রায় মুখস্থ হয়ে গেলো, সেইসময় আচমকাই ধুমকেতুর মতো বিশ্বের সরবোচ্চ স্বাস্থ্য বিষয়ক নিয়ামক সংস্থা W H O বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমারজিং দিজিজেস এন্ড জুনোসিস বিভাগের প্রধান ডক্টর মারিয়া ভ্যান কেরখোভ গত জুন মাসের আট তারিখে ঘোষনা করলেন যে লক্ষনহীন রোগীরা অসুস্থ বটে তবে তাদের থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি হবার কোনো সম্ভাবনাই নাকি নেই।
বোঝো
কান্ড। এরা ঢাক ঢোল পিটিয়ে দেশে দেশে লক ডাউন করলো, সামাজিক দূরত্ব এবং শারীরিক দূরত্ব বিধি কঠোর ভাবে মেনে চলতে বললো, মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতা মূলক করলো, অ্যালকোহল
যুক্ত স্যানিটাইজার
ব্যবহার
করার ওপর জোর করলো, তারপর ব্যবসা-বানিজ্য, কল-কারখানা, ট্রেন, এরোপ্লেন, যাতায়াত, হোটেল, গাড়ী-ঘোড়া এমনকি স্কুল কলেজ, ছেলেমেয়েদের
লেখাপড়া, সমস্ত কিছু বন্ধ করে, সব কিছু শিকেয়
তুলে, এই
বিষয় সম্পর্কে কতোগুলো অল্প জানা কিম্বা একেবারেই কিছু না জানা লোকের সিদ্ধান্তের ওপরে নির্ভর করে, বিশ্বসুদ্ধ তাবড় তাবড় রাষ্ট্র নেতারা এবং তাদের চেলা চামুন্ডারা সারা পৃথিবীর মানুষের ওপর কেমন
ট্রায়াল এন্ড এরোরের
বুল্ডোজার
চালিয়ে বিশ্ব জুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে এবং আমরা পৃথিবীর অপাপবিদ্ধ অতি সাধারন মানুষগুলো পুতুল নাচের পুতুলগুলোর মতো তাদের আঙ্গুলের সুতোর টানে নেচে লাফিয়ে শুয়ে দাঁড়িয়ে দিন কাটাচ্ছি।
এই
লোকগুলো সত্যিই কিছু জানে কি? মনে হয় না। প্রতিনিয়ত টেলিভিশন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে নিত্য নতুন খবর আসছে কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয়
সেই বিষয়ে। যারা বলছেন এই বিষয় গুলি নিয়ে, তাদের বড় বড় ডিগ্রি এবং নামডাক দেখে তৎক্ষণাৎ বিশ্বাসও করে নিচ্ছে হাজারে হাজারে লোক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তার বন্ধুবান্ধবদেরও বলছে বিশ্বাস করে নিতে।
যেমন
আজ সকালেই আমার এক প্রবাসী বন্ধু একটা ফেসবুক ভিডিয়ো পাঠালো আমায়। সেখানে একজন ডাক্তার রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে বলছেন যে করোনা নিয়ে যা বলা হচ্ছে তার কোনোটাই ঠিক নয়, এটি বিশ্বজুড়ে একটি গভীর ষড়যন্ত্র। দিল্লী নিবাসী এই ডাক্তার দাবি করছেন যে করোনা রোগ একটি সাধারন সর্দি জ্বর ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ডাক্তার তরুন কোঠারি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন যে কেউ যদি প্রমান করতে পারেন যে করোনা
একটি মহামারী তাহলে তিনি নিজের তরফ থেকে তাকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবেন।
N95 মাস্ক
সম্পর্কে ইনি বলছেন যে এই মাস্কের ছিদ্রর সাইজ ৩০০ ন্যানো মিটার থেকে ৮০০ ন্যানোমিটার, অর্থাৎ ৩০০ থেকে ৮০০ ন্যানোমিটার সাইজের যে কোনো কণা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত এই N95 মাস্ক দ্বারা আটকানো যাবে,
অথচ করোনা ভাইরাসের সাইজ ১০০ ন্যানোমিটার, যার অর্থ এই মাস্ক দ্বারা করোনা ভাইরাসকে আটকানো
যাবে না।
এই কথাটি মাত্র কিছুদিন আগেই আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করে নিয়েছেন। ডাক্তার আরও বলছেন, পৃথিবীর কোনো মাস্ক দ্বারাই এই ভাইরাসকে আটকানো যাবেনা, উল্টে মাস্ক ব্যবহার করলে
নাকি ক্ষতির সম্ভাবনা
রয়েছে।
এই
ডাক্তার বাবু আমাদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দিকে প্রশ্ন ছুড়েছেন যে বলুন করোনা ভাইরাসের ‘আর নোট’ অর্থাৎ রিপ্রোডাকশন নোট কত। তার মানে তিনি বলতে চেয়েছেন যে এই
ভাইরাস কত দ্রুত তার বংশবৃদ্ধি করতে পারেন সেটা কেন্দ্রীয় সরকার জানেন কি না। দেখা যাচ্ছে, টিউবার কিউলাস ব্যাসিলির আর নোট মোটামুটি ভাবে ৫ থেকে ১০, আবার মিসিলস বা হাম রোগের আর নোট প্রায় ১০ য়ের আশেপাশে অথচ করোনার আর নোট এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাত্র ২.২।
দিল্লীর এই ডাক্তার বাবু যেমন আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে তার ভ্রান্ত স্বাস্থ্য নীতির জন্য দোষারোপ করেছেন তেমন
ভাবেই হু তথা বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থাকেও ছেড়ে কথা বলেন নি। আজকের এই করোনা ভাইরাস নিয়ে ভয়
দেখানোর খেলার মুখ্য নায়ক হিসেবে তিনি দায়ী করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে। ডাক্তার কোঠারি অভিযোগ করেছেন যে ২০০৯ সালে
পার্লামেন্টারি
অ্যাসেম্বলি কাউন্সিল অফ ইউরোপ এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে একটি ভ্রষ্ট সংস্থা হিসেবে ঘোষনা করেছিল কারন সোয়াইন ফ্লুয়ের কারনে এই সংস্থাটি সেইসময় সমগ্র ইউরোপকে মহামারী অধ্যুষিত অঞ্চল বলে ঘোষনা করেছিল। অ্যাসেম্বলি কাউন্সিল তদন্ত করে দেখেছিল যে হু সংস্থাটির কিছু অধিকর্তা, বিজ্ঞানী এবং কর্মচারীরা ওষুধ প্রস্তুতকারী বহুজাতিক সংস্থাগুলির সাথে হাত মিলিয়ে এই অপকর্মটি
করেছেন। ডাক্তার কোঠারি প্রশ্ন তুলেছেন যে সেই ভ্রষ্ট ঘোষিত সংস্থাকে হঠাৎ এতো গুরুত্ব দেওয়াই বা
হচ্ছে কেন এই সময়?
ডাক্তার
কোঠারির যে প্রশ্নটি আমায় ভাবিয়েছে তা হলো, সারা ভারতে অন্যান্য রোগে
প্রতিবছর মানুষের মৃত্যুর হার কি রকম। উনি বলছেন ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা লাইক ইলনেস’ রোগে দেশে বছরে কয়েক
লক্ষ মানুষ এখনো প্রান হারান। সরকার তথ্য দিয়ে জানাক গতবছরে এই সময় পর্যন্ত আমাদের দেশে কতো
জন মানুষ আই এল আই বা ইনফ্লুয়েঞ্জা লাইক ইলনেসের ফলে মারা গিয়েছেন। তথ্য বলছে কেবল টিবি রোগেই এখনো আমাদের দেশে দৈনিক মৃত্যু সংখ্যা প্রায় এক হাজার জন মানুষের, সেই হিসেবে করোনা তাহলে অতি সাধারন একটি রোগ এবং কেবল আতঙ্কের একটি বাতাবরণ তৈরি করে বিশ্ববাসীকে ভয়ার্ত করে পরবর্তী কোনো একটি বিরাট ষড়যন্ত্রের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে মাত্র।
অনেকটা
ঠিক ডাক্তার কোঠারির মতো করেই বলছেন ফরিদাবাদের স্বনামধন্য তরুন বাঙালি ডাক্তার বিশ্বরূপ রায়চৌধুরী। ডাক্তার রায়চৌধুরী খোলাখুলি জানাচ্ছেন যে করোনা নিয়ে এক তীব্র ভয়ের বাতাবরন তৈরি করা হচ্ছে এবং হয়ে চলেছে। কারন মানুষ যত বেশী আতঙ্কিত হবেন ততই এক শ্রেনীর ব্যবসায়ীদের সুবিধে হবে। কেবল ভয় দেখিয়ে, ভয়ের কথা বলে, ভয়ের আবহাওয়া তৈরি করে মানুষ কে যেমন ইচ্ছে চালানো যায় বা কিনতে বাধ্য করা যায়। ডাক্তার রায়চৌধুরী জানাচ্ছেন, মামুলি এই রোগটাকে কেবল আতঙ্ক সৃষ্টি করানোর জন্যই বড়ো করে দেখানো হচ্ছে। উনি বলছেন প্রতিদিন ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি ঠিক ঠিক মাত্রায় গ্রহন করলে এবং ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিলেই এই
রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, অযথা কড়া কড়া ওষুধ খেতে ইনি বারন করছেন কারন সেই সব তথাকথিত ওষুধগুলির পূর্ববর্তী ইতিহাস খুব একটা আশা ব্যাঞ্জক নয়।
এতো
সব অদ্ভুত অদ্ভুত তথ্য জানার পর মাথাটা কেমন যেন টলে যাচ্ছে। মানুষের মরা বাঁচা নিয়েও যে ব্যবসা হতে পারে এমনটা আমি অন্তত আগে কখনো ভাবিনি, জানতামও না। মানুষ কতোটা নিচে নামতে পারলে তবে এইরকম চিন্তা আসতে পারে মানুষের মাথায়? এই গ্রহের শ্রেষ্ঠ জীব এই মানুষ নামক প্রানীটি, কেবল
লোভের জন্য, ঠিক নিজের মতো অবয়বের আরেকটি সমান প্রানী, আপন প্রজাতির, এমন ভয়ঙ্কর ক্ষতির চিন্তা করতে পারে? কে জানে, আমার কেমন যেন সব ঘোলাটে লাগছে। হয়তোবা সবই সম্ভব, যে দেশে ধর্মের নামে, জাত পাতের নামে লড়াই ঝগড়া আর খুনোখুনি লেগেই থাকে প্রতিনিয়ত, সেখানে বোধহয় সব কিছুই সম্ভব।



0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.