ঘুরে এলাম লামাদের দেশে, পর্ব - ১০
স্রোত মুখর সিন্দ
অল্প এগিয়ে বাঁ পাশে দেখি খরতর স্রোত-উচ্ছল এক ধারা কলস্বরে উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করতে করতে ছুটে চলেছে। জানলাম এর নাম সিন্দ। স্থানীয়রা বলে সিন্দ নালা। ঝিলম নদীর একটি শাখা এটি।
রাস্তার ধারে একটি পার্কের পাশে গাড়ী রেখে নেমে পড়লাম আমরা এই মুখর স্রোতধারার সাথে কথা বলবার জন্য।
আপেল বাগানে
আবার হু হু করে গাড়ী ছুটে চলেছে। কত গ্রাম দেখতে দেখতে পার হয়ে যাচ্ছি। মর্ত্যের নন্দনকানন স্বপ্ন সুন্দরী কাশ্মীর উপত্যকা দিয়ে এগোচ্ছি রাজধানী শহর শ্রীনগরের দিকে।
![]() |
| Ladakh tour |
ডান দিকে একটা বড়ো আপেল বাগান দেখে গাড়ী দাঁড়ালো। অনেক টা জায়গা জুড়ে বাগানটি। গাছে গাছে ছেয়ে আছে এদেশের সুবিখ্যাত লাল আপেল। অনেক লোক কাজ করছে বাগানে। ত্রিপল টাঙ্গিয়ে একটা প্যান্ডেল মতো করা জায়গায় আপেল তুলে এনে ঢালা হচ্ছে এবং সেখানেই চলেছে ঝাড়াই বাছাইয়ের কাজ। এক এক প্রকার আপেল এক এক রকম বাক্সে বোঝাই হয়ে আলাদা আলাদা লট করে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে আর এক দিকে। একজন বয়স্ক বৃদ্ধ এবং সজ্জন ব্যক্তি আমাদের সব দেখালেন, অনেক আপেল খাওয়ালেন এবং গুনগত মান অনুসারে আপেল চেনাবার চেষ্টা করলেন। আমরা এক বড়ো বাক্স আপেল কিনলাম সকলে মিলে।
ঐতিহাসিক শালিমার গার্ডেনে
![]() |
| Ladakh tour |
আবার যাত্রা শুরু হল আমাদের। কিছুদুর গিয়ে হাই ওয়ে ছেড়ে শহরের অলি গলি ধরে চললো আমাদের গাড়ী। ফইজু ভাই একেবারে শালিমার গার্ডেনের মূল দরজার সামনে এসে গাড়ী দাঁড় করালো।
![]() |
| Ladakh tour |
আজ খুব ভীড়। বিভিন্ন স্কুলের ছেলে মেয়েদের নিয়ে দল এসেছে বাগানে। তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে বাগানে প্রবেশ করলাম আমরা।
![]() |
| Ladakh tour |
বহু প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী এই ঐতিহাসিক বাগান। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের তত্বাবধানে তৈরি এই বাগানে এক সময় রাজসভাও বসিয়েছেন সম্রাট। প্রবল গ্রীষ্মের তাপে দগ্ধ এবং অতিষ্ঠ হয়ে গরমের সময়ে সম্রাট সপারিষদ চলে আসতেন এই কাশ্মীরে, দিনের অনেকটাই সময় অতিবাহিত করতেন এই শালীমার বাগানের ভেতর।
![]() |
| Ladakh tour |
আমি আগেও এসেছি এই বাগানে। এবারে মনে হলো এর কৌলীন্যে কিছুটা খামতি পড়েছে। যথাযথ রক্ষনাবেক্ষনের অভাব বেশ নজরে পড়লো।
![]() |
| Ladakh tour |
প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন একটি চিনার গাছ রয়েছে এই বাগানে। কান্ড স্পর্শ করেই মনে হলো আমাদের বৃদ্ধস্য বৃদ্ধ প্রপিতামহের কোমল করস্পর্শ যেন পেলাম। “কত কথা পুষ্প প্রায় বিকশি তুলিতে চায় কত অনুরাগে।“ ততক্ষনাৎ মন ভালো হয়ে গেলো। অপার বিস্ময়ে এই বয়োবৃদ্ধ মহীরুহ কে আদর করে দিলাম।
![]() |
| Ladakh tour |
আরো কিছুক্ষন শালীমার বাগানে কাটিয়ে আমরা আমাদের আজকের রাতের আস্তানার দিকে এগোলাম।
শ্রীনগরের হোটেলে একরাত
হোটেলটা নিশাদ বাগের কাছে, আজ আর সময় নেই নিশাদ বাগ দেখবার। বাগান বন্ধ হয়ে যাবে, অগত্যা হোটেলের আতিথ্যে ফিরে যাওয়াটাই শ্রেয়
বিবেচ্য হলো। কাল দুপুরের বিমানে আমাদের ফিরে যাওয়া। মনটা মাঝে মাঝে বিষাদ
সিন্ধুতে ডুব দিয়ে উঠছে যেন। যাত্রা শুরু করেছিলাম এক ভোর বেলা চন্ডীগড় স্টেশন
থেকে। কাল শ্রীনগর বিমান বন্দরে এই যাত্রার শেষ। এই মন কেমন করা আবছায়া বিকেলে
হোটেলের ঘরের ভেতর মুড়ি চানাচুর আর চা সহযোগে আমরা কয়েকজন এই ভ্রমনের স্মৃতি
রোমন্থন করতে করতে আবেগ বিহ্বল মেদুরতায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম, খেয়াল করতে পারিনি এরই ভেতর কখন যেন নিশ্চুপ
নিশীথিনী কম্বল মুড়ি চাপা বৃদ্ধার মতো আস্তে আস্তে এসে ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে
আমাদের ওপর। খাবার ঘর থেকে ডাক এসেছে। তাড়াতাড়ি পা চালালাম একতলার খাবার ঘরের
দিকে।
খুব সকালে ঘুম
ভাঙল। হোটেলের উল্টো দিকের রাস্তায় সারিবদ্ধ চিনার গাছগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে সবে
সূর্যের রেখা এসে পড়েছে ঘরের জানালায়। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা ভোর বেলা কেমন ভিজে ভিজে
চাউনি দিয়ে মিটি মিটি হাসছে যেন। এই মুহূর্তে প্রথমেই মনে হলো আজই ফিরতে হবে।
শ্রীনগরের আকাশ, মেঘ, বাতাস যতই জড়িয়ে ধরুক আজ, কেজো ভুবন হাতে বেত নিয়ে স্কুলের গুঁফো পন্ডিতের মতো বুকের ভেতর আস্ফালন করছে।
ফিরতেই হবে। কত কি বাকি রয়ে গেলো, কত প্রান্তর কত মানুষ অচেনা রয়ে গেল, তবু উপায় নেই। ফিরতেই হবে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লাইন মনে উঁকি মেরে গেল, “কোন নিয়মে ফেরা এবং নিয়মে পথ জোড়া, বলবে নাকি দেবে ফাঁকি আমায় আগাগোড়া,”। হে এই ভোরের আলো, এই নীলাকাশ, এই নরম ঠান্ডা রোদ্দুর মাখা শ্রীনগরের হিমেল বাতাস, তোমরা সাক্ষী রইলে, আবার আসব। কথা দিলাম, তোমাদের স্নেহচ্ছায়া বুকে মেখে ফিরে যাচ্ছি
নিতান্ত কেজো জগতের এবড়ো খেবড়ো পৃথিবীতে। ভুলোনা আমায় তোমরা। ফইজু ভাইয়ের গাড়ীর
হর্নে চমক ভাঙল। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে জলখাবার খেতে নামলাম।
অপরূপা ডাল লেক
আমাদের দুর্ভাগ্য, বেলা সবে সাড়ে আটটা এখন। নিশাদ বাগের দরজা খুলতে অনেক দেরী। বাধ্য হয়ে ডাল লেকের উদ্দ্যেশ্যে এগোলাম আমরা। আমাদের ডান পাশে বিস্তৃত ডাল লেক। বহু দূর পর্যন্ত তার বিস্তৃতি। সকাল বেলায় জলের ওপর একটা হাল্কা কুয়াশার আবছায়া জড়ানো রয়েছে।
![]() |
| Ladakh tour |
এসে দাঁড়ালাম শিকারার জেটিতে। রঙ বেরঙের সজ্জায় সজ্জিত শিকারা গুলি আলো হয়ে ফুলের মতো ফুটে আছে যেন জলের ওপর।
![]() |
| Ladakh tour |
দরাদরি করে শিকারা ভাড়া করে ভেসে পড়লাম ডাল লেকের জলে।
![]() |
| Ladakh tour |
ছোট ছোট শিকারাতে চেপে কত রকম জিনিষপত্র নিয়ে জলে ভেসে ভেসে ফেরি করছে ফেরিওয়ালারা। কি নেই তাদের ভান্ডারে। টুপি, দস্তানা, মোজা, সোয়েটার, ব্যাগ, পশমিনা শাল, ঘর সাজাবার কাঠের পুতুল, আতর, কেশর, শিলাজিৎ মায় আখরোট আপেল পর্যন্ত।
![]() |
| Ladakh tour |
সামনেই নেহরু পার্ক। দূরে দূরে পাহাড়ের মাথায় শ্বেত শুভ্র তুষারের মুকুট।
![]() |
| Ladakh tour |
এক অপার্থিব পরিবেশ। জলে ডুব দিয়ে দিয়ে মাছ ধরছে পানকৌড়ি। অনেক নাম না জানা পাখী ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে যাচ্ছে এদিক থেকে ওদিকে।
![]() |
| Ladakh Tour |
আমরা পদ্মবন দেখতে গেলাম। এক জায়গায় ভাসমান একটি বিরাট দ্বীপের মতো, সেখানে কেমন সবজি চাষও হয়েছে দেখা গেলো।
![]() |
| Ladakh tour |
অসংখ্য ভাসমান হাউস বোট এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শিকারাওয়ালা একেকটা হাউস বোটে কোন সময় কোন বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা থেকে গেছেন, কোথায় কোন সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে তার ফিরিস্তি শোনাতে শোনাতে আমাদের মীনা বাজারে নিয়ে এসে ফেললো।
![]() |
| Ladakh tour |
আশ্চর্য্য এই ভাসমান জীবনযাত্রা।
![]() |
| Ladakh tour |
![]() |
| Ladakh tour |
দোকান বাজার সব চলেছে এই রকম জলের রাজ্যে ভেসে ভেসে। আমরা একটা কফি শপে বসে দারুন কফি খেলাম। কয়েকজন গেলেন শাল প্রভৃতি দেখতে।
'আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া'
বেশ কিছুক্ষন ডাল লেকে কাটিয়ে এবার ফিরে এলাম জেটিতে। উড়োজাহাজের সময় হয়ে এলো প্রায়। বিমানবন্দরের রাস্তায় ভীষণ যানজট। ধীরে ধীরে দু বার সেফটি চেকিং পর্ব পেরিয়ে যখন বিমানে উঠলাম তখন আর বিশেষ দেরী নেই বিমান ছাড়বার।
![]() |
| Ladakh tour |
বিমানের চাকা
শ্রীনগর বিমানবন্দরের রানওয়ে ধরে চলতে শুরু করেছে। জানালার বাইরে দিয়ে অনেক দূরে
এখনো দেখা যাচ্ছে প্রাণসখা চিরবান্ধব গিরিরাজ হিমালয়কে। বন্ধুকে ছেড়ে থাকা খুব
কষ্টের। তবু যেতে হয়। তাৎক্ষণিক এই বিচ্ছেদের বিরহ ভার বুকে বহন করে হাত নেড়ে
বিদায় জানালাম মহামহিম চির আনন্দময় অতুল ঐশ্বর্যশালী বন্ধু গিরিশিখর কুলোতিলক শ্রী
শ্রী হিমালয় কে।
সমাপ্ত।।
























0 মন্তব্যসমূহ
Please do not enter any spam link in the comment box.