কোভিড ১৯ এবং ভারতের পর্যটন শিল্প।
আমাদের দেশে করোনার
থাবা যত বেশি ভাবে চেপে বসছে, প্রতিদিনই ক্রমাগত অনিশ্চয়তা ও হাহাকার ততই দীর্ঘায়ত হয়ে চলেছে।এত দীর্ঘদিন ঘরবন্দী হয়ে
থাকার অভিজ্ঞতা আগে কখনো না থাকবার কারনে বেশ কিছু দুশ্চিন্তা মানুষের মনে চেপে বসছে
যা করোনার আতঙ্কের থেকে কোনো অংশেই কম নয়। সরকারি চাকুরে ছাড়া যারা বেসরকারি ক্ষেত্রে
কর্মরত রয়েছেন তাদের বহুল সংখ্যায় চাকরি হারাতে হয়েছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যে সমস্ত লোকজন
কাজ করে সামান্য উপার্জনে এতদিন কোনোরকমে সংসার চালিয়েছেন তাদের বেশিরভাগেরই আর কাজ
নেই। যারা বড় শহরগুলি থেকে কিছুটা দূরে মফস্বলে বসবাস করে এ্তো দিন লোকাল ট্রেনে চেপে
কর্মস্থলে যেতেন, ট্রেন বন্ধ থাকার কারনে তাদেরও আজ অন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করে তারপর
শহরে কাজের সন্ধানে যেতে হচ্ছে, অথচ স্থানীয় ভাবে পরিবহন সংখ্যা কম থাকার জন্য এই
বিকল্প পরিবহনের ভাড়া যে পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে তা’ নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষজনের
পক্ষে বহন করাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। আগে অটো রিক্সাতে যে জায়গায় যাবার ভাড়া ছিল দশ
টাকা, এখন তা’ বেড়ে হয়েছে চল্লিশ টাকা। বর্ধিত হারে ভাড়া নিয়ে খুব অল্প সংখ্যক বাসও চলাচল
করছে, তবে তা’ এতোই অনিয়মিত যে যেতে পারলেও ফিরতে পারবেন কিনা তা’ হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত।
এই ভয়ানক অনিশ্চয়তার আবহে যেখানে পরের দিনের খাবার জোগাড় করবার চিন্তায় মানুষ অসহায়
হয়ে রয়েছে সেখানে সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থার ভেতরে দিন কাটাচ্ছেন পর্যটন শিল্প এবং তার অনুসারি
আরো নানান কাজের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ এবং তাঁদের পরিবার বর্গ।
মাত্র কিছু দিন
আগেই একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখলাম অন্যান্য শিল্পের প্রতিনিধিদের সাথে পর্যটন শিল্পেরও
এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলবার সময় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী পর্যটন
শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গকে ভগবানকে ডাকবার পরামর্শ দিলেন। একই রকম ভাবে কেন্দ্রীয়
সরকারের মনোভাব থেকেও এটা স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে যে প্রায় কয়েক লক্ষ পরিবারের জীবন ধারনের
সঙ্গে জড়িত এই শিল্প সম্পর্কে কোন সঠিক দিশাই তারা আজ পর্যন্ত তৈরি করেন নি। রাজ্য
বা কেন্দ্র সরকার কখনো বলছেন সব পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হলো, কখনো জানতে পারছি বিভিন্ন
জায়গায় হোটেল খুলে দেওয়া হলো ইত্যাদি, কিন্তু পর্যটকদের মনে ভয়হীন বিশ্বাস জাগানোর
জন্য অর্থাৎ বেড়াতে গেলে তিনি বা তাঁর পরিবার করোনা রোগে আক্রান্ত হলে তাঁদের যথোপযুক্ত
চিকিৎসার দায়ভার সরকার বহন করবে এই রকম আশ্বাস না
দিলে শুধুমাত্র হোটেল খুলে দিলেই যে পর্যটকেরা বেড়িয়ে পড়বেন এমন সম্ভাবনা মোটেও
নেই। এছাড়াও লোকেরা কি ভাবে গন্তব্য স্থলে পৌঁছবেন সেটাও সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
দিন কয়েক আগে
সিকিম নিবাসী একজন গাড়ী মালিক কাম ড্রাইভার, আমার অতি পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ অল্প বয়সী মিষ্টি
ছেলে বলবাহাদুর ভুটিয়া, ফোন করে তাদের চরম দুরবস্থার কথা শোনালো আমায়। মাসের পর মাস গাড়ীর
ই এম আই বাকি পড়ে যাচ্ছে, ব্যাঙ্কগুলি এ ব্যাপারে আপাতত সুদ মকুব করবার বিষয়ে কোনো
সদুত্তর দিচ্ছে না, বাড়িতে প্রায় সাত জন মানুষ যারা কেবলমাত্র এই গাড়িভাড়া থেকে রোজগারের
টাকায় খেতে পান, তাদের মুখ চেয়ে নিদারুন কষ্টের
ভেতর দিয়ে দিন কাটছে পূর্ব সিকিমের এই পরিবারটির।
একই রকম ভাবে
পর্যটকদের জন্য পথ চেয়ে বসে আছে রাজস্থানের জয়পুরের কাছে কিশন গড়ের সুরজপ্রসাদ।সুরজের একটা ৩৫ সিটের সুন্দর বড়ো বাস
আজ দীর্ঘদিন বসে আছে, তাই রোজগার পাতি সম্পূর্ণ বন্ধ তার। বৌ আর শিশু সন্তানের মুখ
চেয়ে তাই শহরের ভেতর মুরগী বিক্রি করছে সে এখন।তাতেও খরিদ্দার নেই। কি করে থাকবে? লোকের
হাতে পয়সা না থাকলে ভালোমন্দ কেনাকাটা কি করে
করবে তারা?
আজ সকালেই কথা
হচ্ছিল পোর্ট ব্লেয়ারের সমীরের সঙ্গে। এম এড পাশ করা অতি ভদ্র এই মিষ্টি ছেলেটা চাকরি বাকরি না পেয়ে হোটেল এবং গাড়ি সাপ্লাইয়ের ব্যবসা
করে সংসার চালাচ্ছিল বেশ কয়েক বছর। করোনার উৎপাতে মা বোন সমেত ওর সম্পূর্ণ পরিবারটি
আজ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এরকম আর কতো বলবো। প্রতিদিন এই রকম হাজার হাজার বলবাহাদুর, সুরজ বা সমীরদের মতো সৎ
ভারতীয় নাগরিক এবং তাঁদের পরিবারবর্গ করোনার ফলে উদ্ভুত হওয়া এমন অদৃষ্টপূর্ব পরিস্থিতির শিকার হয়ে আছেন যা বলে শেষ করা যাবে না।
একটু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং বৃহত্তর সমাজের কল্যানের কথা চিন্তা করে রাষ্ট্র যদি আর একটু সংবেদনশীল
হতো তাহলে হয়তো এই অভাবনীয় বিপর্যয়ের হাত থেকে এতো সহস্র পরিবার সামান্য হলেও মুক্তি
পেতে পারতো।অবশ্য চিন্তাটা করবেই বা কে!মানুষের কল্যানের জন্য, দারিদ্র্য আর অনাহার
থেকে মুক্তির জন্য, সমাজের সার্বিক মঙ্গলের জন্য যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কল্পনা
করে ভারতের জনগন গনতান্ত্রিক ভাবে যা সম্ভব সেই উপায়ে দু-হাত ভরে ভোট দিয়ে নির্বাচিত
করে যাদের ক্ষমতায় এনেছেন তারা দেশের সমস্ত মানুষের কথা ভাবেন বলে মনে হয় না। অনাহারে,
অর্ধাহারে অশিক্ষায় বাস করা মানুষের কথা ভাবার চেয়ে তাদের এখন বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে মন্দির
বানানোর।
এমনকি দিনের পর
দিন আমাদের খবরের কাগজ এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলি যেভাবে কেবল করোনা সম্পর্কিত খবর,
যেমন কত জন আরো রোগী যুক্ত হল, কত জন মারা গেল, আরো কি রকমের ভয়ানক দিন আসছে, প্রভৃতি
বিষয়ক খবর পরিবেশন করে করে মানুষের মনে নতুন নতুন ভীতির সঞ্চার করাচ্ছেন তার ফলে
কার কি উপকার হচ্ছে জানিনা, তবে মানসিক ভাবে ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারন মানুষ।
প্রতিদিন এইরকম ভাবে কেবল নেগেটিভ গল্পগুলি না শুনিয়ে মিডিয়ার উচিৎ লোকের মনে আস্থা
ফিরিয়ে আনবার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সৎ আনন্দগুলির গল্প শোনানো। টিভি বা
খবরের কাগজ খুললেই কেবল ভয়ার্ত সমাজের কথা
দেখলে বা শুনলে বা পড়লে, যে কোনো মানুষ অজান্তেই এক নিদারুন বিষাদগ্রস্ত অবস্থার শিকার
হয়ে পড়বেন, এটা মিডিয়ার বোঝা দরকার। কেবল ব্যবসা করবার জন্য আপনারা ভবিষ্যতে আরো অনেক
সময় পাবেন, কিন্তু দয়া করে মানুষের মনোবল ভেঙে পড়ে এমন কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন
আপনারা আপাতত, অন্তত এই মুহূর্তে এই অনুরোধ করবো।
হ্যাঁ মানছি, করোনা একটি
বেশ ভয়াবহ রোগ এবং একটু অসতর্ক হলেই এই ভাইরাস
থেকে বেশ বড়ো রকমের বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই মানুষকে বারবার বোঝানো যেমন দরকার কি করবেন
আর কি করবেন না ঠিক তেমনই প্রশাসনেরও উচিৎ
কি নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তা যথাযথ ভাবে পালিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সম্যক দৃষ্টি রাখা।
যেমন আপনারা বললেন অন্তত দুই মিটার শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখুন পরস্পরের থেকে অথচ বাসে যেতে
হলে ভিড়ের মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি আর ঠেলাঠেলি করে বাধ্য হয়ে অফিসে পৌঁছতে হচ্ছে যে মানুষটিকে,
কারন আপনি নির্দেশ জারি করেছেন অতি অবশ্যই অফিসে পৌঁছতে হবে যে করেই হোক, তার যদি করোনা
হয় তাহলে তার দায় কে নেবে? সুতরাং ঠিকঠিক পরিকল্পনা এবং তার রুপায়ন যে জরুরি তা বুঝে
চলতে হবে প্রশাসনকেই।
এক সময় টিউবারকিউলোসিস বা টিবি রোগ মহামারীর আকার ধারন করেছিল।
এই রোগটিও ভয়ানক ছোঁয়াচে। এই রোগটি এখনো আকচার হয়ে চলেছে আমাদের দেশে, যদিও এই রোগের
এখন ওষুধ রয়েছে। কিন্তু এই মারাত্মক রোগটিতে আজো অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটে চলেছে
নিত্যদিন। এই রোগটিতেও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, তবে আপনার আশেপাশে কত টিবি রোগী নিত্যদিন
মাস্ক ছাড়া ট্রেনে বা বাসে কেশে হেঁচে সহযাত্রী হয়েছেন আপনার আপনি তা’ জানেন ও না আর
জানেন না বলেই আপনি নিশ্চিন্তে চানাচুর খেতে
খেতে তার সাথে গল্প করতে করতে বাড়ী ফিরেছেন কতদিন। আপনি কিন্তু সুস্থই আছেন। করোনা
নিয়ে চিন্তা করুন, তবে এতো বেশী চিন্তা করে সমাজ, সভ্যতা সব কিছু জলাঞ্জলী দিয়ে এই
বুঝি আমি মরে গেলাম ভেবে যদি বসে থাকেন তাহলে করোনা আরো বেশি করে জাঁকিয়ে বসবে আমাদের
ওপর।
দয়া করে মনে জোর
আনুন, সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করে হাসুন, মজা করুন, গল্প করুন এবং বেড়াতে চলুন। দার্জিলিং
বা ডুয়ার্স কিন্তু সমস্ত আনন্দের ডালি সাজিয়ে অপেক্ষায় আছে আপনার জন্য।ভয় জয় করে নিজে
বাঁচুন আর আপনাকে পরম নিশ্চয়তার সঙ্গে বেড়ানোর আনন্দ দিয়ে নিজেরা যারা আনন্দে বেঁচে থাকে সারা ভারতের পর্যটন
শিল্পের সাথে জড়িত সেই সব পরিবারগুলিকে বাঁচতে সাহায্য করুন।সতর্ক থাকুন, সুস্থ থাকুন,
ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন। আসুন সবাই একসাথে বেঁচে থেকে এই করোনাকে আমরা জয় করি।


0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.